Home খবর ব্যঙ্গের নতুন পৃষ্ঠপোষক তৃণমূল

ব্যঙ্গের নতুন পৃষ্ঠপোষক তৃণমূল

0 comments 9 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার রাজনৈতিক আকাশে হঠাৎ এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেছে। দীর্ঘ পনেরো বছরের রাজত্বের পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশেষে আবিষ্কার করেছেন — ব্যঙ্গও একটি শিল্প। বিদ্রুপও গণতন্ত্রের অংশ। হাস্যরসও সমাজের অক্সিজেন হতে পারে।

এ যেন সেই সম্রাটের গল্প, যিনি সারাজীবন আয়না ভেঙে বেড়িয়েছেন, কারণ আয়নায় নিজের মুখ দেখতে তাঁর ভালো লাগত না। আর এখন, সিংহাসনের পায়ার নীচে হালকা কাঁপুনি শুরু হতেই তিনি আয়নাকেই “গণতন্ত্রের বন্ধু” বলে ঘোষণা করছেন।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল নেতৃত্বের সাম্প্রতিক “আরশোলা জনতা পার্টি”-প্রেম তাই নিছক রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি বাংলার ক্ষমতার মনস্তত্ত্বের এক অসামান্য নাটক।

কার্টুনে গ্রেফতার, এখন ব্যঙ্গের প্রশংসা

কী আশ্চর্য, যে বাংলায় কার্টুন আঁকার অপরাধে অধ্যাপক গ্রেফতার হয়েছেন, যেখানে মিম বানানোর অপরাধে থানায় ডাকা হয়েছে তরুণদের, যেখানে ব্যঙ্গাত্মক পোস্টের জন্য মামলা হয়েছে, সেখানে আজ সেই শাসকদলই হঠাৎ বিদ্রূপের প্রেমে পড়েছে!

নির্বাচনের রায় আসলে ক্ষমতার দম্ভকে এক নিমেষে মাটির কাছাকাছি নামিয়ে আনে।

আরশোলার প্রতীকে এক গভীর বিদ্রূপ

যে “আরশোলা” শব্দটি নিয়ে এত রাজনৈতিক সহমর্মিতা দেখানো হচ্ছে, তার মধ্যেও এক অদ্ভুত প্রতীকী বিদ্রূপ আছে। আরশোলা এমন এক প্রাণী, যাকে ক্ষমতাবানরা ঘৃণা করেন, কিন্তু যাকে মেরে ফেলাও কঠিন। অন্ধকার রান্নাঘরে, ভাঙা দেওয়ালে, স্যাঁতসেঁতে সমাজের কোণে কোণে সে বেঁচে থাকে। বাংলার বেকার যুবকদেরও হয়তো ঠিক সেভাবেই দেখা হয়েছে — অস্বস্তিকর, বিরক্তিকর, কিন্তু অনিবার্য।

আর আজ সেই যুবসমাজের দিকে তাকিয়ে তৃণমূল বলছে — “আমরাও তোমাদের সঙ্গে হাসছি।”

কিন্তু বাংলার মানুষ সম্ভবত জিজ্ঞেস করতে পারেন — “হাসছেন, না আমাদের দেখে হাসছেন?”

যে রাজত্বে হাস্যরস কখনও নিরাপদ ছিল না

কারণ এই রাজত্বে হাস্যরস কখনও নিরাপদ ছিল না। ক্ষমতাকে নিয়ে ঠাট্টা করা ছিল বিপজ্জনক খেলা। রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে নেত্রীর উচ্চারণ, আঁকা ছবি, কবিতা, সুর, এমনকি হাঁটার ভঙ্গি নিয়েও ব্যঙ্গ করা একপ্রকার রাষ্ট্রদ্রোহের মতো হয়ে উঠেছিল।

বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা সময় ছিল, যখন কফি হাউসের টেবিলে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে ঠাট্টা হত, কার্টুনিস্টরা রোজ নতুন নতুন আঁকায় সরকারকে বিদ্ধ করতেন, নাট্যকাররা মঞ্চে রাজনৈতিক কৌতুক করতেন। বাম আমলেও নিয়ন্ত্রণ ছিল, রাগ ছিল, দলীয় অসহিষ্ণুতাও ছিল কিন্তু ব্যঙ্গের একটা জায়গা অন্তত বেঁচে ছিল।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে সেই জায়গাটা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। কারণ এই শাসনের কেন্দ্রে ছিল এক গভীর ব্যক্তিপূজা। আর ব্যক্তিপূজা ব্যঙ্গ সহ্য করতে পারে না।

ব্যঙ্গ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু

ব্যঙ্গ আসলে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু। কারণ ব্যঙ্গ ভয় পায় না।

একটি কার্টুন কখনও কখনও হাজার বক্তৃতার চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। একটি মিম এমনভাবে ক্ষমতার মুখোশ খুলে দেয়, যা কোনও সম্পাদকীয় পারে না। এই কারণেই কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার সরকারগুলি প্রথমে কবিকে ভয় পায় না, সাংবাদিককেও নয় — প্রথমে ভয় পায় কৌতুকশিল্পীকে।

তাই আজ যখন ডেরেক ও’ব্রায়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গসাহিত্যের প্রশংসা করেন, তখন ইতিহাস একটু হেসে ওঠে।

ডিজিটাল স্মৃতি খারাপ নয়

কারণ বাংলার ডিজিটাল স্মৃতি খুব খারাপ নয়। মানুষ এখনও মনে রেখেছে, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হলেই দলের তথ্যপ্রযুক্তি শাখা ঝাঁপিয়ে পড়ত। কীভাবে বিরোধী মতকে “বিজেপি”, “সিপিএম”, “ষড়যন্ত্রকারী”, “দেশদ্রোহী” — এইসব তকমায় মুড়ে দেওয়া হত।

আজ সেই দলই হঠাৎ বিদ্রূপের ভালো দিক আবিষ্কার করছে।

ভোটের ধাক্কার পর যুবসমাজকে টানার চেষ্টা

রাজনীতিতে অবশ্য আদর্শের চেয়ে প্রয়োজন বড়। আর তৃণমূল এখন প্রয়োজনের রাজনীতিতে নেমেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ধাক্কার পরে তারা বুঝেছে, যুবসমাজের একটা বড় অংশ আবেগ দ্বারা বিচ্ছিন্ন। তারা আর সরকারি বিজ্ঞাপনের ভাষায় কথা বলে না। তারা মিমে কথা বলে। ইনস্টাগ্রাম রিলে কথা বলে। ব্যঙ্গাত্মক পাতায় কথা বলে।

তাই এখন তৃণমূলও ডিজিটাল বিদ্রূপের ভাষা শিখতে চাইছে।

এ যেন সেই কড়া প্রধান শিক্ষক, যিনি সারাজীবন ছাত্রদের হাসতে দেননি, আর অবসরের পরে হঠাৎ একক কৌতুক অনুষ্ঠান খুলেছেন।

যে সংস্কৃতিকে দমন করেছিল, তারই দ্বারে এখন ভিক্ষা

“আরশোলা জনতা পার্টি”-র মধ্যে তৃণমূল যা দেখছে, তা আদতে হাস্যরস নয় –  যুব সংযোগ। তারা বুঝেছে, প্রচলিত রাজনৈতিক বার্তা ভেঙে পড়ছে। আজকের তরুণ বক্তৃতা শুনতে চায় না; কিন্তু সে কটাক্ষ বোঝে। সে রাজনৈতিক ইশতেহার পড়ে না; সে মিম ছড়িয়ে দেয়।

এবং এখানেই বিদ্রূপ সবচেয়ে তীব্র।

কারণ বাংলার ডিজিটাল ব্যঙ্গ-সংস্কৃতি আদতে গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে। যখন মানুষ সরাসরি কথা বলতে ভয় পায়, তখন তারা রসিকতা বানায়। যখন প্রতিবাদের ভাষা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তখন ব্যঙ্গই নিরাপদ আশ্রয় হয়।

অর্থাৎ যে রাজনৈতিক পরিবেশ ব্যঙ্গ-সংস্কৃতিকে জন্ম দিয়েছে, আজ সেই পরিবেশের নির্মাতারাই তার পৃষ্ঠপোষক সেজে উঠছেন।

এ যেন আগুন লাগানোর পরে দমকল বাহিনীর পোশাক পরে ছবি তোলা।

রাজনীতির সংরক্ষণাগার মুছে যায় না

আরও মজার বিষয় হল, তৃণমূল এখন ব্যঙ্গ-সংস্কৃতিকে “প্রগতিশীলতা” হিসেবে দেখাতে চাইছে। যেন এতদিন তারা গোপন অনুরাগী ছিল, কেবল সুযোগের অভাবে প্রকাশ করতে পারেনি!

কিন্তু রাজনীতির সমস্যা হল, তার সংরক্ষণাগার থাকে।

মানুষ মনে রাখে।

মনে রাখে, কে কখন রেগে গিয়েছিল। কে কখন মামলা করেছিল। কে কখন শিল্পীকে অপমান করেছিল। কে কখন সমালোচককে “চক্রান্তকারী” বলেছিল।

মমতার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব সম্ভবত এটাই — তিনি নিজে একসময় ছিলেন প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাস্তায় নামা প্রতিবাদী চরিত্র। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি ধীরে ধীরে সেই প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হয়েছেন, যাকে একসময় তিনি আক্রমণ করতেন।

আর প্রতিষ্ঠান কখনও ব্যঙ্গ ভালোবাসে না। সে কেবল ব্যঙ্গকে ব্যবহার করতে চায়।

আজকের এই সমর্থন তাই অনেকের কাছে প্রকৃত সাংস্কৃতিক উন্মুক্ততা বলে মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে রাজনৈতিক পুনর্মোড়কীকরণ।

কারণ নির্বাচনী ধাক্কার পরে প্রতিটি সরকারই হঠাৎ “মানুষের ভাষা” শিখতে শুরু করে। কেউ চায়ের দোকানে যায়, কেউ মেট্রোয় চড়ে, কেউ হঠাৎ মিম শেয়ার করে।

তৃণমূল এখন হাস্যরসের কাছে এসেছে ঠিক সেই কারণে, যেভাবে বড় সংস্থাগুলি পরিবেশ বিপর্যয়ের পরে গাছে জল দেয় — ইমেজ ম্যানেজমেন্ট।

ব্যঙ্গকে হত্যা করা যায় না

তবে বিদ্রূপেরও একটা নির্মম সৌন্দর্য আছে।

সম্ভবত ইতিহাসের এটাই নিয়ম — ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত সেই জিনিসগুলোর কাছেই ফিরে আসে, যেগুলোকে সে একসময় দমন করেছিল।

কারণ ব্যঙ্গকে শেষ করা যায় না।

কার্টুনিস্টকে চুপ করানো যায়, মিম বন্ধ করা যায়, পোস্ট মুছিয়ে দেওয়া যায় কিন্তু হাসিকে হত্যা করা যায় না।

হাসি শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে। কখনও আরশোলার বেশে। কখনও মিমের আকারে। কখনও ভোটবাক্সের ভিতরে।

আর বাংলার রাজনীতি আজ সেই হাসির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles