Home খবর ট্রাম্পের খামখেয়ালি কূটনীতি

ট্রাম্পের খামখেয়ালি কূটনীতি

কূটনীতির নামে চলছে খামখেয়ালিপনা — একদিকে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে জাহাজ আটক।

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের চলার ধরনটা অনেকটা এরকম — হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে এগোনো, অধৈর্য আর দম্ভের সাথে। ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি আসে একের পর এক, মাঝে মাঝে আসন্ন কূটনৈতিক সাফল্যের বড় বড় প্রতিশ্রুতি, কিন্তু কোনো সামঞ্জস্য নেই, প্রতিপক্ষকে বোঝার চেষ্টাও নেই।

জাহাজ আটক ও ইসলামাবাদ বৈঠকের বিভ্রান্তি

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে, মার্কিন নৌবাহিনী একটি ইরানি মালবাহী জাহাজ আটক করে, আর নতুন করে অনিশ্চয়তার মেঘ জমে ওঠে। তেহরান সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেয়। সেই একই সকালে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর একটি প্রতিনিধিদল পরদিন পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যাবে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার জন্য। কয়েক ঘণ্টা ধরে অস্পষ্ট ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সেই দলে থাকবেন কি না। ট্রাম্প ABC News-কে বলেন নিরাপত্তার কারণে তিনি যাবেন না, পরে হোয়াইট হাউস তাঁর যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

পাকিস্তান এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন-ইরান উচ্চপর্যায়ের আলোচনার আয়োজন করছিল। কিন্তু তেহরান তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তারা শর্ত দিয়েছে — আগে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলতে হবে। ইসলামাবাদ দুই পক্ষকে কাছে আনতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছিল, কিন্তু ইরান না এলে ওয়াশিংটনের কাছে সেটা হবে এক বড় অপমান — আর সেই অপমান মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত করে তুলবে। যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়া, বেরিয়ে আসার কোনো কৌশল ছাড়াই।

হুমকির রাজনীতি ও অবিশ্বাসের গভীরতা

ট্রাম্প নিজে আসলে কতটা বিশ্বাস করেন তাঁর বোনা সেই কল্পকাহিনিতে — যা বাস্তবতা দ্রুত ভেঙে দেয় — তা জানার উপায় নেই। তবে এটুকু স্পষ্ট যে হুমকি দিয়ে বাস্তবকে বাঁকানো যাবে এই বিশ্বাস তাঁর মধ্যে অফুরন্ত। এখন পর্যন্ত সেই হুমকি ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে আর ওয়াশিংটনের প্রতি তাদের অবিশ্বাস আরও গভীর করেছে — ২০১৮ সালে আমেরিকা ইরান পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে এই অবিশ্বাসই দুই দেশের সম্পর্কের মূল সুর।

হোয়াইট হাউসে চলছে লাগাতার খেয়ালখুশির রাজত্ব। ট্রাম্প মনে করেন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ইরানের শাসকগোষ্ঠী মাথা নত করবে। রবিবার তিনি ঘোষণা করেন, একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ছয় ঘণ্টা ধরে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নৌ-অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা ইরানি একটি মালবাহী জাহাজে গোলা ছুড়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, জাহাজটির — যার নাম তৌস্কা — ইঞ্জিন কক্ষে আঘাত করার পর মার্কিন মেরিন সেনারা সেটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। তেহরান এই ঘটনাকে জলদস্যুতা বলে আখ্যা দেয় এবং অভিযোগ করে যে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নৌ-অবরোধ বজায় রেখে হোয়াইট হাউস নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতিই ভেঙেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই X-এ লেখেন, মার্কিনদের এই তথাকথিত ‘অবরোধ’ শুধু পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিরই লঙ্ঘন নয়, এটি বেআইনি এবং অপরাধমূলকও বটে।

হরমুজ প্রণালি: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক

মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প উল্লসিত ছিলেন — তেহরান নাকি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রাজি হয়েছে। কিন্তু পরদিনই, শনিবার, ইরান দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে — যার একটি ছিল ফরাসি কোম্পানি CMA-CGM-এর। বার্তাটা পরিষ্কার: প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি না হলেও জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা তাদের এখনো অটুট।

ট্রাম্প রবিবার সকালে Truth Social-এ লেখেন, “এটা কি ভালো হলো?” — ইরানের সতর্কতামূলক গুলির প্রসঙ্গ টেনে। এরপর নতুন হুমকি: “আমরা একটা খুবই ন্যায্য ও যুক্তিসংগত প্রস্তাব দিচ্ছি, আশা করি তারা রাজি হবে। কারণ না হলে আমেরিকা ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আর প্রতিটি সেতু গুঁড়িয়ে দেবে। আর কোনো ভদ্রতা নয়!” এর আগে, ৭ এপ্রিল, ট্রাম্প আরও ভয়ঙ্কর ভাষা ব্যবহার করে বলেছিলেন, “আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা চিরতরে মুছে যাবে।” পরে তিনি পিছু হটেন এবং কূটনীতিকে সুযোগ দিতে যুদ্ধবিরতির নীতিতে রাজি হন।

কূটনীতির পথে বাধা কোথায়?

কিন্তু এই কূটনীতি যদি স্রেফ কথার কূটনীতিই হয়, তাহলে সেই সুযোগের অর্থ কী দাঁড়ায়? ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার বলেছেন এই প্রচেষ্টা সফল হবে। বাস্তবে বাধা অনেক। আমেরিকার দিক থেকে হোয়াইট হাউসে চলছে অবিরাম খামখেয়ালিপনা, আর প্রতিপক্ষকে অপমান করার বা নিজেরা জোর করে পরিবর্তন এনেছি এমন দাবি করার তীব্র লোভ। ইরানের দিক থেকে যুদ্ধবিরতির সময়কালে সামরিক-নিরাপত্তা শিবির আর রাজনৈতিক-কূটনৈতিক শিবিরের মধ্যে ভেতরের টানাপোড়েন আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কূটনীতিকদের একাংশের বিরুদ্ধে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে যে তারা দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিতে চাইছেন।

খোলামেলা যুদ্ধের সময় অস্ত্রের কথাই শেষ কথা, কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি আরও জটিল। কে আছেন এমন, যাঁর বৈধতা ও কর্তৃত্ব আছে মার্কিন দাবির তালিকায় হ্যাঁ বা না বলার? ট্রাম্প প্রশাসন পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সব প্রযুক্তিগত আলোচনা পরে করার কথা বললেও তেহরানকে একটি বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দিতে হবে — উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। ট্রাম্প দাবি করছেন ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৪০০ কেজি এই ইউরেনিয়াম আমেরিকার হাতে তুলে দিতে হবে, যেন সেটা একটা ট্রফি। ইরানি কর্তৃপক্ষ এই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের কাছে এটি সার্বভৌমত্বের প্রতীক। অবশ্য ৬০% মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উদ্দেশ্য তারা কখনো স্পষ্ট করে বলেন না — যদিও এর একমাত্র ব্যবহারিক প্রয়োগ সামরিক।

জনমত ও ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতা

অর্থনৈতিকভাবে ইরান দুর্বল হলেও শাসকগোষ্ঠী মনে করে সময় তাদের পক্ষে। এই যুদ্ধের পর্ব পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে মরিয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকান জনমত। NBC News-এর জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনসমর্থন এখন রেকর্ড সর্বনিম্নে — পক্ষে মাত্র ৩৭%, বিপক্ষে ৬৩%। যে তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ এখনো তাঁর পাশে আছেন, তারা মূলত MAGA ভিত্তির অংশ, ট্রাম্প যা-ই করুন তাঁদের সমর্থন অটল। MAGA পরিচয়ধারীদের মধ্যে ৮৭% ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন। কিন্তু সেই গণ্ডির বাইরে গেলে, যে জোট একদিন ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছে দিয়েছিল, সেটি এখন ভাঙনের মুখে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles