Table of Contents
হাইলাইটস
- NEET-UG ২০২৬ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং CBSE-র On-Screen Marking (OSM) বিতর্ককে কেন্দ্র করে যন্তর-মন্তরে প্রতিবাদে নামল Cockroach Janta Party (CJP)।
- কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছে সংগঠনটি।
- প্রতিবাদে ছাত্র, অভিভাবক, চাকরিপ্রার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
- আন্দোলনের মূল বক্তব্য, পরীক্ষাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে এবং সরকার সেই সংকটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।
- CJP এই অসন্তোষকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
যন্তর-মন্তরের প্রতিবাদ এবং তার তাৎপর্য
দিল্লির যন্তর-মন্তর বহু দশক ধরে দেশের বিভিন্ন গণআন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে চাকরিপ্রার্থীদের বিক্ষোভ, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের দাবিদাওয়া থেকে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন—অসংখ্য আন্দোলন এই স্থানকে তাদের বক্তব্য প্রকাশের মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছে। শনিবার সেই তালিকায় নতুন সংযোজন হল Cockroach Janta Party বা CJP-র প্রতিবাদ কর্মসূচি।
সকাল দশটা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মূল দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সংগঠনের অভিযোগ, NEET-UG ২০২৬ পরীক্ষাকে ঘিরে যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে এবং CBSE-র On-Screen Marking পদ্ধতি নিয়ে যে অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে, তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাদের মতে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।
প্রতিবাদস্থলে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা হয়তো রাজধানীর বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাবেশগুলির তুলনায় সীমিত ছিল, কিন্তু অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে যে ক্ষোভ এবং হতাশা প্রকাশ পেয়েছে, তা ভারতের শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে একটি বৃহত্তর সামাজিক উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে। অনেক ছাত্র ও অভিভাবকই মনে করছেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ক্রমশ প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে এবং এই পরিস্থিতিতে সরকারের তরফে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন।
কেন ‘Cockroach Janta Party’?
ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে এই নাম নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক। সাধারণ রাজনৈতিক দলগুলির মতো কোনও ইতিবাচক বা বীরত্বসূচক প্রতীক বেছে নেওয়ার বদলে CJP ইচ্ছাকৃতভাবে ‘তেলাপোকা’কে তাদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে। সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তেলাপোকা এমন একটি প্রাণী যা সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম। তারা এই প্রতীক ব্যবহার করে বোঝাতে চাইছে যে সাধারণ ভারতীয় নাগরিকও একের পর এক প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি, পরীক্ষায় অনিয়ম, বেকারত্ব এবং নীতিগত বিভ্রান্তির মধ্যেও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবাদস্থলে এই প্রতীককে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পোস্টার ও ব্যানার দেখা যায়। অনেক পোস্টারে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে, আবার কিছু পোস্টারে ব্যঙ্গের মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে। এই প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে সংগঠনটি নিজেকে প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে অবস্থান করাতে চাইছে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা মিম-সংস্কৃতি ও ডিজিটাল রাজনৈতিক ব্যঙ্গের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
ধর্মেন্দ্র প্রধান কেন আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য?
CJP-র বক্তব্য অনুযায়ী, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য রাজনৈতিক জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। সংগঠনটির দাবি, NEET-UG এবং CBSE-সংক্রান্ত বিতর্কগুলি এতটাই গুরুতর যে শুধুমাত্র তদন্তের ঘোষণা দিয়ে দায় এড়ানো যায় না।
তাদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকে ঘিরে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। কখনও প্রশ্নপত্র ফাঁস, কখনও মূল্যায়নে অসঙ্গতি, কখনও নিয়োগ-সংক্রান্ত বিতর্ক—প্রতিবারই ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে শিক্ষা মন্ত্রকের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির রাজনৈতিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অস্বাভাবিক নয় বলে তারা মনে করে।
যদিও সরকার এবং শাসকদল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবু বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের একাংশও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিকে উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছে। ফলে বিষয়টি এখন আর শুধুমাত্র একটি পরীক্ষাকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জনআস্থার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
NEET-UG কেন এত সংবেদনশীল ইস্যু?
ভারতে এমন খুব কম পরীক্ষা আছে যার সামাজিক গুরুত্ব NEET-UG-র সমতুল্য। দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী প্রতি বছর এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির প্রধান দরজা হিসেবে NEET-এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
একজন ছাত্র বা ছাত্রীর কাছে এই পরীক্ষা শুধু একটি একাডেমিক মূল্যায়ন নয়; বহু বছরের পরিশ্রম, পারিবারিক বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যতের পেশাগত জীবনের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। অনেক পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ কোচিং, বইপত্র এবং প্রস্তুতির পেছনে ব্যয় করে। ফলে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে সামান্যতম প্রশ্নও দ্রুত জনঅসন্তোষে রূপ নেয়।
প্রতিবাদে উপস্থিত বহু অভিভাবক জানিয়েছেন যে তারা পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা বা কঠিন প্রশ্ন নিয়ে আপত্তি করেন না। তাদের মূল উদ্বেগ হল, পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও নিরাপদ কি না। যদি কোনও পরীক্ষার্থী অসাধু উপায়ে সুবিধা পায়, তাহলে পরিশ্রমী ছাত্রদের প্রতি তা চরম অবিচার বলে তারা মনে করেন।
আস্থার সংকটই আসল প্রশ্ন
যন্তর-মন্তরের এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এটিই যে, এখানে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়নি। বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান অনাস্থাকে সামনে আনা হয়েছে।
একটি পরীক্ষা তখনই কার্যকর হয় যখন পরীক্ষার্থীরা বিশ্বাস করে যে প্রশ্নপত্র সুরক্ষিত, মূল্যায়ন নিরপেক্ষ এবং ফলাফল ন্যায়সঙ্গত। এই তিনটির মধ্যে কোনও একটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলেও গোটা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। CJP-র আন্দোলন সেই বৃহত্তর উদ্বেগকেই রাজনৈতিক ভাষা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই কারণেই যন্তর-মন্তরের প্রতিবাদকে শুধুমাত্র একটি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি এমন এক সামাজিক মনোভাবের প্রতিফলন, যা শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন একটি বৃহৎ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে।