Home খবর হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারে গুলি, সরিয়ে নেওয়া হল ট্রাম্পকে

হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারে গুলি, সরিয়ে নেওয়া হল ট্রাম্পকে

0 comments 4 views
A+A-
Reset
বাংলাস্ফিয়ার: মুহূর্তটি ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়ার কথা ছিল অন্য কারণে। গত শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি হিসেবে হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক গালা ডিনারে যোগ দিলেন। কিন্তু ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে আয়োজিত সেই সামাজিক-রাজনৈতিক সন্ধ্যা পরিণত হল একটি অপরাধের দৃশ্যে।
অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে নিরাপত্তা ফটকের কাছে, লবির কাছাকাছি একটি উপরতলায়, এক ব্যক্তি গুলি চালিয়ে জোর করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা তাকে কাবু করে গ্রেফতার করেন। ট্রাম্প নিজে সন্দেহভাজন ব্যক্তির একটি ছবি ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেন — গায়ে জামা নেই, হাত পিছমোড়া করে হাতকড়া পরানো, হোটেলের কার্পেটের উপর শুয়ে।
অনুষ্ঠান সবে শুরু হয়েছিল, এমন সময় গুলির শব্দ ভেসে আসতেই এজেন্টরা মুহূর্তের মধ্যে মঞ্চে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং উপস্থিত দর্শকদের সামনে থেকে রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পাশে বসা সকলকে সরিয়ে নেন — স্ত্রী মেলানিয়া, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট।
সিএনএন-এর প্রবীণ সাংবাদিক ঊল্ফ ব্লিটজার সে মুহূর্তে ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে ঠিক গুলি চলার মুহূর্তে একজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট তাঁকে মাটিতে ঠেলে ফেলে দেন বলে তিনি পরে সম্প্রচারে জানান। ব্লিটজার বলেন, তিনি তখন নিরাপত্তা প্রাচীরের ভেতরেই ছিলেন। হামলাকারীকে নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে আহত এক এজেন্ট বুলেটপ্রুফ ভেস্টের কারণে বেঁচে যান, তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি নজরদারি ক্যামেরায় ধরা পড়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি এজেন্টদের মাঝখান দিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন সে একাই কাজ করেছে। ট্রাম্প তাকে “লোন উল্ফ” বলে অভিহিত করেন। শনিবার রাত পর্যন্ত তার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কোনোটিই স্পষ্ট হয়নি।
ডিসট্রিক্ট অব্ কলম্বিয়ার মার্কিন অ্যাটর্নি জিনিন পিরো জানান, হামলাকারীর লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলা ঘটানো। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ক্যালিফোর্নিয়ার ৩১ বছর বয়সী এক যুবক, আগে কোনো ফৌজদারি রেকর্ড নেই। পুলিশ জানিয়েছে, তার কাছে একটি শটগান, একটি হ্যান্ডগান এবং বেশ কয়েকটি ছুরি ছিল। সম্ভবত সে হোটেলেরই একজন অতিথি ছিল যা রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির উপস্থিতিতে আয়োজিত এ ধরনের বড় অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও হোটেল অতিথিদের পটভূমি যাচাই নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। সোমবার তাকে আদালতে হাজির করা হবে, প্রাথমিকভাবে দুটি অভিযোগ — সহিংস অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার এবং বিপজ্জনক অস্ত্র দিয়ে ফেডারেল কর্মকর্তাকে আক্রমণ।
সেই ঘরে তখন আমেরিকান রাষ্ট্রপতির প্রধান উপদেষ্টারা, মন্ত্রিসভার সদস্যরা এবং শত শত সাংবাদিক টাক্সেডো ও সন্ধ্যার পোশাকে একত্রিত হয়েছিলেন। এই মিলনটি ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক, এমনকি অকল্পনীয় বললেও অত্যুক্তি হয় না, কারণ এই প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক বরাবরই তিক্ত। ট্রাম্পের যোগ দেওয়ার কথা জানাজানি হতেই প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে আসন পাওয়ার জন্য ব্যগ্র হয়ে পড়েন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও  এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডাগ বার্গাম এনবিসি’র টেবিলে বসেছিলেন। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ছিলেন নিউ ইয়র্ক পোস্ট-এর সঙ্গে।
ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়ার সময় হলঘরে নেমে আসে প্রথমে অবিশ্বাসের স্তব্ধতা, তারপর আতঙ্কের চিৎকার। কেউ কেউ টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন। নেটওয়ার্ক দুর্বল হলেও সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে ফোন থেকেই সরাসরি সম্প্রচার শুরু করেন।

ট্রাম্পের ভাষ্য

রাত ৯টা ১৭ মিনিটে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, সিক্রেট সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। জানান, তিনি অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর। তারা শীঘ্রই সিদ্ধান্ত জানাবে।”
রাত ৯টা ২৮ মিনিটে প্রেসিডেন্সিয়াল প্রেস পুলের কয়েকজন সাংবাদিককে তাড়াহুড়ো করে কনভয়ের গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে ট্রাম্প ভেন্যু ছাড়েন। মঞ্চে ওঠেন WHCA-র সভাপতি ওয়েইজিয়া জিয়াং, স্পষ্টতই বিচলিত। মাইক্রোফোনে জানালেন, “ডিনার মুলতবি রাখা হচ্ছে, এক মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি ৩০ মিনিটের মধ্যে হোয়াইট হাউসে প্রেস ব্রিফিং করবেন।” ঘরে ছড়িয়ে পড়ল নার্ভাস হাসির ঢেউ। জিয়াং স্পষ্ট করে দিলেন, “এটা মজা করে বলিনি।”
টাক্সেডো পরে হোয়াইট হাউসের প্রেস রুমে হাজির হলেন ট্রাম্প — শান্ত, স্থির, সমান কণ্ঠে কথা বলছেন, মাঝে মাঝে রসিকতাও করছেন। আমেরিকানদের “শান্তিপূর্ণভাবে মতভেদ মেটানোর” আহ্বান জানালেন, বললেন ডিনারের হলঘরে ছিল “অপরিসীম ভালোবাসা”। বললেন, “আমরা কাউকে আমাদের সমাজ দখল করতে দেব না।” জোর দিয়ে জানালেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ডিনার অনুষ্ঠিত হবেই। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল তথা তাঁর সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী টোড ব্লাঞ্চ এবং এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল। দুজনেই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন। ভ্যান্সও নীরব ছিলেন।
ট্রাম্প সন্ধ্যার বিবরণ দিলেন নিজের ভাষায়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সিক্রেট সার্ভিসের প্রশংসা করলেন। গুলির শব্দ সম্পর্কে বললেন, “শুনলাম একটা শব্দ, মনে হল ট্রে পড়ে গেছে।” হামলাকারী সম্পর্কে বললেন, “সে অনেক দূরে ছিল, ভেতরে ঢুকতে পারেনি।” রসিকতার সুরে যোগ করলেন, “কেউ আমাকে বলেনি এই পেশা এত বিপজ্জনক।”

MAGA মহলে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব

“হত্যা প্রচেষ্টার ইতিহাস পড়েছি” বলে দাবি করে আব্রাহাম লিঙ্কনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বললেন, যে রাষ্ট্রপতিদের সবচেয়ে বেশি নিশানা করা হয়েছে, তারাই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন ইতিহাসে। তারপর যোগ করলেন, “বলতে ঘেন্না লাগছে, কিন্তু এটা শুনে সম্মানিত বোধ করছি — কারণ অনেক কিছু করেছি আমি।” হামলাকারী তাকেই লক্ষ্য করেছিল বলে সন্দেহ করলেন ট্রাম্প, যদিও স্বীকার করলেন বন্দুকধারী ছিল অনেক দূরে। বললেন, “এই দেশটাকে আমরা বদলে দিয়েছি, এবং অনেকেই আছে যারা এতে খুশি নয়।”
ট্রাম্প আগেও দুবার হত্যাচেষ্টার মুখে পড়েছিলেন শেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায়। ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই, পেনসিলভানিয়ার বাটলারে এক সমাবেশে,ছাদ থেকে ছোড়া গুলি তাঁর কান ঘেঁষে চলে যায়। ট্রাম্প উঠে দাঁড়িয়ে সমর্থকদের দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে ধরেন, সেই দৃশ্য এখন ইতিহাসের অংশ। কৌতূহলের বিষয়, এই হামলার বাস্তবতা নিয়ে সম্প্রতি MAGA মহলে সংশয়বাদী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয় হামলা হয়েছিল ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে গল্ফ কোর্সের বেড়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রায়ান রাউথ অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে অপেক্ষা করছিল, তবে এজেন্টের নজরে পড়ে যাওয়ায় গ্রেফতার হয়।
১৯৮১ সালের মার্চ মাসে এই একই ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলের সামনে মানসিকভাবে অস্থির এক ব্যক্তির গুলিতে আহত হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান। শনিবার ট্রাম্প বললেন, “এটা বিশেষ নিরাপদ ভবন নয়।” এই সুযোগে তিনি আবারও হোয়াইট হাউসের পূর্ব শাখার জায়গায় নির্মাণাধীন বিশাল বলরুমের প্রকল্পের পক্ষে সওয়াল করলেন। বললেন, “বলরুমটা দরকার। এই কারণেই সিক্রেট সার্ভিস, এই কারণেই সামরিক বাহিনী এটা চাইছে। ১৫০ বছর ধরে নানা কারণে তারা এই বলরুম চেয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে কারণটা একটু আলাদা কারণ আজ আমাদের এমন নিরাপত্তা দরকার যা আগে কখনো দেখা যায়নি।“​​​​​​​​​​​​​​​​

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles