বাংলাস্ফিয়ারঃ এ বছরের ৯ মে মস্কোয় অনুষ্ঠিত বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে বিজয়ের কোনও জৌলুসই ছিল না। দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়নের নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করার ভূমিকা উদ্‌যাপনের জন্য রেড স্কোয়ারে ট্যাঙ্ক বা অন্য সামরিক যানবাহনের গর্জন শোনা গেল না। রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ মনে করেছিল, সাঁজোয়া যান ও ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ট্রাকগুলোকে কাছাকাছি সমাবেশস্থলে জড়ো করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে কারণ সেগুলো ইউক্রেনের ক্রমশ আরও কার্যকর হয়ে ওঠা ড্রোনগুলোর জন্য অত্যন্ত লোভনীয় লক্ষ্য হয়ে উঠত। বড় দিনের আগে নিরাপত্তার অজুহাতে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেশের দূরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে আনা হয়।

অপমানকে আরও ঘষে দেওয়ার মতো করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট  ভলোদিমির জেলেনস্কি একটি নির্দেশ জারি করে “অনুমতি” দেন যেন কুচকাওয়াজটি অনুষ্ঠিত হতে পারে, এবং বলেন যে রেড স্কোয়ারে কোনও আক্রমণ চালানো হবে না। এর কিছুদিন আগেই আমেরিকার মধ্যস্থতায় ইউক্রেন ও রাশিয়া তিন দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, যদিও ১০ই মে নাগাদ দুই পক্ষই পরস্পরকে সেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করছিল। কুচকাওয়াজের পরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট  ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, তাঁর মনে হচ্ছে যুদ্ধটি “শেষের দিকে এগোচ্ছে”।

এই ক্ষয়িষ্ণু কুচকাওয়াজের প্রতীকী তাৎপর্যকে অতিরঞ্জিত করা কঠিন। যে দিনটির উদ্দেশ্য ছিল পুতিনের রাশিয়ার সামরিক শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠা, সেটিই বরং তার দুর্বলতা ও ভঙ্গুরতার সংকেত দিল। অন্তত এই অর্থে, সেটি রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যর্থতা এবং ইউক্রেনের দীর্ঘ-পাল্লার হামলার ক্রমবর্ধমান কার্যকারিতা নিয়ে রাশিয়ার আতঙ্কের এক যথার্থ প্রতিফলন। প্রায় তিন বছর পর এই প্রথম যুদ্ধের গতি যেন ইউক্রেনের পক্ষে ঘুরতে শুরু করেছে। এক নির্মম শীত পার করে, যখন তাদের শহর ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রায় প্রতি রাতেই রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁকে বিপর্যস্ত হচ্ছিল, ইউক্রেন এখন পরিস্থিতি বদলে দিতে শুরু করেছে। প্রায় প্রতিটি সূচকেই তারা রাশিয়ার ওপর ক্রমবর্ধমান মূল্য চাপিয়ে দিচ্ছে।

শুধু যে রাশিয়ার প্রত্যাশিত বসন্তকালীন আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে তা-ই নয়, এপ্রিল মাসে রুশ বাহিনী ২০২৪ সালের আগস্টের পর প্রথমবারের মতো নিট ভূখণ্ড হারিয়েছে—সেই আগস্টেই ইউক্রেন রাশিয়ার কুর্স্ক ওব্লাস্তে এলাকা দখল করেছিল। ওয়াশিংটনের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার সম্প্রতি ইউক্রেনের সাফল্যের কয়েকটি কারণের তালিকা দিয়েছে: ইউক্রেনীয় বাহিনীর পাল্টা স্থল-আক্রমণ ও মধ্য-পাল্লার হামলা; ইউক্রেনে রাশিয়ার অবৈধভাবে ব্যবহৃত স্টারলিঙ্ক টার্মিনালের ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়া; এবং দেশে ক্রেমলিনের অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতার কারণে টেলিগ্রাম মেসেজিং অ্যাপকে সীমিত করে দেওয়া। আইএসডব্লিউ-এর মানচিত্রের ভিত্তিতে আমাদের হিসাব বলছে, গত ৩০ দিনে রাশিয়া ১১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

