হাইলাইটস
- দুর্গাপুজোর বিশেষ প্রবেশপত্র ও ভিআইপি পাস বণ্টনকে ঘিরে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।
- তদন্তকারীদের নজরে প্রাক্তন তৃণমূল মন্ত্রী এবং তাঁর স্ত্রীর ভূমিকা।
- অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে পুজোর টিকিট ও পাস বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে।
- একাধিক নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং মধ্যস্থতাকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
- রাজনৈতিক মহলে নতুন করে অস্বস্তি বাড়ল তৃণমূল শিবিরে।
দুর্গাপুজো শুধু বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবই নয়, বহু মানুষের কাছে এটি আবেগ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মর্যাদারও প্রতীক। সেই পুজোকেই কেন্দ্র করে যদি গড়ে ওঠে কোটি টাকার রমরমা ব্যবসা, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে ক্ষোভের জন্ম দেয়। সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে আসা তথ্যে এমনই এক অভিযোগের মুখে পড়েছেন এক প্রাক্তন তৃণমূল মন্ত্রী এবং তাঁর স্ত্রী। অভিযোগ, বিভিন্ন নামী পুজো কমিটির বিশেষ প্রবেশপত্র, ভিআইপি টিকিট এবং স্পনসরশিপ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে একটি সুসংগঠিত চক্র গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই চক্রের মাধ্যমে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য নির্ধারিত প্রবেশব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ সুবিধা বিক্রি করা হত। বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে মোটা টাকার বিনিময়ে বিশেষ পাস পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই প্রক্রিয়ায় একাধিক মধ্যস্থতাকারী সক্রিয় ছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
সূত্রের খবর, তদন্তে বেশ কিছু আর্থিক লেনদেনের হদিস পাওয়া গেছে, যার সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের নাম জড়িয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন সেই অর্থের একটি অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রীর কাছে পৌঁছেছিল কি না। ইতিমধ্যেই কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং পুজো উদ্যোক্তার বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন শুধু প্রাক্তন মন্ত্রী নন, তাঁর স্ত্রীও। তদন্তকারীদের সন্দেহ, বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন এবং সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁরও সক্রিয় ভূমিকা থাকতে পারে। কিছু নথি ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনও অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং অভিযুক্ত পক্ষ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রাজনৈতিকভাবে এই ঘটনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েক মাস ধরে রাজ্যের রাজনীতিতে একের পর এক বিতর্ক, দলবদল, তদন্ত এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। সেই আবহে পুজোর মতো একটি আবেগঘন বিষয়কে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় বিরোধীরা নতুন অস্ত্র পেয়ে গেছে। বিজেপি এবং অন্যান্য বিরোধী দল দাবি করছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মঞ্চকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, তদন্তের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের দাবি, এখনও পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ সামনে আসেনি এবং শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তবে দলের অন্দরেই অনেকে মনে করছেন, এই ধরনের অভিযোগ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং সংগঠনের ভাবমূর্তিকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার গুরুত্ব শুধু আর্থিক অনিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুর্গাপুজো এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সেই উৎসবকে কেন্দ্র করে যদি প্রভাব, অর্থ এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা বেচাকেনার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্যও বড় ধাক্কা হবে।
তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও ঘটনাটি ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আগামী দিনে জিজ্ঞাসাবাদ, নথি যাচাই এবং আর্থিক অনুসন্ধান থেকে কী তথ্য উঠে আসে, তার উপরই নির্ভর করবে মামলার ভবিষ্যৎ। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট, পুজোর টিকিট কেলেঙ্কারি ঘিরে প্রাক্তন মন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রীর উপর তদন্তের চাপ ক্রমশ বাড়ছে, আর সেই চাপের রাজনৈতিক অভিঘাতও কম নয়