Home খবর দিল্লিতে ডিইউ-র সহকারী অধ্যাপিকা খুন

দিল্লিতে ডিইউ-র সহকারী অধ্যাপিকা খুন

সম্পত্তি-বিবাদের জেরে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার বর্ধমানের বাসিন্দা

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 6 views 3 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লির শান্ত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা এনক্লেভের একটি বহুতল আবাসনে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে রাজধানী থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত শিবাজি কলেজের সহকারী অধ্যাপিকা দেবস্মিতা পলকে তাঁর নিজস্ব ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় উদ্ধারের পর শুরু হয় জোরদার তদন্ত। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই পুলিশ দাবি করেছে, এই হত্যার পেছনে রয়েছে বহুদিনের সম্পত্তি-বিবাদ, আর সেই সূত্র ধরেই গ্রেফতার করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের বাসিন্দা রামপ্রসাদ দাস ও তাঁর স্ত্রী বংশ্রী দাসকে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দেবস্মিতা পল পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভের সত্যম অ্যাপার্টমেন্টে একাই থাকতেন। ২০২২ সালে বিচ্ছেদের পর থেকে তিনি একা বসবাস করছিলেন; তাঁর প্রাক্তন স্বামী বেঙ্গালুরুতে কর্মরত। বুধবার তাঁকে হত্যা করা হয় এবং বৃহস্পতিবার প্রতিবেশীরা তাঁর ফ্ল্যাট থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেহ উদ্ধার করেন। প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, তাঁকে কোনো ভোঁতা বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। ঘটনাস্থলের অবস্থা দেখে তদন্তকারীদের অনুমান, খুনটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে।

পুলিশের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। ফুটেজে দেখা যায়, অভিযুক্ত দম্পতি সার্জিক্যাল মাস্ক পরে প্রাইভেট ক্যাবে আবাসনে আসে। তারা লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করে সরাসরি ষষ্ঠ তলায় ওঠে। সন্দেহ এড়াতে তারা তাদের নাবালক পুত্রকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করেন। পরে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত তথ্য, মোবাইল ফোনের অবস্থান এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ওই দম্পতির সন্ধান মেলে। সাত দলের পুলিশি অভিযানে চার রাজ্যে তল্লাশি চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বর্ধমানে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ড ঘটানোর প্রায় আধঘণ্টা পরে অভিযুক্তরা কাপড় পরিবর্তন করে আবাসনের বাইরে অপেক্ষারত ক্যাবে করে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তারা রেলস্টেশনে পৌঁছে পশ্চিমবঙ্গমুখী ট্রেনে ওঠার পরিকল্পনা করেছিল। তবে তার আগেই তদন্তকারীরা তাদের গতিবিধি চিহ্নিত করতে সক্ষম হন এবং শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করেন।

তদন্তে উঠে এসেছে সম্পত্তি-সংক্রান্ত এক জটিল বিরোধের কথা। দেবস্মিতা পল

পরিবারের বর্ধমানে একাধিক মূল্যবান সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তারই একটি বাড়িতে অভিযুক্ত দম্পতি ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করত। পুলিশের দাবি, তারা প্রতি মাসে ১১,৫০০ টাকা ভাড়া দিত এবং বাড়িটির সংস্কারের জন্য প্রায় দেড় লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিল।

শুধু বসবাসই নয়, ওই সম্পত্তিতে তারা একটি লাভজনক স্যানিটারি সামগ্রীর ব্যবসাও চালাত। ফলে বাড়িটির সঙ্গে তাদের আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে। তদন্তকারীদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক মালিক-ভাড়াটের সীমা ছাড়িয়ে বিরোধে পরিণত হয়।

পুলিশের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথমে বাড়িটি কিনে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরে তিনি দীর্ঘমেয়াদি ভাড়া-সমঝোতার পথেও যেতে রাজি ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে যখন তাঁকে বাড়ি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তকারীদের দাবি, আগামী জুন মাসের মধ্যে ওই সম্পত্তি ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল অভিযুক্তদের।

পুলিশের ধারণা, উচ্ছেদের আশঙ্কা এবং সম্পত্তি নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিরোধ থেকেই ক্ষোভের জন্ম হয়। সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত হত্যার রূপ নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা সম্পত্তি-বিবাদের বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে দাবি পুলিশের, যদিও আদালতে এই দাবি কতটা টিকবে, তা বিচার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।

এই ঘটনায় একাধিক প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। প্রথমত, দিল্লির মতো শহরে একা বসবাসকারী পেশাজীবীদের নিরাপত্তা কতটা সুনিশ্চিত? দ্বিতীয়ত, সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকেও থাকলে তার কোনও আইনি সমাধানের চেষ্টা হয়েছিল কি না? তৃতীয়ত, ভাড়াটে ও সম্পত্তি-মালিকের মধ্যে সম্পর্ক যখন তিক্ত হয়ে উঠছিল, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি?

শিক্ষাজগতেও এই ঘটনায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মীরা জানিয়েছেন, দেবস্মিতা পল একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। তাঁর অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু সহকর্মী এবং ছাত্রছাত্রীদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল যে সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ ভারতে কত দ্রুত সহিংস রূপ নিতে পারে। আদালতে বছরের পর বছর মামলা চলা, উচ্ছেদ নিয়ে টানাপোড়েন এবং আর্থিক স্বার্থের সংঘাত অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ককে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। তবে কোনও বিরোধের সমাধান কখনওই হত্যাকাণ্ড হতে পারে না।

বর্তমানে রামপ্রসাদ দাস ও বংশ্রী দাসের বিরুদ্ধে খুন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। তাদের নাবালক পুত্রকেও আটক করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ট্রান্সিট রিমান্ড নিয়ে তাদের দিল্লিতে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। হত্যার পরিকল্পনা কতদিন ধরে চলছিল এবং এতে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, সেই দিকটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দিল্লির এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি অপরাধের ঘটনা নয়; এটি সম্পত্তি-বিবাদ, আইনি অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত কীভাবে একটি শিক্ষিত সমাজেও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার এক নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে। দেবস্মিতা পলের মৃত্যু এখন বিচারব্যবস্থার সামনে এক বড় পরীক্ষা — দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী শিক্ষা নেওয়া যায়, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles