Home খবর ইলন মাস্কের পরবর্তী বাজি: ইতিহাস গড়তে চলেছে স্পেসএক্স

ইলন মাস্কের পরবর্তী বাজি: ইতিহাস গড়তে চলেছে স্পেসএক্স

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 2 views 4 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইলন মাস্কের মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্স এবার সরাসরি ওয়াল স্ট্রিটের দিকে উড়াল দিতে চলেছে। গত ২০ মে, বুধবার সংস্থাটি এমন একটি আইপিও (ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং) বা শেয়ারবাজারে প্রথম শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা জমা দিয়েছে, যা সফল হলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও হতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলির দাবি, স্পেসএক্স বাজার থেকে ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে চায় এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় সংস্থাটির মূল্যায়ন ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। আগামী মাসেই শেয়ার লেনদেন শুরু হতে পারে বলেও খবর।

যদি এই পরিকল্পনা সফল হয়, তাহলে এটি ইতিহাসের যেকোনও আইপিওকে ছাড়িয়ে যাবে এবং ইলন মাস্ককে তাঁর প্রজন্মের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তা হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

২৪ বছরে প্রথমবার আর্থিক তথ্য প্রকাশ

স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (U.S. Securities and Exchange Commission) কাছে তাদের S-1 প্রসপেক্টাস জমা দিয়েছে।

এই নথি কোনও সংস্থাকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে জমা দিতে হয়। এতে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য সংস্থার আর্থিক অবস্থা, ঝুঁকি এবং ব্যবসায়িক কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকে।

স্পেসএক্সের ২৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম সংস্থাটি প্রকাশ্যে নিজেদের আর্থিক হিসাব তুলে ধরল।

নথি অনুযায়ী—

  • ২০২৫ সালে স্পেসএক্সের মোট আয় ছিল ১৮.৭ বিলিয়ন ডলার
  • একই সময়ে সংস্থাটি ২.৬ বিলিয়ন ডলারের পরিচালন ক্ষতি (operating loss) বহন করেছে।
  • কারণ, তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করছে পরবর্তী প্রজন্মের রকেট প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) উন্নয়নে।

স্টারলিংকই আসল অর্থ উপার্জনের যন্ত্র

স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিংক বর্তমানে সংস্থার সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। ২০২৫ সালে স্টারলিংকের আয় ছিল ১১.৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ মহাকাশযান উৎক্ষেপণের চেয়ে বর্তমানে স্টারলিংকই স্পেসএক্সের আর্থিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

এআই ব্যবসায় আয় আছে, ক্ষতিও বিশাল

স্পেসএক্সের নথিতে এআই-সংক্রান্ত ব্যবসারও বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। এক্সএআই ও এক্স-কে নিয়ে গঠিত এই বিভাগ ২০২৫ সালে ৩.২ বিলিয়ন ডলার আয় করলেও ৬.৪ বিলিয়ন ডলার পরিচালন ক্ষতির মুখে পড়েছে। কারণ, এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রচুর অর্থ খরচ করা হচ্ছে।

বিনিয়োগের মাত্রা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো — ২০২৫ সালে এই বিভাগে মূলধনী বিনিয়োগ (ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার) ছিল ১২.৭ বিলিয়ন ডলার, এবং ২০২৬ সালের শুধু প্রথম তিন মাসেই খরচ হয়েছে ৭.৭ বিলিয়ন ডলার। এআই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কত বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা এই সংখ্যাগুলো স্পষ্টভাবে জানান দেয়। এই খাতে স্পেসএক্সের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছে গুগল, মেটা ও আমাজন।

অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে বিশাল চুক্তি

স্পেসএক্স আরও জানিয়েছে যে তারা তাদের কলোসাস এবং কলোসাস টু ডেটা সেন্টারের অতিরিক্ত সক্ষমতা এআই সংস্থা অ্যানথ্রপিক-এর কাছে ভাড়া দেবে।

চুক্তি অনুযায়ী—

  • প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ স্পেসএক্স পাবে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার
  • এই চুক্তি চলবে মে ২০২৯ পর্যন্ত।

এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন সম্প্রতি ইলন মাস্ক তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেন এআই-এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন।

ওপেনএআই-ও ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।

অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকও নিজস্ব আইপিও নিয়ে ভাবছে।

ফলে ২০২৬ সাল ওয়াল স্ট্রিটের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বছর হয়ে উঠতে পারে।

মাস্কের হাতেই থাকবে নিয়ন্ত্রণ

নথিতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে স্পেসএক্স দ্বৈত-শ্রেণির শেয়ার কাঠামো (dual-class share structure) ব্যবহার করবে।

এর ফলে কোম্পানি শেয়ারবাজারে এলেও নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইলন মাস্কের হাতেই।

এই ব্যবস্থা তাঁকে সেই ধরনের কর্পোরেট দ্বন্দ্ব থেকে রক্ষা করবে, যেগুলির মুখে তাঁকে বারবার পড়তে হয়েছে Tesla-তে।

টেসলার ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডাররা বহুবার তাঁর বেতন-প্যাকেজ এবং পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

নতুন নথি অনুযায়ী—

  • মাস্কের হাতে থাকবে প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোটাধিকার
  • অথচ তাঁর মালিকানাধীন শেয়ারের পরিমাণ হবে প্রায় ৪২ শতাংশ

অর্থাৎ সংস্থার অর্ধেকেরও কম মালিকানা থাকলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার্যত তাঁর একার হাতে থাকবে।

স্পেসএক্স নিজেই স্বীকার করেছে যে এই ব্যবস্থায় বাইরের বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি রয়েছে।

নথিতে বলা হয়েছে, মাস্কের হাতে এমন ক্ষমতা থাকবে যাতে তিনি পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনসহ শেয়ারহোল্ডারদের ভোটে নির্ধারিত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

মহাকাশে ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা

সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশটি এসেছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।

স্পেসএক্স জানিয়েছে, তারা মহাকাশে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করতে চায়।

সংস্থার মতে, AI-এর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য কক্ষপথে সংগৃহীত সৌরশক্তিই একমাত্র প্রকৃতভাবে বিস্তৃত করা সম্ভব এমন সমাধান।

স্পেসএক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী—

  • ২০২৮ সাল থেকেই AI-কম্পিউটিং স্যাটেলাইট মোতায়েন শুরু হবে।
  • দীর্ঘমেয়াদে প্রতি বছর মহাকাশে ১০০ গিগাওয়াট কম্পিউটিং ক্ষমতা স্থাপন করা হবে।

এই লক্ষ্য পূরণ করতে প্রয়োজন হবে—

  • প্রতি বছর হাজার হাজার রকেট উৎক্ষেপণ।
  • প্রায় দশ লক্ষ মেট্রিক টন সরঞ্জাম কক্ষপথে পৌঁছে দেওয়া।

স্পেসএক্সের দাবি, এই কাজ এতটাই কঠিন যে বাণিজ্যিক পর্যায়ে বিশ্বের অন্য কোনও সংস্থা এটি করতে সক্ষম নয়।

২৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বাজার

স্পেসএক্স আরও একটি চমকপ্রদ দাবি করেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, চীন ও রাশিয়াকে বাদ দিয়েও তাদের বিভিন্ন ব্যবসার মোট সম্ভাব্য বাজারের (টোটাল অ্যাড্রেসেবল মার্কেট) আকার ২৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সংস্থার বিশ্বাস, ভবিষ্যতে তাদের প্রযুক্তি ও পরিষেবার জন্য সম্ভাব্য রাজস্বের সুযোগ এই বিপুল অঙ্ক পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

জুনেই ন্যাসডাকে তালিকাভুক্তি?

সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, স্পেসএক্স জুন মাসে ন্যাসডাক-এ এসপিসিএক্স(SPCX) প্রতীক (ticker symbol) নিয়ে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চললে, তালিকাভুক্তির কিছুদিনের মধ্যেই শেয়ার লেনদেন শুরু হবে।

যদি ৭৫ বিলিয়ন ডলার তোলা এবং ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নের লক্ষ্য পূরণ হয়, তাহলে স্পেসএক্স শুধু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও-ই করবে না — ওয়াল স্ট্রিট, মহাকাশ শিল্প এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles