তুরস্কের অন্তালিয়ায় একটি কূটনৈতিক ফোরামের ফাঁকে শনিবার ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদেহ জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন দফা মুখোমুখি আলোচনায় বসার জন্য এখনও প্রস্তুত নয় তেহরান। কারণ হিসেবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমেরিকা এখনও তার ম্যাক্সিমালিস্ট অবস্থান ছাড়তে রাজি নয়।” সেইসঙ্গে তিনি ট্রাম্পের একটি দাবি সরাসরি খারিজ করে দেন — আমেরিকায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না বলে জানিয়ে দেন তিনি। “এটা নন-স্টার্টার,” তাঁর সরাসরি ভাষ্য।এই বিবৃতি এল ইসলামাবাদ বৈঠক ভেঙে পড়ার এক সপ্তাহ পরে, এবং সেই বৈঠক ছিল নিজেই একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছিল ইসলামাবাদে, যা টানা ২১ ঘণ্টা চলে এবং শেষ হয় কোনো চুক্তি ছাড়াই।
বৈঠক ভেঙে পড়ার পরেই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী অবরোধের ঘোষণা দেন। আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ইরানীয় বন্দরে যাতায়াতকারী সব দেশের জাহাজের উপরেই এই অবরোধ কার্যকর হবে।
কিন্তু এই অচলাবস্থার মধ্যেও কূটনৈতিক চেষ্টা থেমে নেই। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সরাসরি তেহরান গিয়ে ইরানি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে তারা একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী এবং দ্বিতীয় দফা আলোচনার জায়গা হবে সম্ভবত পাকিস্তান।
দুই পক্ষের দাবি আর যেখানে আসল আটকানো
মতবিরোধের কেন্দ্রে আছে পারমাণবিক প্রশ্ন। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের “রেড লাইন” হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা, প্রধান সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা ভেঙে ফেলা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়া। এর বাইরে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিতে অর্থায়ন বন্ধ এবং হরমুজে বিনা টোলে জাহাজ চলাচলের দাবিও রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গাব্বার্ড গত বছর কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না বলেই আমেরিকার মূল্যায়ন। তবুও ওয়াশিংটন দাবি করছে তেহরানকে অস্ত্র বানানোর “সরঞ্জাম” থেকেও দূরে থাকতে হবে। এই দাবির যৌক্তিক পরিণতি হলো ইরানের পুরো পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান, যা তেহরানের কাছে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের বিশ্লেষক কামরান বোখারি বলছেন, পারমাণবিক দাবিগুলি এমনভাবে রাখা হয়েছে যে ইরানি পক্ষ মুখ বাঁচিয়ে চুক্তি করার কোনো পথ পাচ্ছে না। “ইরানিরা দেখাতে পারবে না যে তারা আত্মসমর্পণ করেছে — দেশে ও বিদেশে শাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।”
হরমুজ প্রণালীর বিষয়টি আলাদাভাবে জটিল। ট্রাম্প প্রণালীর যৌথ আমেরিকান-ইরানি ব্যবস্থাপনার ধারণা ভাসিয়েছিলেন, কিন্তু তেহরান তা তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ করে বলে যে প্রণালীটি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সীমার মধ্যে এবং এটি পরিচালনার অধিকার শুধু ওই দুটি দেশের।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২২ এপ্রিল। এই সংকীর্ণ সময়সীমার মধ্যেই দ্বিতীয় দফা আলোচনার রাস্তা খোলার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। কিন্তু সমস্যা হলো লেবানন। ইরান বলছে যুদ্ধবিরতি লেবাননেও প্রযোজ্য হতে হবে, কিন্তু ইজরায়েল এবং পরে আমেরিকা সেই দাবি নাকচ করেছে। ইজরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এই পরিস্থিতি যুদ্ধবিরতিকে প্রতিনিয়ত নাজুক করে তুলছে।
আরাগচি বলেছেন দুই পক্ষ একটি সমঝোতার “একেবারে কাছাকাছি” পৌঁছেছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে “ম্যাক্সিমালিজম, গোলপোস্ট সরানো এবং অবরোধ” তা নষ্ট করে দেয়। ভ্যান্স বলেছেন এটি ছিল আমেরিকার “চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব” এবং এখন দেখার বিষয় ইরান তা মানে কিনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দুই পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল। হরমুজ অবরুদ্ধ থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সংকট আমেরিকার অর্থনীতিতেও চাপ ফেলে। ইরানের দিক থেকে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ ও অবরোধ মানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। ট্রাম্প নিজেও বলেছিলেন, “দুই দিনের মধ্যে কিছু একটা হতে পারে।”
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে কোনো চুক্তি মানবে না এবং নিজেদের আইএইএ ও এনপিটি-সদস্যের অধিকারগুলি ছাড়বে না। আর আমেরিকা যতক্ষণ পারমাণবিক প্রশ্নে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবিতে অনড় থাকবে, ততক্ষণ ইরানের পক্ষে সই করার মতো রাজনৈতিক জায়গা নেই। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি বলছেন, “নতুন যুদ্ধের মূল্য দুই পক্ষের জন্যই অসহনীয়। কিন্তু ওয়াশিংটন ও তেহরানের রাজনৈতিক গতিবিদ্যা এবং ম্যাক্সিমালিস্ট অবস্থানের প্রতি ঝোঁক সহজেই পরিস্থিতিকে আবার সংঘাতের দিকে টেনে নিতে পারে।”