অজগর যখন পাকে পাকে জড়িয়ে ধরে শিকারকে, তখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসা শিকারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাস্তবে সেইরকম দশাই বর্তমানে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর। দুর্নীতির নাগপাশে এমন ভাবে আটকে পড়ার কথা সম্ভবত ৪ঠা মে এর আগে ভাবতেই পারেনি অভিষেক। ইডি, সিআইডির তলব, ভবানীপুর থানা, ডায়মন্ড হারবার থানা, বিষ্ণুপুর থানা, বিধান নগর থানায় একের পর এক অভিযোগের পাহাড়, কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে অভিষেকের শান্তিনিকেতন বাসভবনে অবৈধ নির্মাণ ভাঙার নোটিশ এর চাপ এবং অভিষেকের মোট ২১টি সম্পত্তির তথ্য তলাশও হয়েছে।
প্রথমে সিআইডিকে এড়াতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে যোগ দেওয়ার অছিলায়, দিল্লি চলে গেলেন। এরপর কলকাতা হাইকোর্টে রক্ষাকবচ চাওয়ায় ধমক শুনলেন হাইকোর্টের। অবশেষে বাধ্য হয়ে বৃহস্পতিবার ভবানী ভবনে হাজিরা দিতে বাধ্য হলেন অভিষেক। সাড়ে পাঁচ ঘন্টা ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পরেও সন্তুষ্ট হলেন না সিআইডি-র আধিকারিকরা। ইতিমধ্যে এমন খবরও জানা যাচ্ছে যে এই জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যেই একাধিক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন অভিষেক, বিভিন্ন প্রশ্নে বারবার মেজাজ হারিয়েছেন। সেই কারণেই আবার ১৪ তারিখ ভবানীভবনে হাজিরা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের যুবরাজকে।
এ তো গেল সিআইডির কথা। অন্যদিকে এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট সোমবার অর্থাৎ ১৫ ই জুন প্রাথমিক দুর্নীতি মামলার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে অভিষেককে।
এবারে আসা যাক একাধিক থানায় দায়ের হওয়া মামলার বিষয়ে। ৫ মে জনৈক রাজীব সরকার বাগুইআটি থানায় অভিষেকের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। একাধিক জায়গায় উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। অভিষেকের বক্তব্যের সঙ্গে প্রমাণ হিসেবে তার লিংক ও তুলে ধরা হয়েছে ওই অভিযোগে।
বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় দায়ের হয় FIR. এর মধ্যে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার তিনটি ধারা রয়েছে। বিএনএস ১৯২, বিএনএস ১৯৬(জামিন অযোগ্য), বিএনএস ৩৫১/২(জামিন অযোগ্য) ধারা রয়েছে। এছাড়াও রিপ্রেজেটিয়ন অফ পাবলিক অ্যাক্টের দু’টি ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। সেই কেস নিয়েছে সিআইডি।
৪ তারিখ ডিজে বাজানো নিয়ে মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যেই বিধাননগর সাইবার থানা থেকে অভিষেকের কেস নিয়েছে সিআইডি। এ বিষয়ে কেস ডায়েরিও আগেই হস্তান্তর হয়ে গিয়েছে এবং এর পরেই অভিষেককে তলব করে শুক্রবার বিকেলেই পাঠানো হয়েছে নোটিস। এই কেসে মঙ্গলবারই তাঁকে এই কেসে তলব করা হয়েছে।
অন্যদিকে ভোটের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে অবমাননাকর এবং উস্কানিমূলক মন্তব্য করার অভিযোগে অভিষেকের বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইম থানায় অভিযোগ জানিয়েছেন শিলিগুড়ির বাসিন্দা জনৈক সঞ্জয় কুমার সিঙ্ঘল।
একই সঙ্গে মে মাসের শেষে উস্কানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগে ভবানীপুর থানাতেও অভিষেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন অর্ণবকান্তি দাস নামের ওই ব্যক্তি।
এরইমধ্যে আবার আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের খোঁজে শনিবার ভোর রাতে অভিষেকের বাড়িতে তল্লাশি চালায় শালবনী পুলিশ। এর আগে কয়লা পাচার মামলাতেও (লালা সিন্ডিকেট) নিজাম প্যালেসে ডেকে সুমিত রায়ের বয়ান রেকর্ড করেছিল সিবিআই। এবার জমি কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়েছে তাঁর। কলকাতায় অভিষেকের বাসভবনের পাশাপাশি, হুগলিতে সুমিতের বাড়িতেও তল্লাশি চালিয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানার পুলিশ। সুমিতের শ্বশুরবাড়িতেও চলেছে লাগাতার তল্লাশি। কিন্তু সেখানেও পাওয়া যায়নি সুমিতকে।
বিষ্ণুপুর থানাতেও অভিযোগ দায় করা হয়েছে। সূত্রের খবর আমফানের ত্রাণ তহবিল বণ্টনে প্রায় আড়াইশো কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এই অভিযোগে ১৩ জুন বিষ্ণুপুর থানার IC ও ডায়মন্ড হারবার SP-র কাছে লিখিত অভিযোগ করেন অভিজিৎ দাস।
অভিযোগ দায়ের হয়েছে ডায়মন্ড হারবার থানাতেও। জাহাঙ্গির খান-সহ ৪০ জনের বেশি তৃণমূল নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস ওরফে ববি। তাঁর অভিযোগ, সাড়ে ৭ বছর আগে অভিষেকের নির্দেশে তাঁর উপর প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল।
গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত অভিষেকের বাড়ি শান্তিনিকেতনের বেআইনি অংশ ভাঙতে আবারও নোটিস দিয়েছে কলকাতা পুরসভা। তা নিয়েও যথেষ্ট চাপে রয়েছেন অভিষেক। ইতিমধ্যেই ২১টি সম্পত্তির বিষয়ে রীতিমত তল্লাশি চালিয়েছে।
সবশেষে, নিজের দলেই রীতিমত কোণঠাসা হচ্ছেন অভিষেক। বিদ্রোহী সাংসদ থেকে বিধায়ক, মুখপাত্র থেকে সাধারণ দলীয় কর্মীরা সকলেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অভিষেকের বিরুদ্ধে।
সুতরাং ধীরে ধীরে দুর্নীতির যে চক্রব্যূহে আটকে পড়ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, তার থেকে মুক্তির পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।