হাইলাইটস
- ডালাসে প্রায় ৩০ বছর ধরে থাকা বিখ্যাত ‘Ocean Life’ মুরালটি বিশ্বকাপ-সংক্রান্ত নতুন চিত্র আঁকার জন্য ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
- মুরালটির স্রষ্টা মার্কিন শিল্পী রবার্ট ওয়াইল্যান্ড (Wyland) দাবি করেছেন, তাঁকে কোনও সতর্কবার্তা বা অনুমতির জন্য যোগাযোগই করা হয়নি।
- বিষয়টি জানার পর ফিফার বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করেছেন তিনি।
- ওয়াইল্যান্ডের অভিযোগ, এটি শুধু তাঁর শিল্পকর্মের ক্ষতি নয়, জনসাধারণের শিল্পঐতিহ্যের ওপরও আঘাত।
- এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনসমক্ষে থাকা শিল্পকর্মের মালিকানা ও সংরক্ষণ নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা কিজে নিজের স্টুডিওতে তখন স্বাভাবিক দিনের মতোই কাজ করছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী রবার্ট ওয়াইল্যান্ড। কখনও ক্যানভাসে রঙ তুলছেন, কখনও বা সমুদ্রজীবনের ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যস্ত। এমন সময় তাঁর সহকারী এসে এমন একটি খবর দিলেন, যা শুনে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান।
সহকারী জানালেন, টেক্সাসের ডালাস শহরে তাঁর বিখ্যাত মুরাল ‘Ocean Life’-এর ওপর সাদা কিংবা নীল রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে ওয়াইল্যান্ড বিশ্বাসই করতে পারেননি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে সেই দেয়ালের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ছবিগুলো দেখে তাঁর সন্দেহ সত্যি বলে প্রমাণিত হয়।
৬৯ বছর বয়সি ওয়াইল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম পরিচিত পাবলিক আর্ট শিল্পী। তাঁর আঁকা বিশালাকৃতির ‘Whaling Wall’ সিরিজ আমেরিকার নানা শহর এবং বিদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে। তিমি, ডলফিন ও সমুদ্রজীবনের শান্ত ও মহিমান্বিত চিত্রায়ণের জন্য এই মুরালগুলো বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
ডালাসের ‘Ocean Life’ ছিল তাঁর প্রিয় কাজগুলোর একটি। প্রায় ৮২ ফুট উঁচু এই মুরালটি নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে আঁকা হয়েছিল। তিন দশক ধরে এটি শহরের একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবির রং কিছুটা ফিকে হয়ে গিয়েছিল, কোথাও কোথাও ফাটলও ধরেছিল। তবে ওয়াইল্যান্ড নিয়মিত তাঁর পুরোনো কাজগুলোর সংস্কার করেন এবং ‘Ocean Life’-এর ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে সেই পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু সেই সুযোগ আর মিলল না।
শুরুতে কেউই বুঝতে পারছিলেন না কেন এতদিনের পরিচিত একটি জনশিল্পকর্ম হঠাৎ করে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। শিল্পীর ফাউন্ডেশনের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেন। অতীতে তাঁর কিছু মুরাল হারিয়ে গেছে—মূলত ভবন ভেঙে ফেলার কারণে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রেও সাধারণত পরিস্থিতি স্পষ্ট ছিল। এবার না ছিল কোনও আগাম নোটিশ, না ছিল কোনও পরামর্শ।
কিছুদিনের মধ্যেই প্রকৃত কারণ সামনে আসে।
জানা যায়, ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ডালাসে একটি নতুন প্রচারমূলক মুরাল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর সেই নতুন শিল্পকর্মের জন্যই ওয়াইল্যান্ডের ‘Ocean Life’ সম্পূর্ণভাবে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
খবরটি জানার পরই শিল্পীর আইনজীবীরা প্রথমে ‘Cease and Desist’ নোটিশ পাঠান। এরপর খুব দ্রুত ফিফার বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা দায়ের করা হয়।
ওয়াইল্যান্ডের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট।
“এটা নিঃসন্দেহে ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই,” তিনি বলেছেন। “ওরা বহু বিলিয়ন ডলারের সংস্থা, আর আমি একজন শিল্পী, যার একটি ছোট ফাউন্ডেশন রয়েছে। কিন্তু তারা ভুল শিল্পীকে বেছে নিয়েছে, ভুল শিল্পকর্মকে ধ্বংস করেছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে এটা হতে দেব না।”
শিল্পীর মতে, এখানে শুধু একটি ছবি মুছে ফেলার প্রশ্ন নয়। এটি জনসমক্ষে থাকা শিল্পকর্মের মর্যাদা, শিল্পীর অধিকার এবং শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নও তুলে ধরছে।
ডালাসের বহু বাসিন্দার কাছেও ‘Ocean Life’ কেবল একটি দেয়ালচিত্র ছিল না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেটিকে শহরের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখেছে। ফলে মুরালটি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থানীয় স্তরেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এই মামলার ফলাফল এখন শিল্পী মহল, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণকারীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ আদালতের রায় ভবিষ্যতে জনসমক্ষে থাকা শিল্পকর্মের আইনি সুরক্ষা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
একদিকে ফুটবল বিশ্বকাপের জাঁকজমকপূর্ণ বিপণন প্রচার, অন্যদিকে তিন দশকের পুরোনো এক শিল্পঐতিহ্যের বিলুপ্তি—এই দ্বন্দ্বই এখন ডালাস থেকে আন্তর্জাতিক শিল্পমহলের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ওয়াইল্যান্ডের ভাষায়, “এটি শুধু একটি দেয়াল নয়। এটি মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস এবং শিল্পের প্রতি সম্মানের প্রশ্ন।”