বাংলাস্ফিয়ার: সংসদে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবটি হলো—লোকসভার সদস্যসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা ৫৫০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করা। তবে সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ৮৫০ হলো সর্বোচ্চ সীমা; বাস্তবে সদস্যসংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করার পরিকল্পনাই রয়েছে। এই পরিবর্তন কার্যকর করতে হলে লোকসভা ও রাজ্যসভা, উভয় কক্ষেই উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
যদি এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভারতের লোকসভা হয়ে উঠবে বিশ্বের বৃহত্তম সরাসরি নির্বাচিত আইনসভা। যদিও চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে প্রায় ৩,০০০ প্রতিনিধি রয়েছেন, সেটি সরাসরি নির্বাচিত নয় বরং পরোক্ষভাবে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান।
লোকসভার বর্তমান কার্যপ্রণালীর দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, সদস্যসংখ্যা বাড়লে কী ধরনের পরিবর্তন বা সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে সংসদ। এই বিশ্লেষণকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়—এক, দৈনন্দিন কার্যক্রম; দুই, কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলি।
লোকসভার কাজের অন্যতম দৃশ্যমান অংশ হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব বা ‘কোয়েশ্চন আওয়ার’। এটি অধিবেশনের প্রথম ঘণ্টা, যেখানে সাংসদরা সরকারের কাজকর্ম নিয়ে মন্ত্রীদের কাছে মৌখিক ও লিখিত প্রশ্ন তোলেন। এর উদ্দেশ্য হলো জনগণের পক্ষ থেকে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ২০২৫ সালের বর্ষাকালীন অধিবেশনে সাংসদরা প্রায় ৩০,০০০ প্রশ্ন জমা দিয়েছিলেন। এরপর লোকসভার সচিবালয় সেই প্রশ্নগুলো যাচাই করে দেখে সেগুলি বিধি মেনে হয়েছে কি না। তারপর একটি লটারির মাধ্যমে ৪০০টি মৌখিক ও ৪,৮০০টি লিখিত প্রশ্ন বাছাই করে বিভিন্ন মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়। প্রতিদিন মন্ত্রীরা প্রায় ২০টি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন যেগুলো আমরা টেলিভিশনে প্রাণবন্ত বিতর্ক হিসেবে দেখি এবং আরও প্রায় ২৩০টি প্রশ্নের লিখিত উত্তর দেন।
এরপর আসে ‘জিরো আওয়ার’, যেখানে সাংসদরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকার সমস্যাগুলি জাতীয় মঞ্চে তুলে ধরেন। চলতি বাজেট অধিবেশনে গড়ে প্রায় ১৪০ জন সাংসদ তাঁদের এলাকার সমস্যা উত্থাপনের জন্য নোটিস দিয়েছেন। এখানেও লটারির মাধ্যমে মাত্র ২০ জন সাংসদকে সুযোগ দেওয়া হয়, যারা তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাঁদের বক্তব্য পেশ করেন।
এরপর শুরু হয় সরকারি বিল ও বাজেট প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা। স্পিকারের নেতৃত্বে একটি বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটি—যেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা থাকেন—প্রতিটি বিতর্কের জন্য সময় নির্ধারণ করে। সেই সময় দলগুলির শক্তি অনুযায়ী ভাগ করা হয়, এবং দলগুলি নিজেদের সদস্যদের মধ্যে সেই সময় বণ্টন করে। প্রতি শুক্রবার সাংসদরা আড়াই ঘণ্টা সময় পান নিজেদের প্রস্তাবিত বিল নিয়ে আলোচনা করার জন্য, যদিও সেগুলোর অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত আইন হিসেবে পাস হয় না।
লোকসভার স্পিকার ও বহু সাংসদই বারবার বলেছেন, সংসদের দায়িত্বের তুলনায় অধিবেশনের সময় অত্যন্ত কম। গত এক দশকে লোকসভা বছরে গড়ে মাত্র ৫৫ থেকে ৭০ দিন বসেছে। ফলে সকল সদস্যের মতামত জানানোর মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে না। সময় বেঁধে দেওয়া বিতর্ক ও লটারির মতো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেই কোনোভাবে বর্তমান ব্যবস্থা টিকে আছে।
এখন কল্পনা করুন, যদি লোকসভায় সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৮১৬ বা ৮৫০ হয়। অথচ কার্যপ্রণালিতে মৌলিক পরিবর্তন না আনা হয়, তাহলে সংসদের কার্যকারিতা আরও কমে যেতে পারে। সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আইন পরীক্ষা করা, বাজেট বিশ্লেষণ করা—এসব কাজই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এমনকি অনেক সাংসদ তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়াদেও কার্যকরভাবে কথা বলার সুযোগ নাও পেতে পারেন।
এই প্রসঙ্গে ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সের উদাহরণ প্রাসঙ্গিক। সেখানে ৬৫০ জন সাংসদ থাকলেও কাজের পদ্ধতি ভিন্ন। সংসদের সময় দুটি কক্ষে ভাগ করা হয়—একটি প্রধান কক্ষ, যেখানে প্রশ্নোত্তর পর্ব ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হয়; আরেকটি কক্ষে অন্যান্য সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলে। ব্রিটিশ সাংসদরা সরকারের কাছে অসীম সংখ্যক লিখিত প্রশ্ন করতে পারেন। প্রতি সপ্তাহে একদিন প্রধানমন্ত্রীকে এক ঘণ্টা ধরে প্রশ্ন করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ব্রিটিশ সংসদ বছরে প্রায় ১৫০ দিন বসে। এর মধ্যে ২০ দিন বিরোধীদের জন্য বরাদ্দ থাকে, যেখানে তারা আলোচনার বিষয় নির্ধারণ করে। এছাড়া শক্তিশালী কমিটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা আইন প্রণয়নের আগে বিলগুলো গভীরভাবে পরীক্ষা করে।
তবে ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থার কিছু অন্তর্নিহিত প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাও রয়েছে। আমাদের সাংসদরা অনেক সময় আধা-নির্বাহী (quasi-executive) দায়িত্বও পালন করেন। যেমন—তাঁদের বিভিন্ন বোর্ড, পরামর্শদাতা পরিষদ, প্রযুক্তিগত সংস্থা, কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় বা এইমস-এর মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকার ‘অফিস অব প্রফিট’ আইনে পরিবর্তন এনে এমন বহু পদ যুক্ত করেছে, যেগুলি সাংসদরা রাখতে পারেন বিনা অযোগ্যতায়।
এছাড়া রয়েছে ‘এমপি লোকাল এরিয়া ডেভেলপমেন্ট স্কিম’, যেখানে সাংসদরা সরাসরি তাঁদের এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের সুপারিশ করেন। এসব ব্যবস্থা সাংসদদের এমন কাজের মধ্যে জড়িয়ে ফেলে, যা আসলে সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত। এর ফলে তাঁরা আইনপ্রণেতা হিসেবে তাঁদের মূল দায়িত্ব থেকে সরে যান।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো দলত্যাগ বিরোধী আইন। এই আইনের ফলে সাংসদরা সংসদে নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন না; তাঁদের দলের নির্দেশ অনুযায়ীই ভোট দিতে হয়। বিচারপতির অপসারণ হোক বা সংবিধান সংশোধন—সব ক্ষেত্রেই দলের হুইপ মানতে হয়, না হলে সাংসদপদ হারানোর ঝুঁকি থাকে। ফলে সাংসদের সংখ্যা ৫৫০ হোক বা ৮৫০—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রায়শই দলীয় নেতৃত্বই নেয়।
বিশ্বের অনেক দেশেই সাংসদদের নির্বাহী দায়িত্ব দেওয়া হয় না এবং বাধ্যতামূলক হুইপও নেই। এই দুটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা যদি সমাধান না করা হয়, তাহলে বড় লোকসভায় বর্তমান সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শুধু সদস্যসংখ্যা বাড়ালেই সংসদ আরও কার্যকর হবে—এমন ধারণা ভুল। সংসদকে সত্যিকারের জনমুখী ও কার্যকর করতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। না হলে বড় লোকসভা মানেই ভালো লোকসভা—এমন নিশ্চয়তা নেই।