Table of Contents
হাইলাইটস:
- প্রায় চার মাসের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর দাবি করেছে দুই পক্ষ।
- ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, এই চুক্তির ফলে যুদ্ধের “তাৎক্ষণিক অবসান” হবে।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন।
- পাকিস্তান জানিয়েছে, ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা।
- চুক্তির আওতায় লেবাননের সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
- ইজরায়েলের সাম্প্রতিক বেইরুট হামলা শেষ মুহূর্তে আলোচনাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
বাংলাস্ফিয়ার: চার মাস ধরে চলা ভয়াবহ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাতগুলির একটির অবসান ঘটতে পারে এই সমঝোতার মাধ্যমে।
সোমবার ভোরে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের “অবিলম্বে সমাপ্তি” ঘটাবে। তিনি আরও জানান, চুক্তির আওতায় লেবাননের পরিস্থিতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে চুক্তির পূর্ণ শর্তাবলি এখনও প্রকাশ করা হয়নি। রবিবার রাতে নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হবে এবং আমেরিকার নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে।
উচ্ছ্বসিত বার্তায় তিনি লেখেন, “বিশ্বের জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করো। তেল আবার প্রবাহিত হোক।”
পরে ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, প্রণালী পুরোপুরি খোলার বিষয়টি শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের ওপর নির্ভর করবে। তাঁর ভাষায়, এর আগে “মাইন অপসারণের কাজ” সম্পন্ন করতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক হয়েছে, তাতে ইরানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার কথা বলা হয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সমঝোতা
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ রবিবার বিকেলে এই সমঝোতার কথা ঘোষণা করেন ।তিনি জানান, দুই পক্ষ “লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার” বিষয়ে একমত হয়েছে।
এক্সে দেওয়া বার্তায় শরিফ বলেন, “নিবিড় আলোচনার পর আমরা আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।”
তাঁর মতে, আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
ইজরায়েলি হামলায় শেষ মুহূর্তে জটিলতা
যখন মধ্যস্থতাকারীরা চূড়ান্ত সমঝোতার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই রবিবার লেবাননের রাজধানী বেইরুটের দক্ষিণ উপকণ্ঠে নতুন বিমান হামলা চালায় ইজরায়েল।
এই হামলায় একটি ভবন ধ্বংস হয়। অন্তত তিনজন নিহত এবং ছয়জন আহত হন।
হামলার জেরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেন, এই হামলার কারণে চুক্তি স্বাক্ষর “কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে গেছে”।
তিনি দাবি করেন, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে তিনি বলেছেন যে তাঁর “বিচারবোধের ঘাটতি” রয়েছে।
ইজরায়েল জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহ-এর শীর্ষ কমান্ডারদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, হিজবুল্লাহ উত্তর ইজরায়েলের দিকে তিনটি প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করেছিল।
ইরানের কড়া সতর্কবার্তা
ইরানের সংসদের স্পিকার এবং আলোচনার অন্যতম মুখ্য প্রতিনিধি মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবয়াফ বলেন, বেইরুটে ইজরায়েলের হামলা প্রমাণ করে যে “আমেরিকার হয় তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছা নেই, নয়তো ক্ষমতা নেই।”
ইরানের যৌথ সামরিক সদর দপ্তরের উপ-কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ জাফর আসাদি সতর্ক করে বলেন, “এই অপরাধের জবাব দেওয়া হবে।”
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে “কঠোর প্রতিক্রিয়ার” হুঁশিয়ারি দেয়। দেশটির সামরিক নেতৃত্ব জানায়, তাদের “আঙুল ট্রিগারের ওপর রয়েছে” এবং তারা “শত্রুর হৃদয়ে আঘাত হানতে প্রস্তুত।”
হরমুজ প্রণালী ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
এই সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। সংঘাতের ফলে এই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইরান আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালী খুলে দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং তেল রপ্তানির সুযোগ দেবে। এতে মারাত্মক সংকটে থাকা ইরানি অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
পারমাণবিক ইস্যু এখনও অমীমাংসিত
যদিও যুদ্ধবিরতি ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে, সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—এখনও চূড়ান্তভাবে মীমাংসিত হয়নি।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে পৃথক ও বিস্তৃত আলোচনা হবে।
তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই সন্দিহান। তাঁদের মতে, এত জটিল ইস্যু মাত্র দুই মাসে সমাধান করা কঠিন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তাকেন্দ্র আটলান্টিক কাউন্সিল-এর বিশেষজ্ঞ আলিয়া ব্রাহিমি বলেন, “৬০ দিনের মধ্যে সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যাবে বলে আমার মনে হয় না।”
তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক মার্কিন-ইরান পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন করতে প্রায় দশ গুণ বেশি সময় লেগেছিল এবং সেখানে বিশাল প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ দল কাজ করেছিল।
ইজরায়েলে উদ্বেগ, ট্রাম্পের দলেও সমালোচনা
সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা প্রকাশ্যে আসতেই ইজরায়েলেতীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, খসড়া চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ নেই।
ইজরায়েলের জনপ্রিয় দৈনিক মারিভ-এ বিশ্লেষক আভি আশকেনাজি লিখেছেন, “এটি এক বিশাল ব্যর্থতা। পূর্ণাঙ্গ ধস। নিঃসন্দেহে ইরানই সবচেয়ে বড় বিজয়ী হিসেবে বেরিয়ে এসেছে।”
নেতানিয়াহুর সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাকব নাগেল এই চুক্তিকে “বড় ভুল” বলে অভিহিত করেছেন।
একইভাবে, ট্রাম্পের রিপাবলিকান শিবিরের একাংশও সমালোচনা শুরু করেছে। যুদ্ধ এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য ইতিমধ্যেই প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।
স্বস্তি এলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে গেলেও বিশ্ব অর্থনীতি সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তি পাবে না।
যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো মেরামত করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এছাড়া প্রণালীতে আটকে থাকা জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প সোমবার শুরু হওয়া G7 Summit-এ হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে।
চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর শান্তির সম্ভাবনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস বলছে, কাগজে স্বাক্ষরই শেষ কথা নয়—আসল পরীক্ষা হবে চুক্তি বাস্তবায়নের পথে।