Table of Contents
ভোটের হিসাব
বিশেষ অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে পড়ে ২৯৮টি ভোট, বিপক্ষে ২৩০টি। মোট ৫২৮ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন। সাংবিধানিক সংশোধনীর জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অর্থাৎ ৩৫২টি ভোট প্রয়োজন ছিল। সরকার পড়ল ৫৪ ভোট কম।
বিলে কী ছিল
মোদি সরকার তিনটি বিলকে একটি প্যাকেজ হিসেবে সংসদে পেশ করে — ১৩১তম সংশোধনী বিল, ডিলিমিটেশন বিল ২০২৬ এবং ইউনিয়ন টেরিটরিজ ল’স (সংশোধনী) বিল ২০২৬।
১৩১তম সংশোধনী বিলের মূল প্রস্তাব ছিল লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০-এ উন্নীত করা এবং ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে নতুন সীমানা নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন করা। এই পরিবর্তনে উত্তরের রাজ্যগুলো লাভবান হলেও দক্ষিণের রাজ্যগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হত। তামিলনাড়ুর আসন ৩৯ থেকে কমে ৩২, কেরলের ২০ থেকে কমে ১৫ হতে পারত। বিপরীতে উত্তরপ্রদেশের আসন ৮০ থেকে বেড়ে ৮৯, বিহারের ৪০ থেকে ৪৬ এবং রাজস্থানের ২৫ থেকে ৩০ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
বিরোধিতার কারণ
বিরোধীরা মহিলা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে ছিল না। তারা ২০১১ সালের জনগণনাভিত্তিক ডিলিমিটেশনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। সরকার এই দুটি বিষয়কে একটি অবিচ্ছেদ্য প্যাকেজ হিসেবে উপস্থাপন করে বিরোধীদের কঠিন অবস্থানে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু বিরোধী জোট সেই ফাঁদ এড়াতে সক্ষম হয়েছে।
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিন এই সংশোধনী প্রস্তাবকে তামিলনাড়ু ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে “ব্যাপক ঐতিহাসিক অবিচার” বলে অভিহিত করেন এবং সালেমে মিত্র দলগুলোকে নিয়ে মিছিলে নেতৃত্ব দেন। রাহুল গান্ধী বলেন, মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করতে হলে তা করতে হবে ওবিসি জনগণনা এবং ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে, ২০১১ সালের পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে নয়। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খার্গে আগেই ঘোষণা করেছিলেন, আইএনডিআইএ জোটের সাংসদরা এই বিল পরাজিত করবেন।
পটভূমি
২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর লোকসভায় নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম পেশ করা হয়। পরদিন লোকসভায় ৪৫৪ ভোটে এবং ২১ সেপ্টেম্বর রাজ্যসভায় ২১৪ ভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ বিলে স্বাক্ষর করেন। এই আইন লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। তবে শর্ত ছিল, জনগণনার পর ডিলিমিটেশন সম্পন্ন হলেই সংরক্ষণ কার্যকর হবে। ফলে আইনটি কার্যত স্থগিত ছিল।
মহিলা সংরক্ষণের এই লড়াই অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৬, ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালেও এই প্রশ্নে সংসদে আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে প্রতিবারই তা এগোয়নি। তিন দশক পরেও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল।
ভোটের মাত্র একদিন আগে, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, কেন্দ্রীয় সরকার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই আইন চালু করে। পদক্ষেপটি স্পষ্টতই কৌশলগত ছিল — মহিলা সংরক্ষণের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন এবং ১৩১তম সংশোধনীর পক্ষে জনমত তৈরির প্রয়াস।
সাংবিধানিক প্রশ্ন
বিরোধীরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক আপত্তি তোলে। ১৩১তম সংশোধনী বিল পাস হলে সংসদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ডিলিমিটেশনের সময় ও কোন জনগণনার তথ্য ব্যবহার হবে তা নির্ধারণ করতে পারত। এছাড়া লোকসভার আসন ৫০ শতাংশ বাড়লে লোকসভা ও রাজ্যসভার অনুপাত ২.২:১ থেকে ৩.৩:১-এ পৌঁছাত, যা যৌথ অধিবেশনে লোকসভার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিত। বিরোধীরা এটিকে ফেডারেল কাঠামো ও সংসদীয় ভারসাম্যের উপর আঘাত বলে দেখেছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
পরাজয়ের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘণ্টারও বেশি বক্তৃতায় বিরোধীদের মহিলা সংরক্ষণের বিরোধী বলে সমালোচনা করেন এবং বলেন দেশের মহিলারা তাদের ক্ষমা করবেন না। তবে তিনি উল্লেখ করেননি যে ২০২৩ সালের মহিলা সংরক্ষণ আইনটি স্বয়ং বিরোধী দলগুলোর সম্মতিতেই সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছিল।
মহিলা সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ
১৩১তম সংশোধনীর পরাজয়ের পর এখন ডিলিমিটেশন হবে ২০২৬ সালের জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতে। সরকারি সূত্র বলছে, এতে দক্ষিণের রাজ্যগুলো আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ ২০২৬ সালের জনগণনায় দক্ষিণের রাজ্যগুলোর জনসংখ্যা ২০১১-এর তুলনায় আরও কমেছে।
নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম অনুযায়ী, মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর হবে আইনটির পরে প্রথম জনগণনার ভিত্তিতে। সেই জনগণনা এখন ২০২৬-২৭ সালে হওয়ার পথে। অর্থাৎ মহিলা সংরক্ষণের বাস্তব রূপায়ণ আরও কয়েক বছর পিছিয়ে গেল।
বর্তমান লোকসভায় মহিলা সাংসদের হার মোট সদস্যের ১৫ শতাংশেরও কম। ১৯৪৬ সালের গণপরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে সরোজিনী নাইডু ছিলেন একমাত্র নারী। সেই থেকে দীর্ঘ লড়াইয়ের পরেও সংখ্যাটি আজও হতাশাজনক।
বিশ্লেষণ
এই পরাজয় শুধু একটি বিলের ব্যর্থতা নয়। এটি স্পষ্ট করে দিল, লিঙ্গ সমতার রাজনীতি, আঞ্চলিক স্বার্থের টানাপোড়েন, জনগণনা ও ডিলিমিটেশনের ক্ষমতার হিসাব এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের জটিল সমীকরণ একসাথে মিলিত হলে একটি সর্বসম্মত প্রয়োজনীয় সংস্কারও আটকে যেতে পারে।