Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: চেন্নাইয়ের পানাইয়ুর এলাকায় একটি ছোট দলীয় কার্যালয়। ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সকালে সেখানে জমায়েত হয়েছিলেন কয়েকশো কর্মী। কিন্তু সেদিন কার্যত গোটা তামিলনাড়ু থেমে গিয়েছিল একটি ঘোষণার অপেক্ষায়। তিন দশক ধরে কোটি কোটি তামিল দর্শকের হৃদয় দখল করে রাখা জোসেফ বিজয় — যাঁকে ভক্তরা ডাকেন “থালাপতি”, অর্থাৎ সেনাপতি — সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন তাঁর রাজনৈতিক দল “তামিলাগা ভেট্রি কাঝাগম”, সংক্ষেপে টিভিকে। লক্ষ্য: ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন।
ঠিক দুই বছর পরে, ২০২৬ সালের ৪ঠা মে ভোটগণনার দিন, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা হতভম্ব হয়ে দেখলেন মাত্র দুই বছরের পুরনো একটি দল, যার কোনো পূর্ব নির্বাচনী ইতিহাস নেই, যার নেতা কখনো কোনো সংসদীয় পদে বসেননি, ২৩৪ আসনের বিধানসভায় ১০৮টি আসন জিতে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তামিলনাড়ুর ইতিহাসে প্রথমবার ঝুলন্ত বিধানসভা তৈরি হল এবং মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিন তাঁর নিজের কেন্দ্র কোলাথুর থেকে হেরে গেলেন। কোনো কর্মরত মুখ্যমন্ত্রীর নিজের আসনে এমন পরাজয় তামিলনাড়ুতে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার।
এ শুধু একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়। এ এক রাজনৈতিক ভূমিকম্প।
চলচ্চিত্র থেকে ক্ষমতার মঞ্চে: এক দীর্ঘ প্রস্তুতি
বিজয়ের উত্থান হঠকারী নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও সুচিন্তিত প্রক্রিয়ার পরিণতি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তামিল চলচ্চিত্রের শীর্ষে থেকে তিনি ৬৯টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। “ঘিলি” (২০০৪), “থুপ্পাকি” (২০১২), “মার্সাল” (২০১৭), “বিগিল” (২০১৯), “মাস্টার” (২০২১) — একের পর এক ছবি তামিল বক্স অফিসের সর্বকালীন রেকর্ডের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্তদের মধ্যে তাঁর স্থান ছিল নিরঙ্কুশ।
কিন্তু এই জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার কাজ শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। ২০০৯ সালে বিজয় তাঁর প্রায় ৮৫ হাজার ভক্তসংঘকে একত্রিত করে গড়ে তুলেছিলেন “বিজয় মক্কল ইয়াক্কম” — জনগণের আন্দোলন। কিন্তু এই সংগঠন কখনো নিছক ভক্তসংঘের সীমায় আটকে থাকেনি। রক্তদান শিবির, দরিদ্রদের জন্য কল্যাণমূলক কাজ, দুর্যোগত্রাণ — এই কাজের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সমাজে বিশ্বাসযোগ্যতা ও সামাজিক মূলধন গড়ে উঠেছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে গড়া এই নেটওয়ার্ক কখনো দুর্বল হতে দেননি বিজয়, ক্রমাগত তা পুষ্ট করে গেছেন।
এই নিরবচ্ছিন্ন সংগঠন-নির্মাণের ফল মিলল ২০২১ সালে। পৌরসভা নির্বাচনে বিজয় মক্কল ইয়াক্কমের মনোনীত প্রার্থীরা ১৬৯টির মধ্যে ১১৫টি আসনে জয়ী হলেন। কোনো দল নেই, কোনো নির্বাচনী ইশতেহার নেই, কেবল একজন মানুষের নামের শক্তিতে এই ফল। এটি ছিল আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস।
কৌশলগত ধৈর্য: ২০২৪ লোকসভা এড়িয়ে যাওয়া
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে না নামা। বিজয় বুঝেছিলেন তাঁর লড়াই তামিলনাড়ুর ক্ষমতা নিয়ে, দিল্লির অঙ্কে অংশীদার হওয়া নিয়ে নয়। আগে সংগঠন, তারপর নির্বাচন — এই ধৈর্য বেশিরভাগ নতুন দলের থেকে টিভিকেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
দলের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠল অভূতপূর্ব পদ্ধতিতে। ৮৫ হাজার ভক্তসংঘকে রাতারাতি রাজনৈতিক ক্যাডারে রূপান্তরিত করা হল। নতুন দল হিসেবে প্রথম নির্বাচনেই এত গভীরে শিকড় ছড়ানো সংগঠন ভারতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দল ঘোষণা করল ৭০ হাজারেরও বেশি বুথ এজেন্ট নিয়োগের পরিকল্পনা।
অক্টোবর ২০২৪-এ বিক্রবন্দীতে দলের প্রথম বড় সম্মেলনে আট লক্ষেরও বেশি মানুষের সমাগম হল। এই সংখ্যা নিছক একটি রাজনৈতিক সমাবেশের পরিসংখ্যান নয় — এটি একটি বার্তা: তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে একটি নতুন শক্তি এসেছে, যাকে আর উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।
ভাবাদর্শের রাজনীতি: কে বিজয়, কোথায় দাঁড়িয়ে তিনি?
তামিলনাড়ুর রাজনীতি চিরকাল দ্রাবিড় আন্দোলনের ছায়ায় পরিচালিত হয়েছে। ডিএমকে ও এআইএডিএমকে — এই দুটি দল সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্যায়ক্রমে রাজ্য শাসন করেছে, কার্যত এক দুর্ভেদ্য দ্বিদলীয় আধিপত্য তৈরি করেছে। এই কাঠামো ভাঙার স্বপ্ন অনেকে দেখেছেন, পারেননি।
বিজয়ের আদর্শগত অবস্থান এই প্রেক্ষিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দল ঘোষণা করল আম্বেদকর, পেরিয়ার ও কামরাজের চিন্তাধারার উপর ভিত্তি করে মধ্য-বামপন্থী আদর্শের প্রতি প্রতিশ্রুতি। দলটি স্পষ্ট করল ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বিক্রবন্দী সমাবেশে বিজয় ঘোষণা করলেন: বিজেপি তাঁর “আদর্শগত প্রতিপক্ষ” কারণ তারা ডানপন্থী, আর ডিএমকে “রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী” কারণ তারা দুর্নীতিগ্রস্ত ও রাজবংশতান্ত্রিক।
এই দ্বিমুখী সমালোচনা ছিল এক তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক কৌশল। যারা বিজেপির হিন্দুত্ব রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন তাদের কাছে বিজয় বিকল্প। আবার যারা ডিএমকে-র দশ বছরের শাসনে ক্লান্ত, দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্র দেখে বিরক্ত, তাদের কাছেও বিজয়ের দরজা খোলা। দুই দিক থেকেই ভোট টানার এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কাজে লাগল।
দ্রাবিড় রাজনীতিতে ক্লান্তি ও পরিবর্তনের ডাক
২০২৬ সালের নির্বাচনে ডিএমকে-র বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষমতাবিরোধী ঢেউ উঠেছিল। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ, বিশেষত নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্রমবর্ধমান হার এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক অসন্তোষ মিলিয়ে একটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, যার তীব্রতা ডিএমকে নেতৃত্ব অনুমান করতে পারেননি।
তামিলনাড়ুর ভোটারদের, বিশেষত নতুন ভোটারদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল: এই দুটি দলের বাইরে কি সত্যিই কোনো বিকল্প সম্ভব? এআইএডিএমকে-র কাছে ফিরে যাওয়া মানে সেই পুরনো দুর্নীতি ও দলাদলির কাছে ফিরে যাওয়া। বিজেপি তামিলনাড়ুতে কখনো শিকড় বিস্তার করতে পারেনি। এই শূন্যতায় বিজয়ের আবির্ভাব ছিল একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্পের সন্ধান পাওয়ার মতো।
সিনেমার শক্তি ও তামিল পরিচয়ের রাজনীতি
তামিলনাড়ুতে অভিনেতাদের রাজনীতিতে আসা নতুন নয়। এমজিআর ও জয়ললিতার ঐতিহ্য আগেই সাক্ষ্য দিয়েছে যে তামিল পর্দার নায়ক-নায়িকারা কীভাবে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করতে পারেন। কিন্তু বিজয়ের ঘটনা আলাদা। এমজিআর বা জয়ললিতার মতো তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত দলের আশ্রয় নেননি, শূন্য থেকে নিজের দল গড়েছেন।
বিজয়ের চলচ্চিত্র জীবন ছিল এই রাজনৈতিক যাত্রার প্রচ্ছন্ন মহড়া। “কাথ্থি” (২০১৪) ছিল কর্পোরেট শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের লড়াইয়ের গল্প। “মার্সাল” (২০১৭) ছিল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক রূপকথা, যা বিজেপির কোপে পড়েছিল। প্রতিটি ছবিতে তিনি নিজেকে শুধু বিনোদনের নায়ক হিসেবে নয়, সমাজের পক্ষে লড়াই করা একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছেন। কোটি কোটি দর্শক তাঁর পর্দার ভূমিকার সঙ্গে বাস্তব মানুষটিকে একাকার করে নিয়েছেন।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তামিল পরিচয়ের রাজনীতি। নিট পরীক্ষা বাতিলের দাবি, শিক্ষাকে রাজ্য তালিকায় ফিরিয়ে আনার দাবি, দ্বিভাষিক নীতির সমর্থন — এই সব প্রশ্নে বিজয়ের দৃঢ় অবস্থান তাঁকে দিল্লির কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে তামিলদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সেন্সরশিপের ফাঁদ উল্টে দেওয়া
নির্বাচনের ঠিক আগে কেন্দ্রীয় সরকার অজান্তে বিজয়ের রাজনৈতিক প্রচারণার সবচেয়ে বড় হাতিয়ারটি তৈরি করে দিল। বিজয়ের বিদায়ী ছবি “জন নায়গান” ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পঙ্গল উৎসবে মুক্তির কথা ছিল। সেন্সর বোর্ড ইতিমধ্যে ইউ/এ ১৬+ সার্টিফিকেট দেওয়ার পরেও শেষ মুহূর্তে বোর্ডের এক সদস্যের আপত্তিতে সার্টিফিকেট প্রত্যাহার করা হল — সশস্ত্র বাহিনীর চিত্রায়ণ ও ৫০টিরও বেশি রাজনৈতিক সংলাপের অজুহাতে। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ মুক্তির নির্দেশ দিলেও বিভাগীয় বেঞ্চ সেই রায় রদ করল।
এই সেন্সরশিপ বিতর্ক বিজয়ের জন্য রাজনৈতিক আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াল। কেন্দ্র যেন নিজেই প্রমাণ করে দিল যে বিজয় প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতাবান স্বার্থের কাছে বিপজ্জনক। তামিল জনমানসে এটি তাঁকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলল।
পরিসংখ্যানের গল্প
২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল তামিলনাড়ুতে ৮৫.১ শতাংশ ভোট পড়ল — রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই অভূতপূর্ব ভোটের হার নিজেই একটি বার্তা: মানুষ পরিবর্তন চায়। বিজয় নিজে দুটি কেন্দ্র থেকে লড়লেন এবং দুটিতেই জিতলেন — পেরাম্বুরে ৩৮ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে, তিরুচিরাপল্লি পূর্বে ২৭ হাজারেরও বেশি ব্যবধানে। মাত্র দুই বছরের দল, কোনো জোটসঙ্গী ছাড়া, একাই ২৩৪টি আসনে লড়ে ১০৮টি জিতল।
উপসংহার: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নাকি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়?
১৯৭৭ সালে এমজিআর প্রথম অভিনেতা হিসেবে তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তারপর থেকে কোনো অভিনেতার দল প্রথম নির্বাচনেই একক বৃহত্তম দল হয়নি — বিজয়ের আগে পর্যন্ত। কিন্তু এই তুলনা বিভ্রামক হতে পারে। এমজিআর বা জয়ললিতা একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে উঠে এসেছিলেন। বিজয় একটি সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরি করেছেন।
তবে সত্যিকারের পরীক্ষা এখন শুরু হচ্ছে। ভোট পাওয়া এক জিনিস, সরকার চালানো আরেক। তামিলনাড়ুর উচ্চ প্রত্যাশাসম্পন্ন ভোটাররা দ্রুত হতাশ হতে পারেন যদি প্রতিশ্রুত পরিবর্তন না আসে। নতুন দলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও সহজ নয়। আর প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্নে বিজয়ের কাছে এখনো কোনো প্রমাণ নেই।
তবুও এই মুহূর্তে যা বলা যায়: তামিল জনগণ একটি সুচিন্তিত বাজি ধরেছেন। পরিচিত দুর্নীতিকে “না” বলে একটি অনিশ্চিত সম্ভাবনাকে “হ্যাঁ” বলেছেন। সেনাপতির পর্দার যুদ্ধ শেষ হয়েছে। আসল যুদ্ধ এইবার শুরু।