Home সংস্কৃতি ও বিনোদন রাসকিন বন্ডের ৯২-এ: পাহাড়, বৃষ্টি, শৈশব আর জীবনের অনিশ্চয়তার এক অনন্য কথক

রাসকিন বন্ডের ৯২-এ: পাহাড়, বৃষ্টি, শৈশব আর জীবনের অনিশ্চয়তার এক অনন্য কথক

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 3 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ৯২ বছরে পা দিলেন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক রাসকিন বন্ড।
  • তাঁর বিশ্বাস ছিল—“Life is just a game of chance” বা জীবন মূলত ঘটনাচক্রেরই খেলা।
  • সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতীয় পাঠকদের কল্পনা, স্মৃতি ও অনুভূতির জগৎ সমৃদ্ধ করেছেন।
  • দেরাদুন ও মুসৌরির পাহাড় তাঁর সাহিত্যজগতের স্থায়ী চরিত্র হয়ে উঠেছে।
  • শিশুসাহিত্য থেকে মানবজীবনের নিঃসঙ্গতা—সবকিছুই উঠে এসেছে তাঁর সরল অথচ গভীর লেখায়।

ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে এমন লেখক খুব কমই আছেন, যাঁদের নাম শুনলেই পাঠকের মনে একসঙ্গে ভেসে ওঠে পাহাড়ি পথ, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, পুরনো গাছ, ছোট্ট রেলস্টেশন, নির্জন বিকেল আর হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি। রাসকিন বন্ড সেই বিরল লেখকদের একজন।

৯২ বছরে পা রেখে তিনি যেন শুধু একজন সাহিত্যিক নন, এক চলমান স্মৃতিভাণ্ডার। তাঁর জীবন ও সাহিত্য ভারতের এক বিশেষ সময়ের ইতিহাসও বটে। এমন এক সময়, যখন শহর এত ব্যস্ত ছিল না, মানুষ এত তাড়াহুড়ো করত না, আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি অন্তরঙ্গ।

কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে রাসকিন বন্ড বলেছিলেন, “Life is just a game of chance।” বাংলা করলে দাঁড়ায়—জীবন আসলে ঘটনাচক্রের খেলা। এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তাঁর জীবনদর্শন।

কারণ তাঁর নিজের জীবনও তো ছিল অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ভরা।

১৯৩৪ সালে হিমাচল প্রদেশের কসৌলিতে জন্মগ্রহণ করেন রাসকিন বন্ড। শৈশব কেটেছে জামনগর, দেরাদুন, শিমলা ও অন্যান্য পাহাড়ি অঞ্চলে। ছোটবেলাতেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আরও বড় আঘাত আসে যখন মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রিয় বাবাকে হারান।

এই ব্যক্তিগত শোকই পরে তাঁর লেখার অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে।

রাসকিন বন্ডের বহু গল্পে যে নিঃসঙ্গ শিশু, যে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব, যে অসম্পূর্ণ সম্পর্কের বেদনা দেখা যায়, তার পেছনে রয়েছে তাঁর নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা।

মাত্র সতেরো বছর বয়সে তিনি লিখেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস, The Room on the Roof। সেই বইই তাঁকে রাতারাতি সাহিত্যজগতে পরিচিত করে তোলে। উপন্যাসটি পুরস্কারও পায়।

কিন্তু খ্যাতির ঝলকানি তাঁকে কখনও বদলে দিতে পারেনি।

অনেক লেখক মহানগরের সাহিত্যিক আড্ডা, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কিংবা বুদ্ধিজীবী পরিসরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত থাকেন। রাসকিন বন্ড বরাবরই তার উল্টো পথে হেঁটেছেন। তিনি বেছে নিয়েছেন মুসৌরির শান্ত পাহাড়।

আজও Mussoorie-র নাম উচ্চারণ করলে অনেকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে রাসকিন বন্ডের মুখ।

পাহাড় তাঁর কাছে শুধু বাসস্থান ছিল না, ছিল এক জীবন্ত চরিত্র। তাঁর গল্পে গাছেরা কথা বলে, বৃষ্টি স্মৃতির দরজা খুলে দেয়, পথঘাট মানুষের মতোই অনুভূতি বহন করে।

ভারতীয় সাহিত্যে প্রকৃতিকে এত স্নেহ ও মমতার সঙ্গে খুব কম লেখকই তুলে ধরেছেন।

রাসকিন বন্ডের আরেকটি বিশেষত্ব ছিল তাঁর ভাষা।

তিনি কখনও জটিল শব্দের জাদু দেখাতে চাননি। তাঁর বাক্যগুলো ছোট, সহজ এবং স্বচ্ছ। কিন্তু সেই সরলতার মধ্যেই ছিল গভীর আবেগ।

অনেক সাহিত্য সমালোচক বলেন, রাসকিন বন্ডের প্রকৃত শক্তি তাঁর গল্প বলার ক্ষমতায় নয়, বরং তাঁর পর্যবেক্ষণশক্তিতে। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে অসাধারণ করে তুলতে পারতেন।

একটি পুরনো গাছ, জানলার ধারে বসে থাকা এক বৃদ্ধ, ট্রেনের কামরায় অচেনা সহযাত্রী, কিংবা বৃষ্টিভেজা বিকেল—এসবই তাঁর হাতে সাহিত্য হয়ে উঠেছে।

তাঁর বিখ্যাত গল্প The Blue Umbrella কিংবা A Flight of Pigeons-এ যেমন মানবিকতার উষ্ণতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভারতীয় সমাজ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা।

শিশুসাহিত্যের জগতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভারতের একাধিক প্রজন্ম বড় হয়েছে তাঁর গল্প পড়ে। এমন অনেক পাঠক আছেন, যাঁদের বই পড়ার অভ্যাসের শুরুই রাসকিন বন্ডকে দিয়ে।

তাঁর গল্পে অ্যাডভেঞ্চার আছে, রহস্য আছে, কিন্তু তার থেকেও বেশি আছে মানবিকতা।

এই কারণেই শিশুরা যেমন তাঁকে ভালোবাসে, তেমনি প্রাপ্তবয়স্করাও বারবার তাঁর কাছে ফিরে আসে।

রাসকিন বন্ডের লেখায় বারবার ফিরে আসে স্মৃতি। তবে সেই স্মৃতি কখনও কেবল অতীতচর্চা নয়। বরং স্মৃতির মাধ্যমে তিনি বর্তমানকে বোঝার চেষ্টা করেন।

তিনি জানতেন, মানুষ যত আধুনিকই হোক, তার ভেতরে কোথাও না কোথাও একটি শিশু বেঁচে থাকে। সেই শিশুর সঙ্গে কথোপকথনই যেন তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রধান কাজ।

সময়ের সঙ্গে ভারত বদলেছে। বদলেছে শহর, প্রযুক্তি, মানুষের জীবনযাপন।

কিন্তু রাসকিন বন্ডের জনপ্রিয়তা কমেনি।

এর কারণ সম্ভবত এই যে, তাঁর লেখা আমাদের এমন এক পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে এখনও ধীরে হাঁটার সুযোগ আছে, যেখানে পাখির ডাক শোনা যায়, যেখানে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার মূল্য এখনও ফুরিয়ে যায়নি।

আজ যখন পৃথিবী ক্রমশ দ্রুততর, উদ্বিগ্ন এবং বিভক্ত হয়ে উঠছে, তখন রাসকিন বন্ডের লেখা যেন এক ধরনের আশ্রয়।

তিনি আমাদের শেখান, জীবনের বড় সত্যগুলো প্রায়ই ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে।

আর তাই হয়তো ৯২ বছর বয়সেও তাঁর সেই কথাটি নতুন করে অর্থবহ মনে হয়—“Life is just a game of chance।”

জীবন সত্যিই অনিশ্চিত। কে কোথায় জন্মাবে, কাকে হারাবে, কাকে ভালোবাসবে, কোন পথে হাঁটবে—সবকিছুই আগে থেকে জানা যায় না।

কিন্তু রাসকিন বন্ডের সাহিত্য আমাদের আরেকটি কথাও শেখায়। ঘটনাচক্র হয়তো জীবনের পথ নির্ধারণ করে, কিন্তু সেই পথের সৌন্দর্য খুঁজে নেওয়া মানুষের নিজের কাজ।

নয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সেই সৌন্দর্যই খুঁজে বেড়িয়েছেন—পাহাড়ের কুয়াশায়, বৃষ্টির গন্ধে, শিশুর হাসিতে, পুরনো স্মৃতির অ্যালবামে।

তাঁর ৯২তম জন্মবর্ষে ফিরে তাকালে মনে হয়, রাসকিন বন্ড শুধু গল্প লেখেননি; তিনি লক্ষ লক্ষ পাঠকের হৃদয়ে এক টুকরো শান্ত, নির্মল পৃথিবী গড়ে তুলেছেন। আর যতদিন ভারতীয় পাঠক শৈশব, প্রকৃতি ও মানবিকতার গল্প খুঁজবেন, ততদিন সেই পৃথিবীর দরজা খোলা থাকবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles