Home সুমন নামা দুঃস্বপ্নের অবসান

দুঃস্বপ্নের অবসান

by Suman Chattopadhyay
0 comments 189 views
A+A-
Reset

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: ২০১১ সালের ১৩ মে রাতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যখন রাস্তায় নেমেছিলেন, তখন তাঁদের মুখে যে হাসি ছিল সেটা শুধু জয়ের হাসি ছিল না। সেটা ছিল পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস। চৌত্রিশ বছর ধরে বুকের উপর যে ভার চাপা ছিল, সেটা একটু সরল  এই অনুভূতি। যে মানুষটি ১৯৭৭ সালে জন্মেছিলেন তিনি সেই রাতে চৌত্রিশ বছর বয়সে প্রথমবার দেখলেন অন্য একটা সরকার। তাঁর বাবা বামকে ভোট দিয়েছেন, দাদাও দিয়েছেন। পরিবর্তন মানে কী এই ধারণাটাই তাঁর কাছে বিমূর্ত ছিল। সেই রাতে ধারণাটা হঠাৎ মূর্ত হয়ে উঠল  এবং সেই মূর্ততার আনন্দ ছিল প্রায় শারীরিক।

আমিও সেই রাতে রাস্তায় ছিলাম। এবং সততার সঙ্গে বলছি, একটাও প্রশ্ন করিনি। আনন্দের মধ্যে প্রশ্ন করার মন থাকে না, এটা মানবস্বভাব। কিন্তু পনেরো বছর পরে সেই না-করা প্রশ্নগুলোই এবার করা প্রয়োজন।

তৃণমূলের নির্বাচনী স্লোগান ছিল মা-মাটি-মানুষ। যাত্রাপালার নাম হতে পারত। আসলে রূপকার্থে এটা নতুন শাসনের চরিত্র-চিত্রায়নই ছিল — আবেগ, মাটির গন্ধ, এবং একটা অস্পষ্ট মানবিক প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই আবেগঘন মুহূর্তে আমরা এসবের চুলচেরা বিশ্লেষণে যাইনি। মন চায়নি। শুধু জানতাম যা আছে তা চাই না। রহস্য উদ্ঘাটিত হতে সময় লেগেছিল যদিও খুব বেশি সময় নয়।

স্লোগান যখন সরকারে পরিণত হয় তখন অস্পষ্টতার বিলাসিতা থাকে না। তখন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, পক্ষ নিতে হয়, মুখোশ খুলতে হয়। প্রথম কয়েক মাস একটা নতুনত্বের উত্তেজনা ছিল। কিন্তু রাজনীতিতে নতুনত্বের আয়ু কম। লাল রঙের জায়গায় সবুজ এল, পদ্ধতি রইল একই। পার্টি অফিস থেকে এলাকা নিয়ন্ত্রণ, ক্যাডারের দৌরাত্ম্য, সরকারি সুবিধা বিতরণে দলীয় বিবেচনা এই ছবিগুলো বাংলার মানুষ চিনতেন, শুধু রঙটা বদলেছিল। যাঁরা সতর্ক ছিলেন তাঁরা বুঝলেন। বাকিরা অপেক্ষা করলেন, নতুন সরকারকে সময় দেওয়া উচিত।

২০১২ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র একটি কার্টুন ফরওয়ার্ড করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে। গ্রেফতার হলেন। ক্ষমতায় আসার মাত্র এক বছরের মধ্যে। এই ঘটনাটা ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে একটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দর্শন লুকিয়ে ছিল। বার্তাটা ছিল পরিষ্কার।  সমালোচনা সহ্য হবে না, ব্যঙ্গ সহ্য হবে না, ভিন্নমত সহ্য হবে না। যাঁরা বুঝলেন তাঁরা চুপ করলেন। যাঁরা বুঝতে চাননি তাঁরা বললেন ব্যতিক্রম, এরকম আর হবে না।

হয়েছে। বারবার হয়েছে।

ক্ষমতা মানুষকে বদলায়  এই কথাটা এত বেশি বলা হয়েছে যে এর ভেতরের সত্যটা ক্লিশেতে ঢাকা পড়ে গেছে। আসলে ক্ষমতা বদলায় না , উন্মোচন করে। যা ভেতরে ছিল, যা পরিস্থিতির চাপে লুকিয়ে ছিল, ক্ষমতার আলোয় তা বেরিয়ে আসে। এই পার্থক্যটা ছোট মনে হলেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি ক্ষমতা বদলায়, দোষটা ক্ষমতার। আর যদি উন্মোচন করে, দায়টা মানুষটার  এবং আংশিকভাবে আমাদেরও, যারা সেই মানুষটাকে বেছেছিলাম।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এই প্রশ্নটা তুলতেই হবে। যে মানুষটি রাস্তায় শুয়ে ট্রেন আটকেছেন, যিনি নন্দীগ্রামে একা ছুটে গেছেন, যিনি হাওয়াই চটি পরে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন , তিনি কি সত্যিই সেটাই ছিলেন যা দেখাচ্ছিলেন? নাকি সেটা ছিল একটা রণকৌশল, বিরোধিতার সময়ের জন্য যা কার্যকর, ক্ষমতার সময়ের জন্য যা অপ্রাসঙ্গিক? এই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর আমার কাছে নেই। কিন্তু প্রমাণগুলো দেখলে একটা ছবি তৈরি হয় — এবং সেই ছবিতে দেখা যায় একটি ক্রমবর্ধমান ব্যবধান। ২০১১ সালের মমতা এবং ২০২৬ সালের মমতার মধ্যে দূরত্বটা শুধু সময়ের নয়, চরিত্রের।

 

রাজনৈতিক স্মৃতিভ্রংশলহওয়া  শাসকের চিরন্তন স্বভাব । মানুষ ভুলে যান, নতুন ঘটনার চাপে পুরনো ঘটনা চাপা পড়ে, এবং যা মেনে নেওয়া যায় না বলে মনে হয়েছিল তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে গত পনেরো বছরে এই স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া দেখা গেছে। যা একসময় অসহ্য মনে হত তা পরে সহ্য হয়েছে। যা সহ্য হয়েছে তা প্রত্যাশিত হয়েছে এবং যা প্রত্যাশিত হয়েছে তা অপরিবর্তনীয় মনে হয়েছে। এই তিনটি ধাপে একটি সমাজ তার নিজের অবনতিকে মেনে নেয় এবং অনেক সময় টেরও পায় না।

এই লেখাটি লেখার সময় আমি বারবার একটা প্রলোভনের মুখে পড়েছি । সরলীকরণের প্রলোভন। মমতা খারাপ ছিলেন, তাঁর দল খারাপ ছিল, তাঁরা রাজ্য ধ্বংস করেছেন। এইভাবে লিখলে লেখাটা পরিষ্কার হত, একটি বিশেষ পাঠকগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় হত। কিন্তু সত্য হত না। মমতার শাসনে সত্যিকারের কিছু কাজ হয়েছে যা অস্বীকার করার উপায় নেই। কন্যাশ্রী প্রকল্প লক্ষ লক্ষ মেয়ের স্কুলছুট আটকেছে। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড বহু পরিবারের চিকিৎসার ভার বহন করেছে। এই সত্যগুলো স্বীকার না করলে বাকি সত্যগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা কমে।

 

কিন্তু এখানেই আসে আসল প্রশ্নটা। কল্যাণমূলক প্রকল্প আর সুশাসন কি একই জিনিস? রুটি দিলেই কি স্বাধীনতা দেওয়া হয়? একটি সরকার যদি সাইকেল দেয় কিন্তু ভোট দিতে গেলে ভয় দেখায়, চিকিৎসার খরচ বহন করে কিন্তু হাসপাতালে নিরাপত্তা না দেয়, ভাতা পাঠায় কিন্তু চাকরি কেড়ে নেয়  তাহলে সেই সরকারকে কল্যাণমুখী বলা যায়, গণতান্ত্রিক বলা যায় না। এই পার্থক্যটাই মমতার পতনের কেন্দ্রে।

 

এই লেখাটি কার জন্য সেটা বলে নেওয়া দরকার। যাঁরা ইতিমধ্যে মমতার সমালোচক তাঁদের জন্য নয়, তাঁরা এখানে নতুন কিছু পাবেন না। এই বই তাঁদের জন্য যাঁরা ২০১১ সালে আশা নিয়ে ভোট দিয়েছিলেন এবং পরে বিভ্রান্ত হয়েছেন। যাঁরা অনুভব করেছেন কিছু একটা ঠিক নেই কিন্তু ঠিক কোথায় ঠিক নেই ধরতে পারেননি। এই লেখা তাঁদের জন্যও যাঁরা তরুণ, যাঁরা ২০১১ সালের উত্তেজনা নিজের চোখে দেখেননি।

 

কিন্তু সবচেয়ে বেশি এই লেখা তাঁদের জন্য যাঁদের কথা কেউ লেখে না। সেই পরিবারের কথা ভাবুন যার ছেলে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে, মেধাতালিকায় নাম আছে, কিন্তু চাকরি নেই। বাবা জমি বেচেছেন, মা গয়না বেচেছেন। ছেলে আদালতের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে বছরের পর বছর। এই পরিবারের গল্প কোনো পত্রিকার প্রথম পাতায় আসে না। তারাই এই শাসনের আসল শিকার। এই লেখাটি তাদের জন্য, অন্তত তাদের যন্ত্রণার একটা দলিল হিসেবে।

পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে লেখার একটা বিশেষ অসুবিধা আছে। এই রাজ্যটা নিজেই একটা জটিল সত্তা, এর ইতিহাস পুরনো, সংস্কৃতি গভীর, রাজনীতি বঙ্কিম। আমি ভেতরের মানুষ। এই রাজ্যে জন্মেছি, বড় হয়েছি। ফলে আমার লেখায় ভেতরের মানুষের উষ্ণতা আছে, এবং ভেতরের মানুষের অন্ধ দিকগুলোও থাকতে পারে। এই রাজ্যে মেধা আছে, সংস্কৃতি আছে, ইতিহাস আছে। কিন্তু সম্ভাবনা এবং বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান সেটা দেখলে বুকটা ভারী হয়। যে রাজ্যে এত মেধা সেই রাজ্যের তরুণরা কাজের জন্য গুজরাটে যাচ্ছেন। যে রাজ্যে এত সংস্কৃতির ঐতিহ্য সেই রাজ্যে একজন অধ্যাপক কার্টুন শেয়ার করে গ্রেফতার হচ্ছেন। এই ব্যবধানটার একটা ব্যাখ্যা দরকার।

মমতার পতন কি অনিবার্য ছিল?  পিছন ফিরে তাকালে মনে হয় হ্যাঁ, এই পতনের বীজ শুরু থেকেই ছিল, শুধু অঙ্কুরিত হতে সময় লেগেছে। যে শাসন জবাবদিহি এড়িয়ে চলে, যে শাসন প্রতিষ্ঠান ভেঙে ক্ষমতা সংহত করে, যে শাসন মানুষের ভয়কে পুঁজি করে টিকে থাকে — সেই শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ইতিহাস এই সত্যটা বারবার প্রমাণ করেছে।

কিন্তু পতন মানেই পরিবর্তন নয়। একটা শাসনের অবসান হলে আরেকটা আসে। সেই নতুন শাসন কেমন হবে সেটা নির্ভর করে আমাদের উপর। কতটা সতর্ক থাকব, কতটা প্রশ্ন করব, কতটা জবাবদিহি চাইব। ২০১১ সালে এই কাজগুলো করিনি। এবার করতে হবে।

দুঃস্বপ্নের অবসান হলে কী আসে? আরেকটা স্বপ্ন, নাকি জাগরণ? স্বপ্ন সুন্দর কিন্তু বিপজ্জনক। স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নের দূরত্ব কম। জাগরণ কঠিন কিন্তু টেকসই, যে জেগে থাকে সে দুঃস্বপ্ন দেখে না। পশ্চিমবঙ্গ এই মুহূর্তে সেই দুই পথের সামনে দাঁড়িয়ে। দুঃস্বপ্নের প্রকৃত অবসান হয় স্মৃতিতে, বিস্মৃতিতে নয়।​​​​​​​​​​​​​​​​

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles