বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই ঘোষণা স্বস্তির চেয়ে প্রশ্নই তুলছে বেশি — মার্কিন নৌ-অবরোধ এখনও বহাল, পারমাণবিক সংকটের কোনো সমাধান নেই, এবং দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসের দেওয়াল যেন আরও উঁচু হয়েছে।

ট্রাম্পের ঘোষণা, তবে শর্ত বহাল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৭ এপ্রিল তাঁর সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজের মুক্ত চলাচলের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিসহ সামগ্রিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে।

এই ঘোষণার পেছনে রয়েছে কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ভেঙে পড়া কূটনৈতিক আলোচনা এবং পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সক্রিয় মধ্যস্থতার দীর্ঘ ইতিহাস।

যুদ্ধের শুরু যেভাবে

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানে বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হন। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী সামরিকায়ন করে কার্যত বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান এই সংকটকে “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ” বলে অভিহিত করেন। যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ থেকে ১৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৮০-৮২ ডলারে পৌঁছায়।

ইরান কাতারের রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্সেও হামলা চালায়। তাতে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমে যায় এবং এশিয়ায় এলএনজি মূল্য ১৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়।

আলোচনা, প্রত্যাখ্যান, অবরোধ

মার্চে পাকিস্তান মার্কিন একটি ১৫-দফা প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দেয়। সেই প্রস্তাবে ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সমাপ্তি, ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার শর্ত। ইরান এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা ৫-দফা দাবি পেশ করে — মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালীর উপর ইরানের সার্বভৌমত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়। ট্রাম্প তখন বলেন, “আমরা ইরানের বিরুদ্ধে হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছি, শর্ত হলো ইরানকে অবিলম্বে ও সম্পূর্ণরূপে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে।”

ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনা ২১ ঘণ্টা ধরে চলে, কিন্তু কোনো ফল মেলেনি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, “ইরান আমাদের শর্ত মানতে রাজি হয়নি। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আমাদের কাছে অপরিহার্য ছিল।” ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি দাবি করেন, দুই পক্ষ চুক্তির “ইঞ্চিখানেক” কাছে এসেছিলেন, কিন্তু মার্কিন পক্ষ হঠাৎ অবস্থান বদলে নৌ-অবরোধ আরোপ করে।

লেবানন যোগ করল নতুন জটিলতা

আলোচনার অচলাবস্থার মধ্যেই লেবাননে নতুন মাত্রা যোগ হয়। ইজরায়েলের লেবানন অভিযানে মার্চের শুরু থেকে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন। ইরান জোর দিয়ে বলে আসছিল, যেকোনো যুদ্ধবিরতিতে লেবাননে সংঘাতের অবসানও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। ইজরায়েল ও আমেরিকা প্রথমে এই দাবি নাকচ করলেও অবশেষে ১৬ এপ্রিল ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি পৃথক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপরই ইরান হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করে।

বাজারে স্বস্তি, তবে সতর্কতাও

প্রণালী খোলার ঘোষণায় বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম একদিনেই ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ দশমিক ৮৫ ডলারে নামে। এস অ্যান্ড পি ৫০০ ও নাসডাক উভয়ই রেকর্ড উচ্চতায় বন্ধ হয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রণালী খুলে দেওয়াই সংকটের সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেলি রাজ্জুক বলেন, “সপ্তাহব্যাপী বন্দর ও শিপিং রুট বন্ধ থাকার কারণে যে জট তৈরি হয়েছে, তা সারতে সপ্তাহ, এমনকি মাসও লাগতে পারে।”

ভঙ্গুর শান্তি, গভীর অবিশ্বাস

বর্তমান পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের কালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ১৮ এপ্রিল ইউরোপীয় দেশগুলোকে দ্রুত ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান, কারণ ইরান বিদ্যমান চুক্তি লঙ্ঘন করছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।

দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রকট। ইরান যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ, বিদেশে জব্দ সম্পদ মুক্তি এবং পারমাণবিক কর্মসূচিতে নিজেদের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার দাবিতে অটল। মার্কিন পক্ষের মূল শর্ত একটাই — ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ চিরতরে রুদ্ধ করা।

মানবিক মূল্য এবং আন্তর্জাতিক তৎপরতা

এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন পর্যন্ত চার হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। তুরস্ক, পাকিস্তান, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশ শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। প্যারিসে একটি বহুজাতিক সম্মেলনে বিশ্বনেতারা হরমুজ প্রণালী পুনরুদ্ধারের বিষয়ে আলোচনা করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কির স্টারমার প্রণালী উন্মুক্ত হওয়ার ঘোষণাকে স্বাগত জানান।

সামনে কী?

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সাময়িক বিরতি। পারমাণবিক অস্ত্র এবং লেবাননে ইজরায়েলি অভিযান নিয়ে যে গভীর মতভেদ রয়েছে, তার সমাধান না হলে এই ভঙ্গুর শান্তি বেশিদিন টিকবে না। ২২ এপ্রিলের আগেই দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বৈঠকই নির্ধারণ করবে, হরমুজ প্রণালীর খোলা দরজা আদৌ স্থায়ী শান্তির পথ খুলতে পারবে কি না।