Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: বাংলার বিধানসভা ভোটের মাত্র কয়েক দিন আগে ঐতিহাসিক রায়ে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিল — ভোটার তালিকা একবার ‘ফ্রিজ’ হয়ে গেলেই সব শেষ নয়। ট্রাইবুনাল অনুমোদন দিলে ভোটের দু’দিন আগ পর্যন্তও তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার এখন ট্রাইবুনালের গতির উপর নির্ভরশীল।
পটভূমি
বিষয়টির শুরু নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ভোটার তালিকা যাচাইবাছাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় রাজ্যে কোটি কোটি ভোটারের নাম খতিয়ে দেখা হয়। মোট বিবেচনাধীন ছিলেন ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটার। তাঁদের মধ্যে বাদ পড়েন ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জন। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রথম চূড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়েছিলেন আরও ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন। সব মিলিয়ে তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ৯০ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে।
এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে সওয়াল করতে উপস্থিত হন।
কী বলল সুপ্রিম কোর্ট
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে শুনানি চলছিল। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী ভোটার তালিকা ফ্রিজ হয়ে যাওয়ায় ট্রাইবুনালে বিচারের পর কারও নাম অনুমোদিত হলেও আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। বৃহস্পতিবারের ঐতিহাসিক রায়ে সেই সমস্যার সমাধান করল শীর্ষ আদালত।
সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আদালত এই নির্দেশ দিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি দেবাশিস করগুপ্তের মতে, ১৪২তম অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টকে এমন ক্ষমতা দেয়, যার আওতায় আদালতের দেওয়া যেকোনো ব্যাখ্যা বা নির্দেশ সব আদালতের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিছু কিছু পরিস্থিতিতে প্রচলিত আইনের সীমার বাইরে গিয়েও নির্দেশ দেওয়ার অধিকার এই অনুচ্ছেদেই নিহিত।
ঠিক কোন তারিখ পর্যন্ত সুযোগ
পশ্চিমবঙ্গে আগামী ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার নির্বাচন এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার নির্বাচন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভোটের দু’দিন আগে অর্থাৎ যথাক্রমে ২১ ও ২৭ এপ্রিলের মধ্যে ট্রাইবুনালে আবেদন নিষ্পত্তি হলে সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্টারি রিভাইজড ইলেকটোরাল রোল প্রকাশ করার কথাও বলা হয়েছে অর্থাৎ শুধুমাত্র ট্রাইবুনাল-অনুমোদিত ভোটারদের নাম নিয়ে একটি অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হবে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, কেবল আবেদন করলেই চলবে না, ট্রাইবুনালে আবেদন নিষ্পত্তি হয়ে অনুমোদন পেতে হবে। যাঁদের আবেদন ট্রাইবুনাল খারিজ করে দেবে, তাঁরা এই সুযোগ পাবেন না।
কত জনের ভোটের সুযোগ মিলতে পারে
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এসআইআর প্রক্রিয়ায় রাজ্যে ৬০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম বিবেচনাধীন ছিল, যার মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আদালতের নির্দেশে তাঁরা এখন ট্রাইবুনালে আবেদন জানাতে পারছেন। এই আবেদন অনলাইনে ইসিআইনেট অ্যাপ বা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে করা যাচ্ছে। পাশাপাশি জেলা ও মহকুমা প্রশাসনিক দফতরেও সশরীরে আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটা হল, এই বিপুল সংখ্যক আবেদনের নিষ্পত্তি কত দিনে সম্ভব? ২১ এপ্রিলের আগে হাতে আছে মাত্র কয়েকটি দিন। ১৬টি ট্রাইবুনালের কার্যক্রম সোমবার থেকে শুরু হলেও তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটার এবং তাঁদের আইনজীবীরা এখনও বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন। শুনানির জন্য তাঁদের কীভাবে তলব করা হবে এবং ট্রাইবুনালের রায় বা নির্দেশ তাঁরা কোথায় দেখতে পাবেন — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
ফলে ২৭ লক্ষের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ভোটে অংশ নিতে পারবেন কেবল সেই অংশটুকু, যাঁদের আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শুনানি পাবে এবং ট্রাইবুনাল যাঁদের অনুমোদন দেবে। সংখ্যাটা কয়েক লক্ষ হতে পারে, তবে ঠিক কত — তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ট্রাইবুনালের কার্যগতির উপর।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
রায়কে কেন্দ্র করে শাসক শিবিরে উৎসাহের হাওয়া বইছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “আজ আমার থেকে খুশি আর কেউ নন।” তবে তাঁর এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছে বাম শিবির। প্রবীণ আইনজীবী ও সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য দাবি করেন, এই আইনি লড়াইয়ের প্রকৃত কৃতিত্ব মুর্শিদাবাদের এক সাধারণ মহিলা মোস্তারি বানুর।
সারকথা
সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশ নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। নির্বাচন কমিশনের ‘ফ্রিজড’ তালিকাকে সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতায় চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনে ২৭ লক্ষের মধ্যে কতজনের আবেদন নিষ্পত্তি হবে — সেটাই এখন আসল পরীক্ষা। ট্রাইবুনালের ঘরে ঘরে এই মুহূর্তে ঝুলছে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য।