বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গ–বাংলাদেশ সীমান্তের যে অংশগুলি এখনও পুরোপুরি বেড়াবন্দি নয়, সেগুলি দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অনুপ্রবেশ, গবাদি পশু ও মাদক চোরাচালান, জাল নোট পাচার এবং মানবপাচারের জন্য সংবেদনশীল বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে নদীবহুল ও ঘন জনবসতিপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলগুলিকে বিএসএফ বহুবার “highly porous stretches” (“অরক্ষিত ও সহজভেদ্য সীমান্ত এলাকা”) বলে বর্ণনা করেছে।
অবৈধ পারাপার
সবচেয়ে বেশি আলোচিত সমস্যা হল অবৈধ পারাপার। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট, বাগদা, স্বরূপনগর, নদিয়ার কিছু অংশ, মালদা ও মুর্শিদাবাদের নদীঘেরা সীমান্তে বহু বছর ধরেই রাতের অন্ধকার, নদীপথ এবং স্থানীয় চোরাচালান নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগ উঠেছে। বিএসএফের বার্ষিক রিপোর্টে প্রায় প্রতি বছরই হাজার হাজার অনুপ্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ করার কথা উল্লেখ করা হয়।
জাল নোট পাচার
বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও মালদা দীর্ঘদিন জাল নোট পাচারের করিডর হিসেবে কুখ্যাত ছিল। জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA) ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির রিপোর্টে বলা হয়েছে, সীমান্তের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পাকিস্তানি নেটওয়ার্কের ছাপানো জাল ভারতীয় মুদ্রা বাংলাদেশ হয়ে ভারতে ঢুকত। যদিও নোটবন্দির পর এই প্রবণতা অনেকটা কমেছে।
গবাদি পশু পাচার
গবাদি পশু পাচারও ছিল বড় সমস্যা। বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া এবং মুর্শিদাবাদ সীমান্তে রাতের অন্ধকারে সংগঠিত চোরাচালান চক্র সক্রিয় ছিল বলে বহুবার অভিযোগ ওঠে। পরে এই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কেও রূপ নেয়। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা অভিযোগ করে, সীমান্ত চোরাচালানের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির যোগ ছিল।
মাদক পাচার
মাদক পাচারের ক্ষেত্রেও সীমান্তের কিছু অংশ অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। ইয়াবা ট্যাবলেট, ফেনসিডিল, গাঁজা ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ ওষুধ বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের রুট ধরে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। বিএসএফ প্রায়ই কয়েক কোটি টাকার মাদক উদ্ধার করার দাবি করে।
মানবপাচার
মানবপাচারও একটি গুরুতর সমস্যা। সীমান্তবর্তী দরিদ্র অঞ্চলগুলিতে নারী ও শিশু পাচারের বহু ঘটনা ধরা পড়েছে। বিশেষ করে নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও মালদা জেলার কিছু অংশ বহু বছর ধরেই মানবপাচার বিরোধী সংস্থাগুলির নজরের মধ্যে রয়েছে।
বাস্তবতার আরেকটি দিক
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও রয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বহু মানুষের জীবনযাত্রা ঐতিহাসিকভাবে দুই বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। বহু গ্রামের আত্মীয়তা, বাজার, কৃষিজমি ও জীবিকা সীমান্তের দুই পাশে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে সব ধরনের পারাপারকে অপরাধমূলক অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখা বাস্তব পরিস্থিতিকে অতিসরল করে ফেলতে পারে।
তবু নিরাপত্তা সংস্থাগুলির দৃষ্টিতে সমস্যাটি গুরুতর। কারণ সীমান্তের কিছু অংশে এখনও নদীপথ কার্যত উন্মুক্ত। কাঁটাতারের ফাঁক বা “gap” ব্যবহার করে সংগঠিত নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় দালালচক্র ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ বহুবার উঠেছে। আর বেড়াহীন সীমান্ত নজরদারির খরচ ও জটিলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে দ্রুত ফেন্সিং সম্পূর্ণ করার উপর জোর দিয়ে আসছে।