বাংলাস্ফিয়ার: সংসদে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা চলছে। প্রস্তাবটি হলো—লোকসভার সদস্যসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা ৫৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করা। তবে সরকার জানিয়েছে, এই ৮৫০ কেবল একটি সর্বোচ্চ সীমা; বাস্তবে সদস্যসংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করার পরিকল্পনাই রয়েছে। এই পরিবর্তন কার্যকর করতে হলে লোকসভা ও রাজ্যসভা—উভয় কক্ষেই উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।

এই প্রস্তাব কার্যকর হলে ভারতের লোকসভা বিশ্বের বৃহত্তম সরাসরি নির্বাচিত আইনসভায় পরিণত হবে। যদিও চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে প্রায় ৩,০০০ প্রতিনিধি রয়েছেন, সেটি সরাসরি নির্বাচিত নয় বরং পরোক্ষভাবে গঠিত।

সংসদে বিতর্ক: সরকার বনাম বিরোধী শিবির

বিলটি নিয়ে লোকসভায় প্রথম দিনের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল বিরোধীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল—এই পরিবর্তনে কোনো রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব কমবে না। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতি হবে না বলেই দাবি করেন অমিত শাহ।

তিনি একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন—বর্তমানে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর ১২৯ জন সাংসদ রয়েছে, যা মোট ৫৪৩ আসনের প্রায় ২৩.৭৬%। নতুন ব্যবস্থায় এই সংখ্যা বেড়ে ১৯৫ হবে, যা মোট ৮১৬ আসনের প্রায় ২৩.৯৭%—অর্থাৎ অনুপাত প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী মোদীও একই সুরে বলেন, অতীতে যে অনুপাত মেনে আসন বণ্টন হয়েছে, সেটিতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। তিনি এমনকি “গ্যারান্টি” বা “প্রমিস”—যে শব্দই দরকার, তা ব্যবহার করতেও প্রস্তুত বলে জানান।

আইনমন্ত্রী মেঘওয়াল প্রস্তাবটিকে “সহজ একটি সূত্র” বলে বর্ণনা করে বলেন, সব রাজ্যের আসনই প্রায় ৫০% করে বাড়বে এবং মোট আসন হবে ৮১৫ বা ৮১৬। এর মধ্যে ২৭২টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

বিরোধীদের আপত্তি: আশ্বাস বনাম আইনের ভাষা

তবে বিরোধী দল এই আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়। তাঁদের প্রধান অভিযোগ—এই “অনুপাত বজায় রাখার” কথা বিলের কোথাও লেখা নেই, সবটাই মৌখিক প্রতিশ্রুতি।

কংগ্রেস নেতা প্রিয়াংকা গান্ধী বঢরা বলেন, জাতিগত জনগণনা (caste census) ছাড়া প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, সরকার ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ (delimitation) করতে চাইছে, কারণ তাদের কাছে ওবিসি জনসংখ্যার নির্ভুল তথ্য নেই।

আরও একটি বড় প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা—যখন বর্তমান লোকসভাতেই মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ কার্যকর করা সম্ভব, তখন নতুন আসন বাড়ানোর সঙ্গে সেটিকে কেন যুক্ত করা হচ্ছে?

বিলের প্রকৃতি: কীভাবে পাস হবে?

এই সংবিধান সংশোধনী বিল (১৩১তম সংশোধনী) পাস করতে হলে দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। তবে সংশ্লিষ্ট ডিলিমিটেশন বিল ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সংক্রান্ত বিল পাস করতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বিলগুলোর কোথাও রাজ্যভিত্তিক আসনের অনুপাত স্থির রাখার কোনো স্পষ্ট উল্লেখ নেই। এখানেই বিরোধীদের আশঙ্কা।

রাজনৈতিক সমীকরণ

লোকসভায় এই বিল ঠেকানোর মতো সংখ্যা বিরোধীদের থাকলেও, চূড়ান্ত ফল অনেকটাই নির্ভর করছে কংগ্রেস-বহির্ভূত বড় দলগুলির ওপর—যেমন সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং ডিএমকে।

বৃহস্পতিবার বিলটি ২৫১-১৮৫ ভোটে উত্থাপিত হয় এবং রাত ১১টা পর্যন্ত আলোচনা চলে। শুক্রবার বিকেল ৪টায় ভোটাভুটি হওয়ার কথা।

অমিত শাহের পরিসংখ্যান: দক্ষিণের রাজ্যগুলোর উদাহরণ

অমিত শাহ বিভিন্ন রাজ্যের উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন—

  • কর্ণাটক: ২৮ → ৪২ (৫.১৫% → ৫.৪৪%)
  • অন্ধ্রপ্রদেশ: ২৫ → ৩৮ (৪.৬০% → ৪.৬৫%)
  • তেলেঙ্গানা: ১৭ → ২৬ (৩.১৩% → ৩.১৮%)
  • তামিলনাড়ু: ৪৯ → ৫৯ (৭.১৮% → ৭.২৩%)
  • কেরল: ২০ → ৩০ (৩.৬৮% → ৩.৬৭%)

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “তামিলনাড়ুর মানুষের প্রতিনিধিত্ব কমবে না, বরং বাড়বে।”

আরও বিতর্ক: জনগণনা ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ

অমিত শাহ দাবি করেন, সরকার ইতিমধ্যেই জাতিগত জনগণনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বর্তমান জনগণনাতেই সেই প্রক্রিয়া চলছে। ডিলিমিটেশন কমিশনের কাজও পুরনো আইনের ভিত্তিতেই হবে—নতুন কিছু নয়।

কিন্তু বিরোধীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের আশঙ্কা—২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করলে দক্ষিণের রাজ্যগুলো তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম।

‘নারী শক্তি বন্দন’ আইন নিয়ে বিভ্রান্তি

কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ একটি নতুন বিতর্ক উত্থাপন করেন। তিনি জানান, ২০২৩ সালে সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়া ‘নারী শক্তি বন্দন’ আইন ১৬ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে। অথচ সেই আইনেই আবার সংশোধনী আনা হচ্ছে—যা পরিস্থিতিকে “অদ্ভুত” করে তুলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সারসংক্ষেপ

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল ও বহুস্তরীয়। সরকার বলছে এটি একটি ন্যায়সঙ্গত ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্প্রসারণ। বিরোধীরা বলছে আইনের ভাষায় স্পষ্ট গ্যারান্টি ছাড়া এই আশ্বাস বিশ্বাসযোগ্য নয়।