“মোটের ওপর মনে হচ্ছে এটি যুদ্ধের একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত,” বলেছেন লরেন্স ফ্রিডম্যান, লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক অধ্যয়নের এমেরিটাস অধ্যাপক। “যদি রুশরা তাদের প্রচেষ্টার কোনও ফল দেখাতে না পারে, তাহলে আমি অবাক হব না যদি কিছু জায়গায় ভাঙন শুরু হয়ে যায়।” প্রতি মাসে প্রায় ৩৫ হাজার সৈন্য হারানোর ফলে ক্ষয়ক্ষতির হার এখন রাশিয়ার নতুন সৈন্য সংগ্রহের ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। আর সংখ্যার আড়ালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে প্রায় ১৪ লক্ষ নিহত ও গুরুতর আহতের পরিসংখ্যানের মধ্যে আরও ভয়াবহ একটি নতুন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। গত বছর পর্যন্ত নিহত ও আহত রুশ সৈন্যের অনুপাত সম্ভবত ছিল ১:২ থেকে ১:৩, যা আধুনিক মানদণ্ডে খারাপ হলেও অতীতের বহু সংঘর্ষের সঙ্গে মোটামুটি সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু মার্চে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া এখন প্রায় প্রতি এক আহত সৈন্যের বিপরীতে দুই জন নিহত সৈন্য হারাচ্ছে। “রুশ সৈন্যদের স্থৈর্য আর নিয়তিবাদী মানসিকতা নিশ্চয়ই ক্ষয় হতে শুরু করেছে,” বলেন স্যার লরেন্স।

নিহত-আহতের অনুপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্ভবত এই যে এখন প্রায় ৮০% হতাহতের জন্য দায়ী তথাকথিত ‘ফার্স্ট-পার্সন ভিউ’ বা এফপিভি ড্রোন। বিস্ফোরক বহনকারী এই ড্রোনগুলো শত্রু সৈন্যদের খুঁজে বের করে আক্রমণ করে এবং আহতদের সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে বিপজ্জনক করে তোলে—যদিও চিকিৎসা-উদ্ধার কখনওই রুশ বাহিনীর উচ্চ অগ্রাধিকার ছিল না। “ওরা আহতদের যুদ্ধক্ষেত্রেই ফেলে রেখে যায়,” বলেছেন ওয়াশিংটনের

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর জ্যেষ্ঠ সামরিক বিশ্লেষক সেথ জোন্স।

রুশ সৈন্যদের অভিযোগ, ইউক্রেনের নতুন স্বয়ংক্রিয় ড্রোনগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত কোনও শব্দই করে না। এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এবং জ্যামার এড়াতে ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। রাশিয়ার ভেলিকি নভগোরোদ শহরের একটি ড্রোন উন্নয়ন ও পরীক্ষাকেন্দ্রের পরিচালক অ্যালেক্সি চাদায়েভ ৭ এপ্রিল লিখেছিলেন যে গত ছয় মাসে রাশিয়া “নেতৃত্ব হারিয়েছে” এবং ফ্রন্টলাইনের কাছে ইউনিট সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। “শেষ মাইলের রসদ সরবরাহে আমাদের ভয়াবহ সমস্যা রয়েছে,” তিনি লিখেছিলেন। “বর্তমানে আমাদের ড্রোন-দলের ক্ষতির ৯০% পর্যন্ত সেখানেই হচ্ছে।” ডনেতস্কে রাশিয়াকে কনভয়ের আকার সীমিত করতে হয়েছে যাতে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়। একসঙ্গে কেবল দুটি ট্রাক চলতে দেওয়া হচ্ছে।

স্যার লরেন্সের মতে, ফ্রন্টলাইনের মাঝখানে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিস্তৃত যে ড্রোন “হত্যাক্ষেত্র” তৈরি হয়েছে, সেটি এখন রাশিয়ার অনেক ভেতর পর্যন্ত প্রসারিত হচ্ছে। এর প্রভাব রুশ অভিযানের ওপর ইউক্রেনের তুলনায় অনেক বেশি, কারণ অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে রাশিয়াই। ইউক্রেনের জন্য আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়া অল্প কয়েকজন সৈন্যকে হত্যা করার চেয়ে সেই আক্রমণকে সমর্থন জোগানো অবকাঠামো ধ্বংস করা অনেক বেশি কার্যকর।

ড্রোনে পরিপূর্ণ এই হত্যাক্ষেত্রে ইউক্রেনীয়রাও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, কিন্তু তারা নিজেদের সৈন্যদের জীবনের অনেক বেশি মূল্য দেয়। তাই আহতদের সরিয়ে নেওয়া এবং ফ্রন্টলাইনের কাছে সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে তারা বেশি ব্যবহার করছে চালকবিহীন স্থলযান বা ইউজিভি। আর অধিকাংশ জায়গাতেই তারা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে না।

ফ্রন্টলাইন থেকে আরও পেছনে, ইউক্রেনের মধ্য-পাল্লার ড্রোন হামলায় রাশিয়া ক্রমবর্ধমান ক্ষতির মুখে পড়ছে। এই ড্রোনগুলোর পাল্লা ৫০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার। জেলেনস্কি সম্প্রতি দাবি করেছেন, এ বছর এখন পর্যন্ত এই ধরনের ব্যবস্থার সংগ্রহ ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে গোলাবারুদের গুদাম, ড্রোন সংরক্ষণাগার, কমান্ড ও কন্ট্রোল পোস্ট, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, রাডার এবং সাঁজোয়া যান ও সৈন্যদের সমাবেশস্থল।

যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনের গভীর আঘাত হানার অভিযানের ব্যাপ্তি, পাল্লা ও তীব্রতার বৃদ্ধি। মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো ইউক্রেন দীর্ঘ-পাল্লার ড্রোন হামলার সংখ্যায় রাশিয়াকে ছাড়িয়ে যায়। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দূরের অর্থনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুও এখন নিয়মিত আঘাতের মুখে পড়ছে। এর ফলে রাশিয়ার ৭০% জনগোষ্ঠী ইউক্রেনীয় ড্রোনের আওতায় চলে এসেছে। “এই হামলাগুলো রাশিয়ার ওপর মানসিক অভিঘাত সৃষ্টি করেছে,” বলেন জোন্স।

২৫ এপ্রিল দক্ষিণ ইউরালের গভীরে অবস্থিত শাগোল বিমানঘাঁটিতে হামলায় রাশিয়ার চারটি সেরা যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মে মাসের শুরুতে ইউরালের পার্ম অঞ্চলে একটি তেল শোধনাগার ও পাম্পিং স্টেশনে আগুন ধরে যায়। একাধিক অঞ্চলে তেল অবকাঠামো এবং তেল রপ্তানি কেন্দ্রগুলো ক্রমবর্ধমান হারে হামলার শিকার হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে বন্দর ও শোধনাগারে হামলার ফলে রাশিয়াকে দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উৎপাদন কমাতে হয়েছিল। ২৯ এপ্রিল জেলেনস্কি দাবি করেন, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট অনুযায়ী নভোরোসিস্ক ও উস্ত-লুগা বন্দর যথাক্রমে ৩৮% এবং ৪৩% কম সক্ষমতায় কাজ করছে। তবে সামগ্রিকভাবে এপ্রিল মাসে রাশিয়ার তেল রপ্তানি মাত্র ৭% কমেছে, এবং ইরান যুদ্ধের কারণে তাদের রাজস্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

রাশিয়ার বিশাল ভৌগোলিক আয়তন এবং গত এক বছর ধরে ইউক্রেনের পরিকল্পিত আকাশ প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা দুর্বল করার অভিযানের ফলে মূল্যবান সম্পদগুলো রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। “এলাকাভিত্তিক প্রতিরক্ষার মাধ্যমে তারা ড্রোন হামলা ঠেকাতে পারছে না,” বলেন জোন্স। “আর যেসব স্থানে তাদের প্রতিরক্ষা সবচেয়ে প্রয়োজন, সেসব জায়গায় পর্যাপ্ত পয়েন্ট ডিফেন্সও নেই।” অন্যদিকে ইউক্রেন কয়েক ধরনের ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরি করেছে, যেগুলো এখন রাশিয়ার শাহেদ ধরনের আক্রমণকারী ড্রোনের প্রায় ৯৫% ভূপাতিত করছে। কিন্তু রাশিয়া নিজেদের সংস্করণ তৈরি করতে খুবই ধীরগতির।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যুদ্ধক্ষেত্রে বা অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে রাশিয়ার এই বহুমুখী বিপর্যয় কি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইউক্রেনে পুতিনের সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে? স্যার লরেন্সের মতে, অনেক কিছু নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসের ওপর, বিশেষ করে রাশিয়া ইউক্রেনের ড্রোন-অগ্রগতির মোকাবিলা করতে পারে কি না তার ওপর। আরেকটি উদ্বেগ হলো, রাশিয়া কি গ্রীষ্মে বড় ধরনের আক্রমণের জন্য নিজেদের বাহিনীকে জমিয়ে রাখছে? “বাস্তবতা হলো, তারা ফ্রন্টলাইনে সংগ্রাম করছে এবং প্রায় কিছুই তাদের পক্ষে যাচ্ছে না,” তিনি বলেন। জোন্সও একমত: “রাশিয়ার পরিস্থিতি কীভাবে উন্নত হতে পারে তা বোঝা কঠিন। আপনি যদি পুতিনকে ব্রিফ করেন, তাহলে চিত্রটা যথেষ্ট অন্ধকার।”