Home খবর দিল্লিতে মোদী, বাংলায় দিদি — একই মুদ্রার দুই পিঠ?

দিল্লিতে মোদী, বাংলায় দিদি — একই মুদ্রার দুই পিঠ?

রাহুল গান্ধীর অভিযোগে কতটুকু সত্য, কতটুকু রাজনীতি

0 comments 7 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিনগুলোয় পশ্চিমবঙ্গ যখন ভোটের আগুনে টগবগ করে ফুটছে, তখন হুগলির শ্রীরামপুরে এক জনসভায় দাঁড়িয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এমন একটি কথা বললেন যা মুহূর্তেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এল। দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী যা করেন, বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক তাই করেন — এটাই ছিল তাঁর বক্তব্যের সারকথা। কথাটি শুনতে সহজ, কিন্তু এর ভেতরে যে রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নগুলো লুকিয়ে আছে, সেগুলো মোটেই সহজ নয়।

রাহুলের অভিযোগটি মূলত দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা। একদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা বিজেপি সরকার, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে পনেরো বছরের তৃণমূল শাসন। দুটি দল, দুটি মতাদর্শ, দুটি আলাদা নেতৃত্বের ধরন — তবু রাহুলের চোখে তারা একই কাজ করেন: ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করেন, বিরোধীকে দমন করেন এবং জনগণকে ভয় দেখিয়ে শাসন করেন।

প্রশ্ন হলো — এই অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?

সিন্ডিকেট রাজ ও ভয়ের রাজনীতি

তৃণমূল-শাসিত বাংলায় কয়লা পাচার ও অবৈধ খনির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাহুল গান্ধী দাবি করেছেন, রাজ্যে প্রতিটি কাজে গুন্ডা ট্যাক্স আদায় হয়। এই অভিযোগ শুধু তাঁর একার নয়। বিজেপির অমিত শাহও পশ্চিমবঙ্গকে “দুর্নীতির গবেষণাগার” বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর সংগঠিত নেটওয়ার্ক বিভিন্ন খাত নিয়ন্ত্রণ করছে, যা অর্থনৈতিক বিকাশকে রুদ্ধ করছে। তবে বিজেপির মুখে এই সমালোচনা বিশেষ মাত্রা পায়, কারণ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে বিরোধী-শাসিত রাজ্যে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধেও বহুদিনের।

রাহুল গান্ধীর অবস্থানে একটি নিজস্ব তাৎপর্য আছে। তিনি সেই কংগ্রেসের নেতা যে দল দিল্লিতে বিজেপিরও বিরোধী, বাংলায় তৃণমূলেরও। তাঁর এই সমান্তরাল সমালোচনা তাই নিছক নির্বাচনী ভাষণ নয়, একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানও বটে। তাঁর আরও অভিযোগ, বাংলায় কংগ্রেস কর্মীদের উপর তৃণমূল ঠিক সেই নিপীড়নই চালায়, যা দেশের অন্যান্য রাজ্যে বিজেপি করে থাকে। ক্ষমতার ভাষা সর্বত্র একই — যে শাসন করে, সে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে থামাতে রাষ্ট্রযন্ত্র বা দলীয় শক্তি ব্যবহার করে।

ইডি-সিবিআইয়ের দুমুখো নীতি

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ইডি বা সিবিআইয়ের কোনো তদন্ত নেই কেন — এই প্রশ্ন রাহুল নিজেই তুলেছেন। মোদী সরকার তাঁকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করেনি? রাহুলের নিজস্ব ব্যাখ্যা হলো, মমতা বিজেপিকে সরাসরি মোকাবিলার বদলে পরোক্ষ পথে চলেন, তাই তিনি কেন্দ্রীয় তদন্ত থেকে সুরক্ষিত। কিন্তু এই যুক্তিতেই একটি বড় ফাঁক আছে — যদি দুজন একই কাজ করেন, তাহলে মোদী কেন মমতাকে ছাড় দেবেন?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতাটা আরও জটিল। বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে একটি কার্যকরী শত্রুতা অবশ্যই বিদ্যমান। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাংলা থেকে তৃণমূল বিজেপিকে কার্যত পর্যুদস্ত করেছিল এবং রাজ্যে বিজেপি নেতাকর্মীদের উপর সহিংসতার অভিযোগও বিস্তর। কিন্তু পাশাপাশি এটাও লক্ষণীয় যে নির্বাচনের পরে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে একটি নীরব সহাবস্থানও দেখা যায়। রাহুলের সন্দেহ সেই জায়গাতেই।

আরজি কর ও শিল্পের মরুভূমি

তুলনামূলক শাসনব্যর্থতার দিক থেকে দেখলে, রাহুলের অভিযোগ সবচেয়ে স্পষ্ট হয় দুটি জায়গায়। প্রথমত, নারী নিরাপত্তা। ২০২৪ সালে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে একজন নারী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা সমগ্র দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তৃণমূল সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতায় গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। রাহুল এই ঘটনার সরাসরি উল্লেখ করে বলেছেন, তৃণমূল আমলে নারীর প্রতি অত্যাচার বেড়েছে। কেন্দ্রে বিজেপির আমলেও মণিপুর থেকে উন্নাও পর্যন্ত নারী নির্যাতনের ঘটনা একই প্রশ্ন তুলেছে।

দ্বিতীয়ত, শিল্প ও কর্মসংস্থান। রাহুল বলেছেন, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর বাংলায় শিল্প ধ্বংস হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে এবং কাজ পেতে হলে তৃণমূলের পরিচিতি লাগে। অমিত শাহও বাংলাকে “শিল্পের শ্মশান” বলে আখ্যা দিয়েছেন, যদিও কেন্দ্রের নীতি সর্বদা রাজ্যের বিনিয়োগ পরিবেশের সহায়ক হয়েছে কিনা সেটি নিজেই বিতর্কিত।

রাহুলের হিসেব কোথায় মেলে, কোথায় মেলে না

নিরপেক্ষ মূল্যায়নে স্বীকার করতে হবে যে রাহুলের তুলনাটি আংশিক সত্য। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধীদের দমন, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব — এগুলো ভারতীয় রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদী ব্যাধি, কোনো একটি দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। বিজেপি কেন্দ্রে যা করে — প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ — তৃণমূলের কিছু আচরণেও একই কর্তৃত্বপরায়ণতার ছায়া দেখা যায়।

তবে তুলনাটি সর্বক্ষেত্রে সমান নয়। কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার মাপকাঠি আলাদা। বিদেশনীতি, প্রতিরক্ষা, মুদ্রানীতি — এগুলো কেন্দ্রের হাতে, রাজ্যের নাগালের বাইরে। তা ছাড়া তৃণমূলের জন্ম হয়েছিল কেন্দ্র ও বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধী আন্দোলন থেকে। সেই দলই যখন শাসনের স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতায় আক্রান্ত হয়, তখন প্রশ্নটা শুধু দলীয় চরিত্রের নয়, ক্ষমতার নিজস্ব রসায়নেরও।

একটি কৌশলগত অভিযোগ

রাহুল গান্ধী বলেছেন, তৃণমূল নয়, একমাত্র কংগ্রেসই বিজেপিকে মতাদর্শগতভাবে পরাজিত করতে পারে। এটিই তাঁর অভিযোগের আসল সারকথা। মোদী ও মমতার মধ্যে মিল খুঁজে বের করার মাধ্যমে তিনি মূলত কংগ্রেসের জন্য একটি রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করতে চাইছেন এমন এক দল হিসেবে যে দুদিক থেকেই আলাদা।

কিন্তু যে ভোটার আজ শ্রীরামপুর বা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মাঠে বসে রাহুলের বক্তব্য শুনছেন, তাঁর কাছে তাত্ত্বিক তুলনার চেয়ে জরুরি হয়তো অন্য প্রশ্নটি — এই তুলনায় তাঁর জন্য কী আছে? রাহুলের অভিযোগ সত্য হলেও বিকল্পটা কোথায়?

ভারতীয় গণতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন দল বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার একই প্রলোভনে আক্রান্ত হয়েছে। রাহুলের অভিযোগ সেই দীর্ঘতর সংকটেরই একটি মুহূর্তচিত্র — যেখানে ক্ষমতার বাইরে থাকলে ক্ষমতার পাপ সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়, আর ক্ষমতায় গেলে সেই দর্পণটাই ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে।

দিল্লিতে যা হয়, বাংলায় তা হয় কিনা — এই প্রশ্নের একটি উত্তর মে মাসের চারে ব্যালট বাক্স দেবে। কিন্তু আরও গভীর প্রশ্নটি থেকেই যাবে: ক্ষমতায় গেলে কি কেউ সত্যিই আলাদা হয়?

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles