বাংলাস্ফিয়ার: নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এক প্রবল নির্বাচনী জয় অর্জন করেছে। যে রাজ্য এতদিন বিরোধীদের হাতে থাকা বিরল শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে এই জয় দেশের সর্বত্র মোদীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করল।
এই প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয় পেল। পূর্ব ভারতের এই বৃহৎ এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যটি গত পনেরো বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে ছিল। দলের নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মোদী এবং তাঁর ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম তীব্র সমালোচক।
কিন্তু এই ফলাফল, যা ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে, ইতিমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়া বিরোধী শিবিরের জন্য আরও এক গভীর মনোবলভাঙা ধাক্কা হয়ে এল। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৫টিরও বেশি আসনে জয়ের পথে এগোতে দেখা যাচ্ছে, যা এক ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
বিজেপি সমর্থকদের রাস্তায় নেমে উল্লাস করতে দেখা যায়। মোদী এক বিবৃতিতে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মানুষের শক্তির জয় হয়েছে এবং সুশাসনের রাজনীতি বিজয়ী হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি মানুষকে আমি প্রণাম জানাই।”
পশ্চিমবঙ্গে জয় বহুদিন ধরেই বিজেপির এক বড় রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল। এই সাফল্য দেশের পূর্বাঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী দলটির প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিল এবং কেন্দ্র ও রাজ্য, উভয় স্তরেই তাদের বাধাহীন নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করল।
২০১৪ সালে মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্য এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির বিস্তার ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সেই কর্মসূচির লক্ষ্য ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বদলে আরও স্পষ্টভাবে হিন্দু পরিচয়ের রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠন করা। অন্যদিকে বিরোধী শিবির ক্রমাগত অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
সোমবার পূর্ব ভারতের অসম রাজ্যেও বিজেপি পুনর্নির্বাচিত হয়েছে। ফলে দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ২০টিতেই এখন বিজেপির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হল।
তবে এই ফলাফলের আগে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিজেপি সরকার “অবৈধ ভোটারদের” তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নামে ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনার যে কর্মসূচি চালায়, তাকে বলা হয় “স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন” বা এসআইআর। এই প্রক্রিয়ার ফলে ২৭ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে।
বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষই তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন—যারা ঐতিহ্যগতভাবে বিজেপিকে সমর্থন করেন না। বহু মানুষ ভোটের আগে নিজেদের নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগও পাননি।
সমালোচক এবং তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ ছিল, এসআইআর প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের ফল বিজেপির অনুকূলে ঘুরিয়ে দেওয়া। যদিও সরকার সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক রাহুল বর্মা বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই জয় আসলে দলের নেতৃত্ব ও কর্মীদের “সাত বছরের প্রকল্প”-এর চূড়ান্ত ফল।
তিনি বলেন, তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল জনঅসন্তোষ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দলের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ভোট হারানোর বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর মতে, আগের বছরগুলির তুলনায় বিজেপি এবার অনেক বেশি সুসংগঠিত প্রচার চালিয়েছে। আগে বিজেপিকে “বহিরাগত” বলে সমালোচনা করা হত, কারণ তাদের বিরুদ্ধে বাঙালি ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি হওয়ার অভিযোগ উঠত।
“পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শক্তিশালী ও সুসংগঠিত উপস্থিতি ছিল এবং মোদীকে এখনও একজন অত্যন্ত আকর্ষণীয় নেতা হিসেবে দেখা হয়,” বলেন বর্মা। “এত বড় ফল হিন্দু ভোটের সংহতি ছাড়া সম্ভব হত না।”
বর্মার মতে, এসআইআর প্রক্রিয়া হয়তো এককভাবে পুরো নির্বাচনের ফল বদলে দেয়নি, কিন্তু তা “সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা” পালন করেছে।
সোমবার পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ছোট কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে বিজেপির জয় দেখিয়ে দিল, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর যে ধাক্কা দলটি খেয়েছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।
এটি প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্যও আরও এক বড় ধাক্কা হয়ে এল। কংগ্রেস আরও আসন হারিয়েছে এবং তাদের দু’টি শরিক দলও ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে।
রাহুল বর্মা বলেন, “২০২৪ সালের দিকে ফিরে তাকালে এখন মনে হচ্ছে, সেটা বিজেপির জন্য সাময়িক ধাক্কা ছিল। তারা আবার নিজেদের প্রভাবশালী অবস্থানে ফিরে এসেছে। প্রতিটি পরাজয়ের সঙ্গে বিরোধীদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে, আর বিজেপিকে আরও অজেয় বলে মনে হচ্ছে।”
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, বিজেপির সামনেও ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়। ইরান যুদ্ধ এবং তার ফলে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে, আর ব্যাপক বেকারত্বের সমস্যাও এখনও সমাধান হয়নি।
সোমবারের ফল আরও স্পষ্ট করে দিল যে দক্ষিণ ভারত এখনও এমন একটি অঞ্চল, যেখানে বিজেপি পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারেনি। কেরলে, যেখানে দীর্ঘদিন বামপন্থী সরকার নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, সেখানে কংগ্রেস দশ বছরের মধ্যে প্রথমবার কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন জোটকে পরাজিত করেছে। যদিও বিজেপি সেখানে কিছুটা অগ্রগতি করেছে।
অন্যদিকে তামিলনাড়ুতে বড় নির্বাচনী চমক দেখা গেছে। রাজনৈতিক নবাগত এবং প্রাক্তন চলচ্চিত্র তারকা সি জোসেফ বিজয় ও তাঁর দল তামিলগা ভেত্রি কাঝাগম প্রায় পঞ্চাশ বছরের মধ্যে প্রথম নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে।