টেনিস ইতিহাসে অনেক প্রত্যাবর্তন দেখা গেছে। কেউ চোটের পর ফিরেছেন, কেউ ব্যক্তিগত সংকট কাটিয়ে। কিন্তু প্রায় চার বছর প্রতিযোগিতামূলক টেনিস থেকে দূরে থাকার পর ৪৪ বছর বয়সে আবার কোর্টে ফেরার ঘোষণা—এমন ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। আর সেই কাজটাই করলেন Serena Williams।
রবিবার রাতে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু নাটকীয় ভিডিও প্রকাশ করে সেরেনা জানিয়ে দিলেন—তিনি ফিরছেন। লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী কুইন্স ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে ডাবলস খেলেই শুরু হবে তাঁর নতুন অধ্যায়। প্রায় চার বছর আগে ২০২২ সালের ইউএস ওপেনে শেষবার প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। তখন তিনি অবসর শব্দটি ব্যবহার না করে বলেছিলেন, তিনি টেনিস থেকে “evolve away” করছেন। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, সেই দরজা তিনি পুরোপুরি কখনও বন্ধ করেননি।
শুধু একজন খেলোয়াড়ের ফেরা নয়
সেরেনার প্রত্যাবর্তনকে কেবল একজন কিংবদন্তির প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ আধুনিক নারী টেনিসের জনপ্রিয়তা, বাণিজ্যিক বিস্তার এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের সঙ্গে তাঁর নাম প্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
২৩টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম একক শিরোপা—ওপেন যুগে যা নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাতটি উইম্বলডন, সাতটি অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ছয়টি ইউএস ওপেন এবং তিনটি ফরাসি ওপেন। এর সঙ্গে রয়েছে বোন Venus Williams-এর সঙ্গে ১৪টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম ডাবলস শিরোপা। তিনি একমাত্র খেলোয়াড় যিনি একক ও ডাবলস—দুই বিভাগেই ‘ক্যারিয়ার গোল্ডেন স্ল্যাম’ সম্পূর্ণ করেছেন।
তাই সেরেনা কোর্টে ফিরলে সেটা কেবল একটি টুর্নামেন্টের খবর থাকে না। সেটি একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া-ঘটনায় পরিণত হয়।
অবসরের পরও কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যাননি
২০২২ সালের ইউএস ওপেনে তাঁর বিদায়ী যাত্রা ছিল আবেগঘন। তৃতীয় রাউন্ডে হেরে বিদায় নেওয়ার সময় গোটা স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছিল। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এটাই শেষ। কিন্তু সেরেনা নিজে কখনও সেই শব্দটি উচ্চারণ করেননি।
এরপর তিনি ব্যবসা, পরিবার এবং বিনিয়োগ জগতে সময় দিয়েছেন। দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে সক্রিয় থেকেছেন। কিন্তু গত কয়েক মাসে ধীরে ধীরে জল্পনা শুরু হয়।
প্রথমে জানা যায়, তিনি আবার অ্যান্টি-ডোপিং পরীক্ষার তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। এরপর ফ্লোরিডায় নিয়মিত অনুশীলনের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। তখন থেকেই টেনিসমহলে প্রশ্ন উঠছিল—সত্যিই কি ফিরছেন সেরেনা?
এখন আর প্রশ্ন নেই। উত্তর মিলেছে।
কেন কুইন্স ক্লাব?
ফেরার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন ঘাসের কোর্ট।
এটা মোটেই কাকতালীয় নয়।
সেরেনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলির একটি লেখা হয়েছে উইম্বলডনের ঘাসে। সাতবারের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তিনি জানেন, বয়স বাড়লেও ঘাসের কোর্টে অভিজ্ঞতা অনেক বড় অস্ত্র। শক্তিশালী সার্ভ, দ্রুত পয়েন্ট শেষ করার ক্ষমতা এবং কোর্ট পজিশনিং—এসব ক্ষেত্রে এখনও তিনি অনেক তরুণ খেলোয়াড়ের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারেন।
সেরেনা নিজেও বলেছেন, ঘাসের কোর্ট তাঁকে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অর্থবহ স্মৃতিগুলি দিয়েছে। তাই এই মঞ্চ থেকেই নতুন অধ্যায় শুরু করতে চান তিনি।
নতুন সঙ্গী, নতুন প্রজন্ম
প্রত্যাবর্তনের শুরুতেই একটি প্রতীকী ছবি তৈরি হচ্ছে।
সেরেনা খেলবেন ১৯ বছর বয়সী কানাডীয় প্রতিভা Victoria Mboko-র সঙ্গে।
একদিকে টেনিসের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাম। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি।
মবোকো নিজেও বলেছেন, ছোটবেলা থেকে যার খেলা দেখে বড় হয়েছেন, তাঁর সঙ্গে একই কোর্ট ভাগ করে নেওয়া তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা।
এ যেন টেনিসের দুই যুগের হাত মেলানো।
প্রশ্ন একটাই: এখানেই কি শেষ?
কুইন্স ক্লাব ডাবলস কি শুধু একটি প্রতীকী প্রত্যাবর্তন?
নাকি এর পিছনে আরও বড় পরিকল্পনা রয়েছে?
টেনিস মহলের অনেকেই মনে করছেন, এটি আসলে উইম্বলডনের প্রস্তুতি। কুইন্স ক্লাবের পর বার্লিনেও তাঁর অংশগ্রহণের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। ফলে জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে যে, তিনি হয়তো উইম্বলডনেও খেলতে পারেন।
যদিও এখনও পর্যন্ত একক বিভাগে খেলার কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
কিন্তু সেরেনাকে যারা চেনেন, তারা জানেন—তিনি কখনও শুধু প্রদর্শনী করতে কোর্টে নামেন না।
বয়স কি সবচেয়ে বড় বাধা?
এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
৪৪ বছর বয়সে প্রতিযোগিতামূলক টেনিসে ফেরা প্রায় অকল্পনীয়। বর্তমান নারী টেনিসে গতি, শক্তি এবং শারীরিক সক্ষমতার চাহিদা আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি।
তবু সেরেনার ক্ষেত্রে হিসাবটা আলাদা।
তিনি অতীতে বহুবার অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ের সময় তিনি গর্ভবতী ছিলেন—পরে যা প্রকাশ্যে আসে। সেটিই ছিল তাঁর ২৩তম এবং সর্বশেষ গ্র্যান্ড স্ল্যাম একক শিরোপা।
তাঁর ক্যারিয়ার বারবার প্রমাণ করেছে, সাধারণ নিয়ম দিয়ে তাঁকে বিচার করা কঠিন।
টেনিসের জন্য এর অর্থ কী?
সেরেনার প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো কোর্টের বাইরেই দেখা যাবে।
নারী টেনিসে বর্তমানে প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু সেরেনার মতো বৈশ্বিক আকর্ষণ খুব কম খেলোয়াড়ের রয়েছে। তিনি খেললে দর্শক বাড়ে, টেলিভিশন রেটিং বাড়ে, স্পনসরদের আগ্রহ বাড়ে।
বর্তমান তারকারাও তা স্বীকার করছেন।
অনেকেই বলেছেন, সেরেনা কোর্টে ফিরলে টেনিসই লাভবান হবে। কারণ তিনি শুধু একজন চ্যাম্পিয়ন নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান।
ইতিহাসের আরেক অধ্যায়ের অপেক্ষা
খেলাধুলার ইতিহাসে কিছু প্রত্যাবর্তন ফলাফলের জন্য নয়, প্রতীকের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে।
মাইকেল জর্ডানের দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তন, টম ব্র্যাডির অবসর ভেঙে ফেরা কিংবা মার্টিনা নাভ্রাতিলোভার দীর্ঘায়িত ক্যারিয়ার—এসবের সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে সেরেনা উইলিয়ামসের নতুন অধ্যায়।
তিনি আবার গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতবেন কি না, সেটা ভবিষ্যৎ বলবে।
তিনি আবার বিশ্বের এক নম্বর হতে পারবেন কি না, সেটাও অনিশ্চিত।
কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—প্রায় চার বছর পর যখন সেরেনা আবার কোর্টে নামবেন, টেনিস বিশ্বের চোখ থাকবে সেই এক মানুষের দিকেই।
কারণ কিছু খেলোয়াড় শুধু ম্যাচ খেলেন না। তারা ইতিহাসকে আবার জাগিয়ে তোলেন। আর সেরেনা উইলিয়ামস সেই বিরলদের একজন।