বাংলাস্ফিয়ারঃ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কে এই অভিযোগ জোরালোভাবে উঠেছে যে পশ্চিমবঙ্গের ভূমি নীতি ও জমি হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে বহু বছর আটকে রেখেছিল। তবে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিতর্কিত, এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ আলাদা।
সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের হলফনামা
২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সুপ্রিম কোর্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ হলফনামা জমা দেয়। সেই হলফনামাতেই প্রথম স্পষ্টভাবে বলা হয় যে পশ্চিমবঙ্গের ভূমি নীতি এবং জমি হস্তান্তরের জটিল প্রক্রিয়া ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রের বক্তব্য ছিল, সীমান্তে বেড়া তৈরির জন্য শুধু অর্থ বা নিরাপত্তা বাহিনী থাকলেই হয় না, সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জমি। আর সেই জমি দ্রুত হাতে না পাওয়াতেই কাজ বছরের পর বছর আটকে রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার “ডাইরেক্ট ল্যান্ড পারচেজ পলিসি” অনুসরণ করে, অর্থাৎ সরকার সরাসরি জমির মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে জমি কেনে। শুনতে গণতান্ত্রিক ও মানবিক মনে হলেও বাস্তবে এতে প্রতিটি জমির মালিকের সম্মতি, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, নথি যাচাই ও প্রশাসনিক অনুমোদন— সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীর হয়ে পড়ে। কেন্দ্রের অভিযোগ ছিল, জাতীয় নিরাপত্তার মতো জরুরি ক্ষেত্রেও এই দীর্ঘসূত্রতা কাটানো যায়নি।
কেন্দ্র আদালতে আরও জানায়, ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের ২,২১৬ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৪৩৫ কিলোমিটার অংশ এখনও বেড়াহীন, এবং তার বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গে। বহু জায়গায় জমি অধিগ্রহণ হয়ে গেলেও তা সময়মতো বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। ফলে সীমান্ত সুরক্ষার কাজ কার্যত থমকে ছিল।
কলকাতা হাইকোর্টের অসন্তোষ
এই বক্তব্য পরে কলকাতা হাইকোর্টেও প্রতিধ্বনিত হয়। আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করে জানায়, এত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রকল্পে কেন জমি হস্তান্তর এত ধীরগতিতে হচ্ছে, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা রাজ্য দিতে পারেনি। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জানুয়ারিতে নির্দেশ দেওয়ার পরেও ১২৭ কিলোমিটারের জায়গায় মাত্র ৮ কিলোমিটার জমি হস্তান্তর হয়েছিল। আদালত এমনও মন্তব্য করে যে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনিক গাফিলতি উদ্বেগজনক।
রাজ্যের পাল্টা বক্তব্য
তবে রাজ্য সরকারের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বিষয়টি ইচ্ছাকৃত বাধা সৃষ্টি নয়, বরং সীমান্ত এলাকার বাস্তব সমস্যার ফল। সীমান্তের বহু অংশে ঘন জনবসতি, কৃষিজমি এবং স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের প্রশ্ন জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে কাঁটাতারের বেড়া বসালে গ্রামবাসীরা নিজেদের জমিতে পৌঁছতেই সমস্যায় পড়তেন। এছাড়া নতুন ভূমি আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের নিয়মও আগের তুলনায় অনেক কঠোর হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রকে প্রায় ৩০০ একর জমি দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২৬ সালের মার্চেও রাজ্য সরকার ১০৫ একর জমি বিএসএফকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল।
রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে একটি প্রশ্ন
বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভিযোগ ছিল, সীমান্ত রাজনীতি ও ভোটব্যাঙ্কের হিসাবে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়া ধীর রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে রাজ্যের বক্তব্য ছিল, মানুষের জমি ও জীবিকার প্রশ্ন এড়িয়ে শুধু নিরাপত্তার যুক্তিতে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে রইল একটি বড় প্রশ্ন— এটি কি নিছক প্রশাসনিক জটিলতা, নাকি রাজনৈতিক অনীহা?
“পশ্চিমবঙ্গের ভূমি নীতি সীমান্ত বেড়া নির্মাণ আটকে দিয়েছিল”— এই বক্তব্য পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়, কারণ আদালত ও কেন্দ্রীয় নথিতে জমি নীতিকে একটি বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এটিকে একমাত্র কারণ বলা অতিসরলীকরণ হবে। এর সঙ্গে জড়িত ছিল স্থানীয় জমি আইন, সীমান্তবর্তী বসতির বাস্তবতা, কেন্দ্র–রাজ্য সংঘাত এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক টানাপোড়েন। ২০২৩ সালের সেই হলফনামার পর থেকেই বিষয়টি জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।