Home খবর শুভেন্দুই কি নয়া মুখ‍্যমন্ত্রী?

শুভেন্দুই কি নয়া মুখ‍্যমন্ত্রী?

0 comments 13 views
A+A-
Reset

এক রাজনৈতিক অভিযাত্রার অন্তরঙ্গ পাঠ

উত্তরাধিকার ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট

পূর্ব মেদিনীপুরের কার্কুলি গ্রামে ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্ম শুভেন্দু অধিকারীর। সমুদ্র থেকে বেশি দূরে নয় এই জনপদ — লাল মাটি, নারকেলগাছের সারি, কাঁচা রাস্তায় পায়ের ছাপ। বাংলার রাজনীতিতে এই পরিচয়, এই ভূগোল, অনেকটাই নির্ধারণ করে দিয়েছে শুভেন্দুর চরিত্র ও গন্তব্য — উভয়ই। পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রসারিত স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপিন বিহারী অধিকারী পর্যন্ত। পিতা শিশির কুমার অধিকারী ছিলেন মনমোহন সিং সরকারের গ্রামোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী। রাজনীতি এই পরিবারে পেশা নয়, প্রাত্যহিক নিঃশ্বাস। ভাই দিব্যেন্দু তৃণমূলের হয়ে তমলুকে জিতেছেন, ভাই সৌমেন্দু এখন বিজেপির কাঁথি সাংসদ। এই পরিবার একটি রাজনৈতিক রাজত্ব, যার কেন্দ্রে শুভেন্দু। এই পারিবারিক পরিমণ্ডল তাঁকে দিয়েছে বুথ-স্তরের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং সেই গ্রামীণ বোধ, যা কলকাতার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দলীয় দফতর থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়।

১৯৮০-র দশকের শেষভাগে কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে পিতার সঙ্গে কংগ্রেস ত্যাগ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন — তখনও যে দল ক্ষমতার নয়, বিদ্রোহের।

রাজনৈতিক উত্থান: ছাত্র রাজনীতি থেকে নন্দীগ্রাম

ইতিহাসে শুভেন্দু অধিকারীর নাম প্রথম সত্যিকারের দাগ কাটে ২০০৭ সালে, নন্দীগ্রামে। বামফ্রন্ট সরকার সেখানে ১০,০০০ একরেরও বেশি জমি অধিগ্রহণ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল। কৃষকদের ক্ষোভ সংগঠিত করে শুভেন্দু গঠন করলেন ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি। তৃণমূল কর্মী ও গ্রামবাসীদের একত্রিত করে বামফ্রন্টের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে গড়ে তুললেন প্রতিরোধ। রাস্তা অবরোধ, মিছিল, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু — সেই উত্তাল দিনগুলোতে মাঠে ছিলেন তিনি। সেই আন্দোলন শুধু বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করেনি — ২০১১ সালে তৃণমূলের ঐতিহাসিক বিজয়ে এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসানে শুভেন্দুকে অন্যতম মূল স্থপতি হিসেবে গণ্য করা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন মুখ্যমন্ত্রী, শুভেন্দু হলেন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মাঠের সেনাপতিদের একজন।

এই নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ কারণ সেদিনের আন্দোলন ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক — হিন্দু-মুসলমান, জাতপাত নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই ঐক্যের প্রতীক শুভেন্দু এবং আজকের শুভেন্দুর মধ্যে যে দূরত্ব, তা শুধু একজন মানুষের বিবর্তনের গল্প নয় — গোটা দেশের রাজনীতির চরিত্র উন্মোচন করে।

বিশ্বাসঘাতকতা, না বিবর্তন?

তৃণমূলে শুভেন্দুর প্রভাব সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুকুল রায়ের প্রস্থানের পর। কিন্তু ঠিক তখনই দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কেন্দ্রটি সরতে শুরু করে। মমতা তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী হন — যে অবস্থান শুভেন্দু স্বাভাবিকভাবেই ধরে রেখেছিলেন এতদিন।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে “রাজবংশীয় রাজনীতি” ও নির্বাচন কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের প্রভাবের সমালোচনা করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। সমালোচকরা এটাকে ক্ষমতার অন্বেষণ বলেন, সমর্থকরা বলেন আত্মসম্মান রক্ষার সিদ্ধান্ত। সত্য সম্ভবত দুটোর মধ্যবর্তী কোথাও।

যা অনস্বীকার্য, তা হল এই দলবদলের পর তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে বিরল সাহসের এক নজির স্থাপন করলেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি মুখোমুখি চ্যালেঞ্জ করলেন — সেই নন্দীগ্রামে, যেখানে একদিন মমতার হয়ে মাটি কামড়ে লড়েছিলেন। ফলাফল: ১,৯৫৬ ভোটের ব্যবধানে শুভেন্দুর জয়।

সেই জয় তাঁকে বিধানসভার বিরোধী দলনেতার আসনে বসাল। পরবর্তী পাঁচ বছরে তিনি কেবল বিরোধিতা করেননি, নিজেকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। তৃণমূল থেকে বেরিয়ে এসে ধীরে ধীরে বিজেপির হিন্দুত্ব আদর্শের একনিষ্ঠ প্রবক্তায় পরিণত হয়েছেন, যিনি একসময় সেই আদর্শের কঠোর সমালোচকদের একজন ছিলেন। তিনি দাবি করতে শুরু করলেন, তৃণমূল জিতলে পশ্চিমবঙ্গ “পূর্ব বাংলাদেশ” হয়ে যাবে। এটি নিছক বক্তৃতার কৌশল নয়, এটি একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের সচেতন ও দক্ষ পুনর্নির্মাণ।

বিরোধী দলনেতা হিসেবে বিধানসভায় তীক্ষ্ণ ও তথ্যভিত্তিক বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেছেন এবং তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সরব থেকেছেন। সন্দেশখালিতে ইডির উপর হামলা, মুর্শিদাবাদের সাম্প্রদায়িক সংঘাত — প্রতিটি ঘটনাকে রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন, কখনো তথ্যের ভিত্তিতে, কখনো বা অতিরিক্ত উত্তাপ ছড়িয়ে।

২০২৬: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

২০২৬ সালের নির্বাচনে শুভেন্দু করলেন সেটাই যা একসময় মমতা করেছিলেন — একসঙ্গে দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, যে কেন্দ্র থেকে মমতা নিজে বিধায়ক। ভবানীপুরে জিতলেন ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে, নন্দীগ্রামে ৯,৬৬৫ ভোটে। পরপর দুটি নির্বাচনে, দুটি আসনে, একজন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করার এই নজির সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ১৯৬৭ সালে, যখন অজয় মুখোপাধ্যায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে পরাজিত করেছিলেন।

এই জয়ের পর দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব যখন বঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর নাম নিয়ে আলোচনা করছেন, শুভেন্দুর নাম সবার আগে উঠে আসছে। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই জরুরি হয়ে পড়ে: যে শুভেন্দু বিরোধী নেতা হিসেবে প্রতিস্পর্ধা ও আক্রমণে নিজেকে গড়েছেন, তিনি কি রাজ্য পরিচালনার ধৈর্য ও দূরদৃষ্টি রাখেন? যোদ্ধা আর শাসক — দুটি ভিন্ন পেশা।

শক্তির অন্তরালে দুর্বলতার মানচিত্র

শুভেন্দু অধিকারীর সবচেয়ে বড় শক্তি মাঠের বোঝাপড়া। বুথ স্তরে নেটওয়ার্ক তৈরি করার ক্ষমতা, কৃষক ও স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক হাওয়া বদলের আগেই তা বুঝে নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে বিশিষ্ট করে তোলে। ২০২৬ সালে পূর্ব মেদিনীপুরের সব ১৬টি আসনে বিজেপির জয় নিশ্চিত করা তাঁর সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রমাণ। তৃণমূলে থাকাকালীন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে দলের সাংগঠনিক ভিত তৈরিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। সেই অভিজ্ঞতাই এখন কাজে লেগেছে বিজেপির ঘরে।

তবে প্রশ্ন থাকে: তিনি কতটা শুধু দক্ষিণবঙ্গের নেতা? উত্তরবঙ্গে, কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজে এবং রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাতাশ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু — সেই প্রশ্নের উত্তর নির্বাচনী সংখ্যা দিয়ে মেটানো যায় না।

জয়ের মুহূর্তে তাঁর বক্তব্য তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলেছে। বিজয়ী হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বললেন, “নন্দীগ্রামের হিন্দু জনতা আমাকে আবার জিতিয়েছে। সেখানে মুসলমানের পুরো ভোট তৃণমূলে গেছে। এরা ভোট কট্টরবাদী। আমি নন্দীগ্রামের হিন্দুদের জন্য কাজ করব।” ভবানীপুরের জয়কে তিনি “হিন্দুত্বের জয়” বলে ঘোষণা করলেন এবং বললেন, “মুসলমানরা হিজাব পরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দিয়েছে।”

এই কথাগুলো নির্বাচনী প্রচারের উত্তাপে বলা নয়। বলা হয়েছে বিজয়ের পর, শান্ত মাথায়, সংবাদমাধ্যমের সামনে। এবং এই বক্তব্য তাঁর ভবিষ্যৎ প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সামনে এনে দেয়: একজন মুখ্যমন্ত্রী কি কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হতে পারেন? এই প্রশ্ন তাঁর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

বাংলার ইতিহাস এই প্রশ্নকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। এই সেই ভূমি, যেখানে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের রক্ত এখনও তাজা। এখানে সাম্প্রদায়িক আগুন জ্বালানো যতটা সহজ, নেভানো ততটাই কঠিন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে মুর্শিদাবাদে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘাত তৈরি হলে শুভেন্দু সরাসরি দাবি করেছিলেন, ৪০০-র বেশি হিন্দু বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ভোটব্যাংকের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো হয়েছে। সমর্থকরা এটাকে সাহসী সত্যকথন বলেন, সমালোচকরা বলেন বিভাজনের রাজনীতি।

আইনি জটিলতার প্রশ্নও আছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ২৫টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তিনি বলেন, অধিকাংশই বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল। বাংলার রাজনীতিতে মামলা-গ্রেফতার দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাই এই দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিকও নয়। তবে সারদা গ্রুপের পনজি স্কিম মামলায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল ২০১৩ সালে, সেই সময়ে তিনি তৃণমূলেই ছিলেন।

তাঁর আরেকটি সম্ভাব্য দুর্বলতা হল দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা। তিনি অমিত শাহের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘দিল্লির প্রতিনিধি’র চেয়ে ‘বাংলার ভূমিপুত্র’ ভাবমূর্তি বেশি কার্যকর। শুভেন্দু কি সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবেন? মমতার দীর্ঘ শাসনের অন্যতম কারণ ছিল তাঁর “বাংলার মেয়ে, বাংলার মানুষের নেত্রী” — এই ভাবমূর্তি। শুভেন্দুকে সেই পরীক্ষা দিতে হবে: তিনি বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবেন, না দিল্লির প্রতিনিধি?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় নেটওয়ার্ককে রাজ্যব্যাপী আবেদনে পরিণত করার সত্যিকারের পরীক্ষা নির্বাচনে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যে শেষ হয়নি, বরং এখন সেই পরীক্ষার মূল পর্ব শুরু হচ্ছে। বিরোধীর আসনে বসে আক্রমণ করা সহজ। মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসে রাজ্যের ত্রিশ কোটি মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয় — তাঁদের কাছেও, যাঁরা তাঁকে ভোট দেননি।

শুভেন্দু অধিকারী এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিরোধী নেতা হিসেবে তিনি শাণিত এবং রণনিপুণ, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে তিরিশ কোটি মানুষের অভিভাবক হতে হবে। নন্দীগ্রামের মাটি তাঁকে শিখিয়েছিল সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে লড়তে; সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি না কি বর্তমানের কট্টর অবস্থান—কোন পথে আগামীর বাংলাকে তিনি নেতৃত্ব দেবেন, তা সময়ই বলবে। রণকৌশলী শুভেন্দুর প্রকৃত পরীক্ষা কেবল ক্ষমতায় আসীন হওয়া নয়, বরং বহুস্বর ও বহুধর্মের এই রাজ্যকে স্থায়িত্ব ও বিচার দেওয়া।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles