হাইলাইটস:

  • সপ্তমবারের মতো সরকারি সফরে ফ্রান্সে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
  • ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ক এখন ‘স্পেশাল গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এর পর্যায়ে।
  • প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও পরমাণু শক্তি সহযোগিতা সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
  • জি-৭ সম্মেলনে ইরান-সংকট ও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ তুলে ধরবেন মোদী।
  • পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে ফ্রান্সই বারবার ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে কঠিন সময়ে।

বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে বন্ধু আর মিত্রের মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক দেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পর্ক বদলায়, কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ভারত ও ফ্রান্সের সম্পর্ক তেমনই এক বিরল উদাহরণ। আগামী কয়েক দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ফ্রান্স সফর শুধু একটি কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সম্পর্কের নতুন অধ্যায়।

মোদী ১৩ ও ১৪ জুন নিসে, ১৬ ও ১৭ জুন জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য এভিয়াঁয় এবং ১৭ ও ১৮ জুন প্যারিসে থাকবেন। ২০১৪ সালের পর এটি তাঁর সপ্তম সরকারি ফ্রান্স সফর। ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ভারত সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ককে উন্নীত করা হয়েছে ‘স্পেশাল গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এ। এই নতুন অভিধা কেবল কূটনৈতিক অলঙ্কার নয়; এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের বিশ্বাস, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মান।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের নতুন যুগ

এবারের সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন। নিস শহরে মোদী ও রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁ যৌথভাবে উদ্বোধন করবেন ‘ভারত ইনোভেটস’ অনুষ্ঠান। সেখানে ১২০-রও বেশি ভারতীয় স্টার্ট-আপ, প্রযুক্তি সংস্থা এবং বিশ্বের নানা দেশের উদ্ভাবকরা অংশ নেবেন।

বর্তমান বিশ্বের শক্তির সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। এক সময় যুদ্ধজাহাজ, ট্যাঙ্ক ও ক্ষেপণাস্ত্র ছিল শক্তির মাপকাঠি। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সাইবার প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। সেই কারণেই প্যারিসের ‘ভিভাটেক’ সম্মেলনে ভারতের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইউরোপের বৃহত্তম প্রযুক্তি ও স্টার্ট-আপ সম্মেলনে এবার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্যাভিলিয়ন ভারতের।

এটি শুধু ব্যবসা বা বিনিয়োগের প্রশ্ন নয়। প্রযুক্তির জগতে যে দেশকে বিশ্বাস করা যায়, তাকেই অংশীদার করা হয়। ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের ভিত্তি সেই বিশ্বাস।

জি-৭ সম্মেলনে ভারতের বার্তা

এবারের জি-৭ সম্মেলনের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত স্পর্শকাতর। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংঘাত ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।

ভারতের তেলের একটি বড় অংশ এই অঞ্চল দিয়ে আসে। সম্প্রতি মার্কিন হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে জি-৭ সম্মেলনে মোদীর অন্যতম অগ্রাধিকার হবে এই সংকট নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করা।

এখানে ফ্রান্সের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের মধ্যে ফ্রান্স বরাবরই তুলনামূলকভাবে স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে মিত্রতা বজায় রেখেও তারা নিজস্ব অবস্থান প্রকাশ করতে পিছপা হয় না। তাই যুদ্ধ থামানো ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রশ্নে ভারত ও ফ্রান্সের স্বার্থ অনেকাংশে এক।

ইতিহাসের গভীরে যে বন্ধুত্ব

ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের শক্তি বোঝার জন্য ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়।

১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার কারণে যখন বিশ্বজুড়ে ইন্দিরা গান্ধীর সমালোচনা হচ্ছিল, তখন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জ্যাক শিরাক ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি হতে রাজি হন। পরে ১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবার ভারতে এসে ভারত-ফ্রান্স কৌশলগত অংশীদারিত্বের সূচনা করেন।

সেই একই বছরে ভারত পোখরান-২ পরমাণু পরীক্ষা চালায়। আমেরিকা-সহ বহু পশ্চিমি দেশ ভারতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু ফ্রান্স সেই পথে হাঁটেনি। তারা ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়েছিল।

এই ঘটনাই প্রমাণ করে, ফ্রান্স ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির চোখে দেখে না। তারা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে।

আস্থার রাজনীতি

দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হল ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রাস্ট’ বা কৌশলগত আস্থা।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি হিসেবে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা সম্ভব হয়নি। তখন ভারত সরাসরি এলিসি প্রাসাদে যোগাযোগ করে। ম্যাক্রোঁ কোনো দ্বিধা না করে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন, যদিও তিনি জানতেন যে তিনি প্রথম পছন্দ ছিলেন না।

আবার ২০২৫ সালে ফ্রান্সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে যোগ দিয়ে মোদী সেই সৌজন্যের প্রতিদান দেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এমন পারস্পরিক আস্থা খুব কম দেখা যায়।

প্রতিরক্ষা থেকে মহাকাশ

ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।

রাফাল যুদ্ধবিমান আজ ভারতীয় বায়ুসেনার অন্যতম প্রধান শক্তি। স্করপিন সাবমেরিন ভারতীয় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি থেকে হেলিকপ্টার ইঞ্জিন—প্রতিরক্ষার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বিস্তৃত।

মহাকাশ গবেষণাতেও রয়েছে ছয় দশকের সম্পর্ক। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এবং ফরাসি মহাকাশ সংস্থা যৌথভাবে একাধিক উপগ্রহ প্রকল্প সফল করেছে। ‘গগনযান’ মানব মহাকাশ মিশনেও ফ্রান্স গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।

পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর এবং উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তিতে যৌথ কাজের জন্য ইতিমধ্যে দুই দেশ সমঝোতা করেছে।

কেন ফ্রান্স ভারতের কাছে বিশেষ

আজকের বিশ্বে জোট রাজনীতি ক্রমশ অস্থির। ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-আমেরিকা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক পরিবেশ অনিশ্চিত।

এই পরিস্থিতিতে ভারত এমন অংশীদার চায়, যারা ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান করে। ফ্রান্স সেই বিরল কয়েকটি দেশের একটি।

ওয়াশিংটনের মতো শর্ত আরোপ নয়, বেইজিংয়ের মতো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নয়, ফ্রান্স বরাবরই ভারতকে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে দেখেছে। সেই কারণেই প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, মহাকাশ বা পরমাণু শক্তি—সব ক্ষেত্রেই প্যারিস দিল্লির কাছে নির্ভরযোগ্য।

মোদীর এবারের সফর তাই কেবল কয়েকটি চুক্তি বা যৌথ বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক সম্পর্ককে আরও গভীর করার প্রচেষ্টা, যার ভিত্তি সামরিক শক্তি নয়, অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়, বরং বহু বছরের অর্জিত বিশ্বাস।

আর আজকের অনিশ্চিত পৃথিবীতে, বিশ্বাসই সম্ভবত সবচেয়ে মূল্যবান কূটনৈতিক মুদ্রা।