দক্ষিণ ভারতের এক প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের ছেলেটি যখন প্রথম হারমোনিয়ামের সামনে বসেছিল, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে একদিন সে ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায় রচনা করবে, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে আজও তিনি শুধু একজন সুরকার নন; তিনি এক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, এক চলমান বিশ্ববিদ্যালয়, এক রহস্য। তাঁর নাম—Ilaiyaraaja।
ভারতীয় চলচ্চিত্রসঙ্গীতের ইতিহাসে অনেক মহীরুহ এসেছেন। কেউ সুরের জাদুকর, কেউ প্রযুক্তির বিপ্লবী, কেউ বা জনপ্রিয়তার শিখরে আরোহনকারী। কিন্তু ইলাইয়ারাজার বিশেষত্ব অন্যত্র। তিনি যেন একসঙ্গে তিনটি জগতের বাসিন্দা—গ্রামের লোকসঙ্গীত, কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং পাশ্চাত্য ধ্রুপদী অর্কেস্ট্রার বিস্তৃত মহাবিশ্ব। এই তিন ধারাকে এমন স্বাভাবিকভাবে তিনি মিলিয়েছেন যে কখনও মনে হয় না সেখানে কোনও জোড়াতালি আছে। বরং মনে হয়, সুরের ভাষা তো এমনই হওয়ার কথা ছিল।
১৯৪৩ সালে তামিলনাড়ুর পন্নাইপুরম গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর শৈশব ছিল অভাবের। কিন্তু সঙ্গীতের অভাব ছিল না। গ্রামীণ উৎসব, মন্দিরের গান, লোকসঙ্গীতের আসর—সবকিছুই ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা। কৈশোরে তিনি বড় ভাইয়ের ভ্রাম্যমাণ সঙ্গীতদলের সঙ্গে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরেছেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন এক শ্রবণশক্তি দিয়েছিল, যা পরে তাঁর সৃষ্টির ভিত হয়ে ওঠে।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন তামিল চলচ্চিত্রে তাঁর আগমন, তখন দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সঙ্গীত এক ধরনের পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিল। ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত Annakili ছবির গান সেই পরিবর্তনের সূচনা করল। শহুরে অর্কেস্ট্রেশনের বদলে সেখানে ছিল গ্রামের গন্ধ, মাটির সুর, মানুষের জীবনের শব্দ। শ্রোতারা যেন নিজেদেরই কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন।
এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
পরবর্তী কয়েক দশকে ইলাইয়ারাজা হাজারেরও বেশি চলচ্চিত্রে সুর দিয়েছেন, কয়েক হাজার গান সৃষ্টি করেছেন। সংখ্যাটা যত বিস্ময়কর, তার চেয়েও বিস্ময়কর তাঁর বৈচিত্র্য। প্রেমের গান, ভক্তিগীতি, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, বিষাদ, আনন্দ, বৃষ্টি, একাকীত্ব—মানবিক অনুভূতির প্রায় প্রতিটি রঙ তিনি সুরে রূপ দিয়েছেন।
তাঁর সঙ্গীতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, তিনি নীরবতাকেও সুরের অংশ করে তুলতে পারেন। অনেক সুরকারের সংগীতে যন্ত্রের আধিক্য থাকে, কিন্তু ইলাইয়ারাজা জানেন কোথায় থামতে হয়। কখনও একটি বাঁশির একক সুর, কখনও দূরে ভেসে আসা বেহালার রেখা, কখনও বা কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা—এইসবই তাঁর সুরকে গভীরতা দেয়।
আসলে তিনি শুধু গান লেখেন না; তিনি শব্দ দিয়ে দৃশ্য নির্মাণ করেন।
আধুনিক ভারতীয় চলচ্চিত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বা আবহসঙ্গীতের গুরুত্ব আজ স্বীকৃত। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও ইলাইয়ারাজা ছিলেন পথিকৃৎ। তিনি বুঝেছিলেন, সিনেমার সঙ্গীত কেবল গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চরিত্রের মনস্তত্ত্ব, দৃশ্যের আবেগ, এমনকি অদৃশ্য উত্তেজনাকেও সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। তাঁর বহু চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীত নিজেই এক স্বাধীন শিল্পকর্ম।
তাঁর সৃষ্টির আরেকটি বিস্ময়কর দিক হল পাশ্চাত্য সিম্ফনিক সংগীতের ব্যবহার। ভারতীয় চলচ্চিত্রে পশ্চিমা যন্ত্রের ব্যবহার নতুন ছিল না, কিন্তু ইলাইয়ারাজা পশ্চিমা অর্কেস্ট্রেশনের ব্যাকরণকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন। তিনি শুধু বেহালা বা চেলো ব্যবহার করেননি; তিনি সম্পূর্ণ সিম্ফনিক কাঠামোকে ভারতীয় সুরের সঙ্গে মিশিয়েছেন।
এই কারণেই তাঁকে প্রায়শই সেতুবন্ধনকারী শিল্পী বলা হয়—পূর্ব ও পশ্চিমের, লোক ও ধ্রুপদীর, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে।
বিস্ময়কর বিষয় হল, তিনি কখনও নিজেকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যস্ত শিল্পী হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং সময়ই যেন বারবার তাঁর কাছে ফিরে এসেছে। ক্যাসেট যুগ থেকে সিডি, সিডি থেকে ডিজিটাল স্ট্রিমিং—প্রযুক্তি বদলেছে, শ্রোতার অভ্যাস বদলেছে, কিন্তু তাঁর সঙ্গীতের আবেদন ম্লান হয়নি।
একসময় তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বহু শিল্পীর নাম উচ্চারিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের সুরকাররা এসেছেন, নতুন প্রযুক্তি এসেছে, নতুন সাউন্ডস্কেপ তৈরি হয়েছে। তবু ইলাইয়ারাজার সৃষ্টিকে অতিক্রম করা যায়নি। কারণ তাঁর সংগীতের কেন্দ্রে প্রযুক্তি নয়, মানবিক অভিজ্ঞতা।
তাঁর সুরে গ্রামের সন্ধ্যা যেমন আছে, তেমনই আছে শহরের নিঃসঙ্গ রাত। আছে প্রেমিকের অপেক্ষা, মায়ের উদ্বেগ, শ্রমিকের ক্লান্তি, শিশুর বিস্ময়। ফলে তাঁর গান কোনও নির্দিষ্ট সময়ের নয়; তারা সময় অতিক্রম করে।
বিগত কয়েক বছরে তিনি নতুন এক অধ্যায়ও শুরু করেছেন। চলচ্চিত্রসঙ্গীতের গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি পশ্চিমা ধ্রুপদী সিম্ফনি রচনায় মনোনিবেশ করেছেন। বহু বছর আগে যে যুবক ইউরোপীয় সঙ্গীততত্ত্ব অধ্যয়ন করেছিলেন, তিনি আজ সেই জগতেও নিজের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; ভারতীয় সুরকারদের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তাঁর ব্যক্তিত্বও তাঁর সঙ্গীতের মতোই জটিল। কখনও তিনি স্পষ্টভাষী, কখনও বিতর্কিত, কখনও একরোখা। সমালোচকদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছেন, শিল্পীজগতের নানা বিতর্কের কেন্দ্রেও থেকেছেন। কিন্তু এসবের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি আপস করতে শেখেননি। তাঁর কাছে সঙ্গীত কোনও পণ্য নয়; এটি এক ধরনের সাধনা।
এই কারণেই হয়তো তাঁর সৃষ্টির মধ্যে এখনও সেই তীব্রতা রয়েছে, যা বহু শিল্পী দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষে হারিয়ে ফেলেন।
আজ যখন ভারতীয় সঙ্গীতজগৎ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, অ্যালগরিদম জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নির্ধারণ করছে, তখন ইলাইয়ারাজার উপস্থিতি যেন অন্য এক যুগের স্মারক। তিনি মনে করিয়ে দেন যে মহান সঙ্গীতের জন্ম হয় না বাজারের চাহিদা থেকে; জন্ম হয় গভীর শ্রবণ, দীর্ঘ অনুশীলন এবং মানুষের জীবনকে মন দিয়ে দেখার ক্ষমতা থেকে।
পঞ্চাশ বছর পর ফিরে তাকালে তাঁর যাত্রাকে কেবল সফল বলা অন্যায় হবে। এটি এক সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ইতিহাস। তিনি শুধু গান রচনা করেননি; তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের স্মৃতির ভাণ্ডার নির্মাণ করেছেন। দক্ষিণ ভারতের কোনও গ্রামে বৃষ্টির দিনে বাজতে থাকা একটি পুরোনো গান, কলকাতার কোনও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্যাসেট সংগ্রহ, কিংবা বিদেশে বসবাসকারী কোনও ভারতীয়ের নস্টালজিয়া—সবখানেই তাঁর সুরের উপস্থিতি।
কিছু শিল্পী তাঁদের সময়কে সংজ্ঞায়িত করেন। কিছু শিল্পী সময়কে অতিক্রম করেন। ইলাইয়ারাজা সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁদের সুর শুনলে মনে হয়—সময় বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোথাও এক অনন্ত রাগ এখনও বেজে চলেছে। সেই রাগের মধ্যে আছে গ্রাম, শহর, প্রেম, বেদনা, স্মৃতি, ভবিষ্যৎ—আর আছেন এক মানুষ, যিনি পঞ্চাশ বছর পরেও সঙ্গীতকে নতুন করে কল্পনা করে চলেছেন।