Home দৃষ্টিভঙ্গিবিশ্লেষণ সিংহাসনের চেয়ে সন্তান বড়: অন্ধ স্নেহে রাজ্যপাট হারানো শাসকদের ইতিহাস

সিংহাসনের চেয়ে সন্তান বড়: অন্ধ স্নেহে রাজ্যপাট হারানো শাসকদের ইতিহাস

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 6 views 4 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ভুলগুলোর একটি হল এই বিশ্বাস যে, নিজের রক্তের সম্পর্ক মানেই সবচেয়ে বিশ্বস্ত সম্পর্ক। ক্ষমতার শীর্ষে বসে এই ভুলটি করেছেন অসংখ্য রাজা, সম্রাট, নবাব, রাষ্ট্রনেতা। তাঁরা ভেবেছিলেন, মন্ত্রী বিশ্বাসঘাতক হতে পারে, সেনাপতি বিদ্রোহ করতে পারে, দলের সহকর্মী দলবদল করতে পারে কিন্তু ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, ভাইপো বা জামাই কখনও তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বাস্তবতা ঠিক উল্টো।

প্রতিবার যখন কোনও শাসক রাষ্ট্রের স্বার্থের ওপরে পরিবারের স্বার্থকে বসিয়েছেন, তখনই বিপর্যয়ের বীজ বপন হয়েছে। সেই বীজ কখনও দ্রুত, কখনও ধীরে অঙ্কুরিত হয়েছে। কিন্তু ফলাফল প্রায় সর্বদাই এক — ক্ষমতার পতন।

ধৃতরাষ্ট্র: অন্ধত্ব শুধু চোখে ছিল না

ভারতীয় রাজনৈতিক সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ সম্ভবত ধৃতরাষ্ট্র।

তিনি জন্মান্ধ ছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রকৃত অন্ধত্ব ছিল পুত্রস্নেহে। দুর্যোধন যে রাজ্যকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, তা তিনি জানতেন। বিদুর বারবার সতর্ক করেছিলেন। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃষ্ণ সকলেই সতর্ক করেছিলেন।

কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের কাছে রাষ্ট্রের চেয়ে বড় ছিল পুত্র।

ফল কী হল? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুধু তাঁর একশো পুত্রকেই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছিল সমগ্র কুরুবংশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ধৃতরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত যা বাঁচাতে চেয়েছিলেন, সেটাই হারিয়েছিলেন।

ইতিহাসে এই ঘটনা এতটাই শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে যে আজও রাজনৈতিক অভিধানে “ধৃতরাষ্ট্রসুলভ আচরণ” কথাটি ব্যবহৃত হয়।

মার্কাস অরেলিয়াস: দার্শনিক সম্রাটের মারাত্মক ভুল

রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন মার্কাস অরেলিয়াস।

তাঁর আগে বহু সম্রাট যোগ্য উত্তরসূরি দত্তক নিয়ে সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু মার্কাস অরেলিয়াস ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি নিজের ছেলে কমোডাসকে উত্তরাধিকারী করলেন।

সমস্যা হল, কমোডাস ছিলেন বিলাসপ্রিয়, আত্মমুগ্ধ এবং প্রশাসনে অযোগ্য।

ফলাফল? রোমের তথাকথিত “সোনালি যুগ”-এর অবসান ঘটে। সাম্রাজ্য দ্রুত অবক্ষয়ের পথে এগোতে শুরু করে। বহু ঐতিহাসিক মনে করেন, মার্কাস অরেলিয়াসের এই একটিমাত্র পারিবারিক সিদ্ধান্ত রোমান ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। একজন মহান সম্রাট নিজের ছেলের ব্যাপারে নিরপেক্ষ হতে পারেননি।

শাহজাহান: পুত্রদের জন্য তৈরি সাম্রাজ্য, পুত্রদের হাতেই বন্দিত্ব

শাহজাহান তাঁর সাম্রাজ্যকে পরিবারের সম্পত্তি হিসেবেই দেখতেন। পুত্রদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার বদলে তিনি তাঁদের প্রতিযোগিতার ময়দানে নামিয়ে দিয়েছিলেন।

ফলাফল ছিল ভয়াবহ।

দারাশিকোহ, শুজা, মুরাদ এবং ঔরঙ্গজেব — চার ভাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ঔরঙ্গজেব জয়ী হন এবং নিজের বাবাকেই আগ্রা দুর্গে বন্দি করেন।

যে সম্রাট তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন, জীবনের শেষ আট বছর কাটাতে হয়েছিল বন্দি অবস্থায়। পরিবারকেন্দ্রিক উত্তরাধিকার রাজনীতির মূল্য তাঁকে ব্যক্তিগতভাবেও দিতে হয়েছিল।

লুই ষোড়শ ও মেরি আঁতোয়ানেত

লুই ষোড়শের দুর্বলতার অন্যতম কারণ ছিল তাঁর রাজপরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে না পারা।

ফরাসি জনগণ যখন ক্ষুধা, ঋণ এবং বেকারত্বে জর্জরিত, তখন রাজদরবারের চাকচিক্য এবং বিশেষ করে মেরি আঁতোয়ানেতের বিলাসিতার ভাবমূর্তি জনরোষ বাড়িয়ে তুলছিল।

রাজা প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে সাহস পাননি। কারণ তা করলে রাজপরিবারের স্বার্থে আঘাত লাগত।

শেষ পর্যন্ত ফরাসি বিপ্লব রাজতন্ত্রকেই গিলে ফেলে। রাজপরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি রাজপরিবারকেই হারালেন।

নিকোলাস দ্বিতীয়: পরিবার আগে, রাশিয়া পরে

রাশিয়ার শেষ জার নিকোলাস দ্বিতীয়ের কাহিনি আরও নাটকীয়।

তাঁর ছেলে আলেক্সেই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিলেন রহস্যময় সন্ন্যাসী গ্রিগরি রাসপুতিন। সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রা রাসপুতিনের প্রতি অন্ধ আস্থা তৈরি করেন। নিকোলাসও সেই প্রভাব কাটাতে পারেননি।

ফলে রাশিয়ার প্রশাসন নিয়ে জনমনে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয় পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে। ১৯১৭ সালের বিপ্লব শুধু রোমানভ রাজবংশকেই সরায়নি; পুরো সাম্রাজ্যব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছিল।

চিয়াং কাই-শেক: পুত্র উত্তরাধিকার বনাম রাষ্ট্র

চিয়াং কাই-শেক দীর্ঘদিন ধরে নিজের পরিবারকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন।

কুওমিনতাংয়ের বহু নেতা মনে করতেন, দল ক্রমশ একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। তাঁর পুত্র চিয়াং চিং-কুও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পান।

যদিও তাইওয়ানে এই উত্তরাধিকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়নি, তবুও মূল ভূখণ্ড চীনে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ক্ষমতার চিরন্তন ফাঁদ

এই গল্পগুলোর মধ্যে সময়ের দূরত্ব হাজার হাজার বছর। সংস্কৃতি আলাদা, ধর্ম আলাদা, ভাষা আলাদা।

কিন্তু ভুলটি একই।

শাসকরা মনে করেন, পরিবারের লোককে ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখলে তাঁরা নিরাপদ থাকবেন। বাস্তবে হয় উল্টোটা। কারণ তখন যোগ্যতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের জায়গা দখল করে নেয় আনুগত্য।

রাষ্ট্র ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান থেকে পরিবারে পরিণত হয়।

আর যখন রাষ্ট্র পরিবারে পরিণত হয়, তখন বিরোধিতা আর নীতিগত থাকে না; তা ব্যক্তিগত হয়ে যায়। ক্ষোভ জমতে থাকে। সহযোগীরা দূরে সরে যায়। যোগ্য মানুষরা অপমানিত বোধ করেন। একসময় ক্ষমতার প্রাসাদের ভেতরেই তৈরি হয় আগ্নেয়গিরি।

ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম বিদ্রূপ সম্ভবত এটাই — যাঁরা পরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে রাষ্ট্রকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত পরিবারকেও বাঁচাতে পারেননি।

ধৃতরাষ্ট্র দুর্যোধনকে হারিয়েছেন। শাহজাহান পুত্রদের হাতে বন্দি হয়েছেন। নিকোলাস দ্বিতীয় গোটা পরিবারসহ নিহত হয়েছেন। লুই ষোড়শ ও মেরি আঁতোয়ানেত গিলোটিনে প্রাণ দিয়েছেন।

ক্ষমতার ইতিহাস তাই এক কঠিন শিক্ষা দেয়: রাষ্ট্রের শাসক হওয়া যায়, পরিবারের অভিভাবকও হওয়া যায়। কিন্তু এই দুই ভূমিকাকে এক করে ফেললে, শেষ পর্যন্ত সিংহাসনও যায়, পরিবারও যায়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles