Home খবর তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়

তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়

0 comments 22 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বাংলায় একটা কথা আছে, সাপ মারা যাওয়ার পরেও লেজ নাড়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনকে এর চেয়ে যথাযথ রূপকে বোঝানো কঠিন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র আশিটি আসন, আর বিজেপি পেয়েছে দুশো ছয়টি। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ‍্যা গরিষ্ঠতা।পনেরো বছর ধরে যে রাজ্যটিকে তিনি নিজের একান্ত সম্পত্তি মনে করে এসেছিলেন, ভোটের রায়ে সেটি তাঁর হাত থেকে খসে পড়েছে।  তাঁর একদা ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে পরাজিত করেছেন পনেরো হাজার একশো পাঁচ ভোটের ব্যবধানে।  বিপর্যয়ের মাপকাঠিতে এটি নিছক একটি নির্বাচনী পরাজয় নয়, এ হল একটি রাজনৈতিক সাম্রাজ্যের ধূলিসাৎ হওয়ার সামিল। কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ করেননি, পরাজয় স্বীকার করেননি। বলেছেন তিনি ফিরে আসবেন।

 

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সারা জীবনে পরাজয়কে কখনও পরাজয় বলে মানেননি।এটি তাঁর স্বভাবের অংশ, চরিত্রের গভীরে প্রোথিত একটি বিশ্বাস যে তিনি যা করেন তাই ঠিক, তিনি যখন হারেন তখন কেউ তাঁকে হারিয়ে দেয়। নির্বাচনের আগে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, ভবানীপুর থেকেই প্রার্থী হবেন এবং এক ভোটে হলেও জিতবেন।  বাস্তব ঘটল ঠিক উল্টো। কিন্তু তাতে আত্মজিজ্ঞাসার বদলে এলো অভিযোগের তোড়। ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “বিজেপি একশোটা সিট লুট করেছে।”  হাজার হাজার বুথে লক্ষ লক্ষ ভোটার যে রায় দিয়েছেন, সেটি নাকি লুটের ফসল। জনতার রায়ের এই ব্যাখ্যাটুকু নিয়ে একটু ভাবলে বোঝা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে গণতন্ত্র একটি একমুখী রাস্তা, যখন জেতেন তখন সেটি জনতার আশীর্বাদ, যখন হারেন তখন সেটি ষড়যন্ত্রের ফল।

 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এই ভঙ্গিটি তাঁর নতুন নয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে দেড় হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি। যদিও সেই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে তৃণমূল।  নন্দীগ্রামে হেরে তিনি পরাজয় মেনে নেননি, আদালতে গিয়েছিলেন। পরে ভবানীপুরের উপনির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রীর গদি সামলেছিলেন। সেটি ছিল অগৌরবের প্রত্যাবর্তন। হতে পারে সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পটিকে তিনি আজও মনে রেখেছেন, তাই এবারও বলছেন ফিরে আসবেন।

 

কিন্তু এবারের পরিস্থিতি  আমূল আলাদা। তখন দল জিতেছিল, নেত্রী একটি আসনে হেরেছিলেন। এবার দল ভেঙে পড়েছে, নেত্রীও হেরেছেন। নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় স্বীকার করেননি, বরং অভিযোগ করেছেন নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিজেপি অন্তত একশোটি আসন তাদের কাছ থেকে লুট করে নিয়েছে।  এই অভিযোগটি শুনতে পরিচিত লাগে। কারণ মমতার রাজনীতির একটি চিরন্তন সূত্র আছে, যখন কিছু ব্যাখ্যা দেওয়ার থাকে না, তখন ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব নামিয়ে আনো। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে তীব্র আক্রমণ করে বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করেছে। পনেরো বছর ধরে রাজ্যে নির্বাচনী সন্ত্রাস, বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করা, বুথ দখল, এসবের পরিচালক যে দল, তার নেত্রী আজ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। এই দৃশ্যটির মধ্যে একটি নিখুঁত শ্লেষ আছে যা কোনও কার্টুনিস্টের তুলিতেও ধরা পড়ত না।

 

পদত্যাগের প্রশ্নটি আসলে মমতার রাজনৈতিক অভিধানে নেই। গণতন্ত্রে পরাজিত নেতার নৈতিক দায়িত্ব হয় পদ ছেড়ে দেওয়া, দলের পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলকে নিজের পরিচয়বিস্তার হিসেবে দেখেন, দল তাঁর জন্য, তিনি দলের জন্য নন। তৃণমূল কংগ্রেস নামক দলটি আসলে একজন ব‍্যক্তি বিশেষের  রাজনৈতিক প্রকল্প, যেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো উত্তরসূরি মাঝেমাঝে ডানা মেলার চেষ্টা করেছেন কিন্তু শেষমেশ হালে পানি পাননি।

 

পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আচরণটিকে শুধু ব্যক্তিগত অহঙ্কারের প্রকাশ বলে বিশ্লেষণ করলে বড় একটি দিক অনালোচিত থেকে যাবে।এর মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক কৌশলও আছে। নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি এই লড়াইকে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার বার্তা দিয়েছেন।  অর্থাৎ পরাজয়কে অস্বীকার করে তিনি নিজেকে বিরোধী নেত্রী হিসেবে প্রাসঙ্গিক রাখতে চাইছেন। রাজনীতিতে এটি একটি পরিচিত কৌশল, সত্যের চেয়ে আখ্যান তৈরির ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মমতা জানেন যে তাঁর ভক্তদের কাছে “লুটের” গল্পটি যুক্তির চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে।

 

কিন্তু এখানেই রয়েছে তাঁর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। পনেরো বছর ধরে বাংলার মানুষ যখন নতুন পথ খুঁজছিলেন, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের অপরিহার্যতার স্বপ্নে এতটাই মশগুল ছিলেন যে সেই সঙ্কেত তাঁর কানে পৌঁছায়নি। দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগকে ঢাকতে তাঁর প্রচেষ্টা যথেষ্ট হয়নি এবং ২০২৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসকে চড়া মাশুল দিতে হয়েছে।  কিন্তু সেই ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নেওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি তাঁর কোনও দিনই ছিল না, এখনও নেই। প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য অন্য কাউকে দায়ী করার এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি একটি গভীর চারিত্রিক বৈকল‍্য।

 

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি অসাধারণ অধ্যায় সন্দেহ নেই। একজন নারী যিনি কংগ্রেসের গড়ে-তোলা মাটিতে দাঁড়িয়ে একা লড়াই করেছেন, এই লড়াকু মানুষটির কথা ভবিষ্যতে কেউ বলবেন না তা নয়। কিন্তু যিনি পনেরো বছর ক্ষমতায় থেকে নিজের রাজ্যকে একটি ভোগ-লালসার অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত করলেন,  যিনি সন্দেশখালি থেকে বগটুই পর্যন্ত প্রতিটি অপরাধের পর দলীয় নেতাদের আড়াল করলেন, যিনি গণতন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় শাখা-অফিসে রূপান্তরিত করলেন, তিনি আজ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, এই দৃশ্যের পরিহাসটুকু উপভোগ করতে না পারলে বাঙালির সাহিত্যবোধ অসম্পূর্ণ থাকবে।

 

পরাজয়ের পর মমতা বলেছেন, “জোর করে আমাকে হারানো হয়েছে। আমি আবার ফিরে আসব।”  এই ঘোষণাটি শুনতে লড়াকু মনে হয়, কিন্তু আসলে এটি একটি গভীর রাজনৈতিক অস্বীকৃতি আর চূড়ান্ত মানসিক অসুস্থতার দলিল। ইতিহাসের মঞ্চে এই ধরনের “আমি ফিরব” বলে যাওয়া নেতাদের তালিকা দীর্ঘ। কেউ কেউ সত্যিই ফেরেন। কিন্তু যাঁরা ফেরেন, তাঁরা সাধারণত আগে বোঝার চেষ্টা করেন কেন তাঁদের নির্মম পতন হয়েছিল। সেই আত্মজিজ্ঞাসার আলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক মানসে কোনও দিন জ্বলে উঠেছে বলে মনে পড়ে না। তাই “ফিরে আসার” এই প্রতিশ্রুতি দলের অবশিষ্ট সমর্থকদেরও আশ্বস্ত করতে পারবেনা আর বাংলার মানুষ একে  একটি পরিচিত নাটকের পরিচিত সংলাপ হিসেবে মনে রাখবে। সেই নাটকের শিরোনাম হবে “তরী ডোবার পালা”।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles