Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ারঃ ১৯৭৯ সালে কমিউনিস্ট চীন আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রায় এক বছরের মধ্যেই বেজিং একটি নতুন দাবি তোলে— তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান যেন তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন। রেগানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার হেগ এই প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলেন, তাঁর যুক্তি ছিল, চীন অচিরেই বিশ্বের “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ” হয়ে উঠবে। রেগান হেগকে বরখাস্ত করেন, তবে শেষমেশ একটি আপসে রাজি হন। ১৯৮২ সালের যৌথ ঘোষণায় আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দেয়, চীনের উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ হলে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি ক্রমান্বয়ে কমানো হবে। পাশাপাশি রেগান গোপনে তাইওয়ানকেও আমেরিকার সমর্থনের আশ্বাস দেন।
সেই থেকে বহু বছর ধরে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে শান্তি টিকে আছে মূলত এই ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক অস্পষ্টতার উপর ভর করে। চীন বারবার তাইওয়ানের প্রতি আমেরিকার নিরাপত্তা-প্রতিশ্রুতি দুর্বল করার চেষ্টা করেছে, আর পরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সেই প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে এসেছেন।
এখন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেজিং সফরের প্রাক্কালে, সেই পুরনো চাপ নতুনভাবে ফিরে এসেছে। তাইপে ও ওয়াশিংটনে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ছে— বৃহত্তর কোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে ট্রাম্প হয়তো শি জিনপিংয়ের কাছে মাথা নোয়াতে পারেন।
সামরিক শূন্যতা ও অস্ত্র সংকট
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ। এই যুদ্ধ তাইওয়ানে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষমতা এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা— দুটোই ক্ষয় করে দিচ্ছে। এশিয়া থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে একটি বিমানবাহী রণতরী-নির্ভর স্ট্রাইক গ্রুপ, একটি মেরিন অভিযানকারী ইউনিট এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম। প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরসহ বিপুল গোলাবারুদ খরচ হয়ে গেছে। এর প্রভাব সামরিক প্রস্তুতিতে বছরের পর বছর ধরে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তাইওয়ানের নিজের প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই আটকে আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
আমেরিকা ও তাইওয়ানের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখনও মজবুত এবং অস্ত্র সরবরাহ সঠিক পথেই এগোচ্ছে। ২০২৭ সালে চীনা হামলার আশঙ্কাকেও তাঁরা খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, শি জিনপিং তাঁর সেনাবাহিনীকে ওই সময়সীমার মধ্যে তাইওয়ান আক্রমণে সক্ষম করে তুলতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে সম্প্রতি চীনা সামরিক নেতৃত্বে শি-র শুদ্ধি অভিযান এবং ট্রাম্পের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সামরিক শক্তির প্রদর্শন— দুটো মিলে স্বল্পমেয়াদে আক্রমণের আশঙ্কা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তাইওয়ানের ভেতরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন
এই অনিশ্চয়তার ঢেউ এসে লাগছে তাইওয়ানের ভেতরের রাজনীতিতেও। প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাঙ (কেএমটি)-এর নতুন নেত্রী চেং লি-উন নভেম্বরের স্থানীয় নির্বাচন ও ২০২৮-এর রাষ্ট্রপতি ভোটের আগে বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে মরিয়া। এপ্রিলে তিনি গত এক দশকে প্রথম কেএমটি নেতা হিসেবে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাইওয়ানের সংসদ নিয়ন্ত্রণকারী কেএমটি ও তার মিত্ররা সম্প্রতি ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব আটকে দিয়েছে, যার বড় অংশই আমেরিকান অস্ত্র কেনায় যাওয়ার কথা ছিল। এই বিলম্ব চলতে থাকলে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র পাওয়ার তালিকায় তাইওয়ান একেবারে পেছনে চলে যেতে পারে।
পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদনকারী এই দ্বীপকে ঘিরে পরিস্থিতি তাই ক্রমেই জটিল হচ্ছে।
শীর্ষ বৈঠকের আগে কূটনৈতিক দরকষাকষি
অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প-শি বৈঠকে তাইওয়ান বিষয়টি খুব একটা আলোচনায় আসেনি। কিন্তু ডিসেম্বরে ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য রেকর্ড ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করলে চীন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরপর থেকে চীনা কর্মকর্তারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন— বেজিং বৈঠকে তাইওয়ানই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
জানুয়ারিতে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে শি বলেন, তাইওয়ানই “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়” এবং দ্বীপটিতে অস্ত্র বিক্রিতে আমেরিকার “চরম সতর্কতা” দেখানো উচিত।
এরপর ট্রাম্প প্রকাশ্যেই জানান, তিনি শি-র সঙ্গে ভবিষ্যতের অস্ত্র বিক্রি নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন। কিছুদিনের মধ্যে জানা যায়, হোয়াইট হাউস প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন প্যাকেজ স্থগিত রেখেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শীর্ষ বৈঠকের আগে অস্ত্র বিক্রি সাময়িক বিলম্বিত করা নতুন নয় কিন্তু ট্রাম্পের মন্তব্যে যে ইঙ্গিত মিলছে, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে তা হবে ১৯৮২ সালের রেগান-যুগের প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন।
চীন আরও চাইছে, ট্রাম্প তাইওয়ান নিয়ে আমেরিকার সরকারি ভাষ্য পরিবর্তন করুন। আমেরিকা এখন বলে, তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে “সমর্থন করে না”। চীন চাইছে, ট্রাম্প বলুন আমেরিকা তাইওয়ানের স্বাধীনতার “বিরোধী”। এই দুটি বাক্যের মধ্যে পার্থক্য সূক্ষ্ম কিন্তু কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান ভাষ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাইওয়ান স্বাধীনতা অর্জন করলে আমেরিকা আপত্তি করবে না। এছাড়া চীন চাইছে, ট্রাম্প বলুন তিনি “শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণ”-এর বিরোধী নন যা বর্তমান মার্কিন নীতি থেকে একটি বড় সরে আসা হবে।
বেজিংয়ের ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন-আমেরিকা সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ দা ওয়েই মনে করেন, সাম্প্রতিক ফোনালাপে ট্রাম্প “বার্তাটি বুঝে গেছেন”। তাঁর পূর্বাভাস, ট্রাম্প ভবিষ্যতে ছোট আকারের অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করবেন এবং পরবর্তী প্যাকেজের আগে কয়েক মাস অপেক্ষা করবেন। না হলে শি জিনপিং তাঁর পরিকল্পিত আমেরিকা সফর বাতিল করতে পারেন।
তাইপের আশঙ্কা ও সামনের পথ
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলছেন, তাইওয়ান ইতিমধ্যেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শুধুমাত্র সেখানকার জনগণের। তাঁর সরকার ওয়াশিংটনে নিজেদের সমর্থক বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে তাইপে স্বীকার করছে সেই প্রভাব ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
তাইওয়ান সরকারের আশঙ্কা, ভাষাগত যেকোনো ছাড় এই বার্তা দেবে যে দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দরকষাকষি চলতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের মনোবল ভাঙবে এবং কেএমটিকে ক্ষমতায় ফেরানোর শি জিনপিংয়ের কৌশল জোরদার হবে। আর অস্ত্র বিক্রি কমলে বা বিলম্বিত হলে তাইওয়ানের সেনা-আধুনিকীকরণ বড় ধাক্কা খাবে।
এবারের বৈঠকে নাটকীয় কোনো পরিবর্তনের প্রত্যাশা কেউই করছেন না। চীনা কর্মকর্তারা একটি চতুর্থ দ্বিপাক্ষিক যৌথ ঘোষণার আগের প্রচেষ্টা আপাতত সরিয়ে রেখেছেন। তার বদলে লিখিত চুক্তি ছাড়াই ছাড় আদায়ের কৌশল নিয়েছেন। আর এবার না হলেও ২০২৬ সালে পরিকল্পিত আরও তিনটি শীর্ষ বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যু সামনে রাখার পরিকল্পনা বেজিংয়ের রয়েছে।
বাইডেন প্রশাসনে চীন বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা হেনরিয়েটা লেভিন সতর্ক করছেন, এই প্রক্রিয়ায় তাইওয়ানকে ঘিরে কার্যত একটি “ছায়া-চুক্তি” তৈরি হতে পারে। কারণ এতে ট্রাম্পের সামনে এমন এক নীরব প্রণোদনা তৈরি হবে, যাতে তিনি শি জিনপিংকে বিরক্ত করতে পারে এমন যেকোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলবেন। বহু দশক ধরে তাইওয়ান প্রণালিতে আমেরিকার “কৌশলগত অস্পষ্টতা” চীনকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কিন্তু দায়িত্বহীন অস্পষ্টতা সেই একই নিরাপত্তা দিতে পারে না।