Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণের পরের দিনগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে সাহায্য করতে ৩০,০০০-এরও বেশি কাজাখ নাগরিককে ইউক্রেনের সেই দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছিল। তেজস্ক্রিয়তার মধ্যে যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাঁদের পক্ষে এখন নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে — আর ঠিক এই সময়েই তাঁদের দেশ একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করেছে।
স্মৃতির জাদুঘর
মধ্য কাজাখস্তানে অবস্থিত কারাগান্দা ইকোমিউজিয়ামে ঢুকলে প্রথম দেখায় মনে হয় সংগ্রহটি বেশ বৈচিত্র্যময়। ২০০৫ সালে খোলা এই জায়গাটি, যা সিটি হলের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত, দেশের পরিবেশ সংক্রান্ত নানা সমস্যা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে তৈরি। এখানে মহাকাশযানের ধাতব ধ্বংসাবশেষের পাশাপাশি রয়েছে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের মানচিত্র।
দেওয়ালে সাজানো বেশ কিছু ছবিও রয়েছে, যেগুলোয় দেখা যায় মাশরুমের মতো আকৃতির বিস্ফোরণের দৃশ্য — ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে তোলা। এই সময়কালেই সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব কাজাখস্তানের সেমিপালাতিনস্ক পরীক্ষাক্ষেত্রে শত শত পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছিল, যার ফলে সেই অঞ্চলের লাখো মানুষ তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়েছিলেন। জাদুঘরের পরিচালক দিমিত্রি কালমিকভ গাইডের ভূমিকায় বললেন, “পরমাণুকে শান্তির কাজে ব্যবহার করার কথা ছিল। কিন্তু মানুষ সবসময় পরিণতির কথা না ভেবেই আগে কাজ করে ফেলে।”
‘ভাগ্যবান’ লিকুইডেটর
সাদা দাড়ি আর নীল চোখের ৬২ বছর বয়সী এই মানুষটি কথা বলছিলেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২২। জন্মভূমি ইউক্রেনে রাসায়নিক প্রতিরক্ষা বাহিনীতে সামরিক সেবা দিচ্ছিলেন তখন। চুল্লি নম্বর চারে বিস্ফোরণের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে পাঠানো হয় চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে। তিনি ছিলেন সেই লক্ষাধিক “লিকুইডেটর”-দের একজন — প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নে যাঁদের এই নামে ডাকা হত। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক পারমাণবিক দুর্ঘটনার তেজস্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ করতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেসামরিক ও সামরিক কর্মীদের সেখানে পাঠানো হয়েছিল।
চল্লিশ বছর পরেও কালমিকভের স্মৃতিতে স্পষ্ট সেই প্রথম দিনগুলোর বিশৃঙ্খলা। “শ্বাস নেওয়ার মাস্ক এসেছিল দুই সপ্তাহ পরে। দূষিত এলাকায় অভিযানের সময় তেজস্ক্রিয়তায় থাকার নির্ধারিত সময়সীমাও মানা হয়নি।” তবে নিজেকে তিনি “ভাগ্যবান” বলে মনে করেন। তেজস্ক্রিয়তার বিস্তার মানচিত্রে চিহ্নিত করা আর সামনের দলগুলোর যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার কাজে দুই সপ্তাহ কাটিয়েও তাঁর শরীরে স্থায়ী তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। অভিযান শেষে ১৯৮৯ সালে তিনি এসে বাসস্থান গড়েন কারাগান্দায় — পাঁচ লাখ মানুষের এক খনিশ্রমিকের শহরে।
এই নতুন দেশে এসে তিনি দেখছেন, “চেরনোবিলের স্মৃতি ক্রমেই সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে” — যদিও প্রায় ৩২,০০০ কাজাখ নাগরিককে সেখানে পাঠানো হয়েছিল, এবং সংখ্যাটি আসলে আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। ক্রাকোর ইয়াগিয়েলোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ পাভেউ সেকুউা বলেছেন, “দলিলপত্র ও সাক্ষ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মধ্য এশিয়ার, বিশেষত কাজাখস্তানের লিকুইডেটররা প্রায় সব প্রধান দূষণমুক্তকরণ স্থানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা চুল্লি নম্বর তিনের ছাদ পরিষ্কারের কাজেও অংশ নিয়েছিলেন” — যা ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজগুলোর একটি, কারণ সেই চুল্লিটি বিস্ফোরিত চুল্লির ঠিক পাশেই ছিল এবং তীব্রভাবে তেজস্ক্রিয়।
শুধু কারাগান্দা অঞ্চলেই নাকি কয়েক হাজার চেরনোবিলৎসি ছিলেন — স্থানীয়ভাবে লিকুইডেটরদের এই নামে ডাকা হয়। এর কারণ হল সেই সময়ে এখানে তথাকথিত “রাসায়নিক” ইউনিটগুলো মোতায়েন ছিল: রাসায়নিক ও জৈব হুমকি থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিশেষ দল। তবু প্রতি বছর ২৬ এপ্রিল দুর্যোগের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের কাছে কয়েক মিনিটের আনুষ্ঠানিকতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে স্মরণ অনুষ্ঠান।
“কর্তৃপক্ষ এটা করে নিছক আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে,” বললেন আবিলদা আবদিকারিমভ। ১৮ বছর বয়সে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল প্রিপিয়াতে — বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে কাছের শহর, যেটি ১৯৮৬ সালের ২৭ এপ্রিল খালি করে দেওয়া হয়েছিল। বিস্ফোরণের পরদিনই তাঁকে “ঘটনার কেন্দ্রস্থলে” মোতায়েন করা হয়েছিল তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা মাপতে। তিনি বললেন, “কী করছি, কেন করছি — কেউ বুঝিয়ে দেয়নি।” সেই নীরবতা আজও বিরাজ করছে কাজাখস্তানে, যেখানে বিষয়টি এখনও নিষিদ্ধ আলোচনার মতো।
কমে আসা সহায়তা
সোভিয়েত আমলে চেরনোবিল ও সেমিপালাতিনস্কের আঘাতের পর পারমাণবিক শক্তির প্রশ্নটি আজ আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে, কারণ কাজাখস্তান এখন তার শক্তি সংকট মেটাতে একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করছে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বে বালখাশ হ্রদের তীরে রুশ কোম্পানি রোসাতমের তত্ত্বাবধানে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে, এবং আরও দুটি প্রকল্প বিবেচনাধীন রয়েছে।
প্রবীণ যোদ্ধাদের কাছে মূল প্রশ্নটা স্বীকৃতির — বিশেষত আর্থিক স্বীকৃতির। “রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দিতে চায় না,” বললেন আবদিকারিমভ, যাঁকে ১৯৯২ সালে প্রতিবন্ধী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি এখনও তীব্র মাথাব্যথায় ভোগেন এবং জানালেন, তাঁর ছয় সন্তানের মধ্যে দুজন তেজস্ক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত অসুস্থতায় আক্রান্ত।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং কাজাখস্তানের স্বাধীনতার পর চেরনোবিলৎসিদের জন্য রাষ্ট্রীয় সাহায্য ক্রমশ কমেছে: সোভিয়েত আইনে প্রতিশ্রুত ৫০ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার অধিকার বাতিল হয়ে গেছে, আর আর্থিক ক্ষতিপূরণ এখন মাসে মাত্র ৪০ ইউরোর সমতুল্য। একই সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত বলে স্বীকৃত রোগের তালিকা বছরের পর বছর সংকুচিত হয়েছে, বেশ কিছু সামাজিক সুবিধাও উঠে গেছে।
“চেরনোবিলকে কোনো যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয় না, যেভাবে মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধ বা আফগানিস্তান যুদ্ধকে করা হয়,” বললেন মুখাত সোৎসিয়ালুলি। তিনি নিজেও একজন লিকুইডেটর, ১৯ বছর বয়সে রাশিয়ায় সামরিক সেবা দেওয়ার সময় তাঁকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল।
“আমরা একটি অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছিলাম গোটা ইউরোপকে বাঁচাতে।”
নিজেরাই বানাচ্ছেন পদক
তিনি বা আবদিকারিমভ — কেউই কখনও সরকারি চেরনোবিল প্রবীণ পদক পাননি, যেমন পাননি অনেক সৈনিক ও সংরক্ষিত বাহিনীর সদস্যরা, যাঁদের নথিপত্র প্রশাসনিক জটিলতায় হারিয়ে গেছে। এ বছর সোৎসিয়ালুলি ও একদল প্রবীণ নিজেরাই উদ্যোগ নিয়েছেন: “আমরা নিজেরা পদক বানিয়ে কারাগান্দার সব লিকুইডেটরের মধ্যে বিতরণ করব।” বিস্মৃতির অবিচারের বিপরীতে মুষ্টিমেয় কয়েকটি ব্যাজ — এইটুকুই তাঁদের জবাব।