8
বাংলাস্ফিয়ার: কোনো একটা মুহূর্ত থাকে। এমন একটা মুহূর্ত, যখন একজন মানুষ বেছে নেয় — সে কে হবে। সেই মুহূর্তটা সবসময় নাটকীয় নয়। বেশিরভাগ সময় সেটা এতটাই ছোট, এতটাই সাধারণ যে, মানুষটা নিজেও টের পায় না। একটা ফোন ধরা। একটা চোখ বন্ধ রাখা। একটা নাম না লেখা এফআইআরে। শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের জীবনে সেই মুহূর্তটা ঠিক কখন এল, তা আমরা জানি না। কিন্তু জানি যে এসেছিল।
১৯৮৯ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন শান্তনু সিনহা বিশ্বাস। সেটা বাম আমলের শেষ দশক। কলকাতার থানাগুলো তখন অন্য ধরনের অঙ্কে চলত — পার্টি, পাড়ার দাদা, এবং তাদের মাঝখানে একজন ওসি। শান্তনু সেই ব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই বড় হলেন। পদক পেলেন। ২০০৩ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছ থেকে প্রশংসা পদক, ২০১৫ সালে ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল, ২০১৬ সালে মুখ্যমন্ত্রীর পুলিশ মেডেল। কাগজে-কলমে একটি আদর্শ ক্যারিয়ার। থানার পেন্ডিং কেস কমিয়েছেন এক-তৃতীয়াংশ। ছুরিকাহত দম্পতিকে হাসপাতালে পাঠিয়ে বাঁচিয়েছেন। কালীঘাট মন্দিরের লক্ষ লক্ষ ভক্তের নিরাপত্তার জন্য রাত জেগেছেন। পাড়ার লোক ভালো বলত।
কিন্তু কলকাতার পুলিশি জীবনে শুধু পদক দিয়ে উঠে যাওয়া যায় না। এখানে উঠতে হলে লাগে অন্য কিছু। কালীঘাট থানার ওসি পদটি কলকাতার সমস্ত থানার মধ্যে সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন পড়ে কালীঘাট থানার এক্তিয়ারে, এবং যিনিই এই থানার ওসি হন, তাঁকে সিএম-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পুলিশ অফিসারদের একজন বলে ধরা হয়। সেই পদে শান্তনু সিনহা বিশ্বাস শুধু বসেননি, তিনি সেখানে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছিলেন। কীভাবে? নিজেই একবার বলেছিলেন: “ম্যাডাম দায়িত্ব দিয়েছেন।” এই একটি বাক্যে একটি মানুষের পরিচয় লুকিয়ে আছে।
২০২০ সালের অগস্টে, কালীঘাটের ওসি থাকাকালীন, তাঁকে রাজ্যের একটি নতুন পদে নিয়োগ দেওয়া হয় — পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও কলকাতা পুলিশের মধ্যে কল্যাণ ও অভিযোগ-সংক্রান্ত বিষয়ে সমন্বয়ের নোডাল অফিসার। পুলিশ মহলে তখনই প্রশ্ন উঠেছিল। একজন কনিষ্ঠ অফিসারকে এত গুরুত্বপূর্ণ পদে কেন? সিনিয়র আইপিএস অফিসাররা নাম না করে বলেছিলেন, এই পদের জন্য সিনিয়র কাউকে বাছা উচিৎ ছিল। কিন্তু সরকারের বিবেচনা ছিল অন্যরকম। শান্তনু উঠতে থাকলেন — কলকাতা পুলিশের কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হলেন, ডেপুটি কমিশনার হলেন। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি মসৃণ, পুরস্কৃত জীবন। ভেতরে কী চলছিল, তা অন্য প্রশ্ন।
সেই ভেতরের গল্পে ঢোকার পথ দেখিয়ে দিচ্ছে একটি নাম: বিশ্বজিৎ পোদ্দার, যাকে দক্ষিণ কলকাতার গলিপথ চেনে সোনা পাপ্পু নামে। ২০১০-১১ সালের দিকে নির্মাণ ব্যবসায় ঢোকার পর থেকে সোনা পাপ্পু একের পর এক আইনি ঝামেলায় পড়েছে। ২০১৫ সালে বালিগঞ্জ রেল ইয়ার্ড দখলের চেষ্টায় অন্য পেশিশক্তির সঙ্গে সংঘাত, ২০১৭ সালে সুইনহো লেনে একটি খুনের মামলায় নাম, কমপক্ষে ১৫টি ফৌজদারি অভিযোগ। ইডির তদন্তে উঠে এসেছে যে চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং অননুমোদিত নির্মাণ থেকে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন সত্তার মাধ্যমে পাচার হয়েছে। অভিযোগ, সোনা পাপ্পু ও তার সহযোগীরা রিয়েল এস্টেট প্রসারের আড়ালে একটি চাঁদাবাজির রাজত্ব চালাত এবং সংগৃহীত অর্থ বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যেত।
এত কিছুর পরেও সোনা পাপ্পু ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, সোশাল মিডিয়ায় লাইভে আসে অথচ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে না। এই অসম্ভবটা সম্ভব হয় কারণ কোথাও কেউ তার জন্য দরজাটা খোলা রাখে। সেই দরজার পাহারাদার কে ছিলেন — তদন্তকারীরা সেটাই খুঁজছেন এবং তাদের দৃষ্টি এসে পড়েছে ফার্ন রোডের বালিগঞ্জের বাড়িতে।
এটা প্রথমবার নয় যে শান্তনুর নাম উঠেছে। কয়েক বছর আগে, কালীঘাটের ওসি থাকাকালীন এসিপি পদে, তিনি কয়লা কেলেঙ্কারিতে দিল্লিতে ইডির সামনে হাজির হয়েছিলেন এবং বেশ কিছু নথি জমা দিয়েছিলেন। সেদিনও তিনি ফিরে এসেছিলেন নিরাপদে। পদোন্নতি পেয়েছিলেন। ক্ষমতার ছায়া দীর্ঘ হলে মানুষ ভাবতে শুরু করে, সে অদৃশ্য। প্রতিটি নিরাপদ প্রত্যাবর্তন সেই বিশ্বাসকে আরও গাঢ় করে — যে ব্যবস্থা তাকে রক্ষা করেছে, সে ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য আরও গভীর হয়। আর সেই আনুগত্যের বিনিময়ে কী দিতে হয়, তা আর বলে দিতে হয় না।
১ এপ্রিলের প্রথম দফা অভিযানে ইডি সোনা পাপ্পুর ফার্ন রোডের বাসভবন থেকে ‘Made in USA’ লেখা একটি রিভলভার উদ্ধার করে। আমেরিকায় তৈরি অস্ত্র, বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে — এই ছবিটা শুধু একটি অপরাধের নয়, এটা একটা পরিবেশের, একটা কাঠামোর ছবি, যেখানে আইন এবং আইনের বাইরে এতটাই মিলে গেছে যে আলাদা করা কঠিন। তারপর ১৯ এপ্রিল, ভোরের আলো ফোটার আগেই, ইডি অফিসাররা সকাল সাতটায় বালিগঞ্জের ফার্ন রোডে ডিসিপির বাসভবনে পৌঁছান। শান্তনু সিনহা বিশ্বাস সেখানে ছিলেন না।
কোথায় ছিলেন, কেউ জানে না। হয়তো তিনি নিজেও ঠিকমতো জানেন না — কতদিন ধরে আসলে তিনি পালিয়েই আছেন। ১৯৮৯ সালে যে মানুষটি ইউনিফর্ম পরেছিলেন পাড়াকে নিরাপদ রাখবেন বলে, সেই মানুষটি কোথাও হারিয়ে গেছেন — হয়তো প্রথম পদকের আলোয়, হয়তো প্রথমবার “ম্যাডামের মানুষ” শুনে যে গর্ব হয়েছিল তার নিচে, হয়তো এমন কোনো এক রাতে যে রাতের কথা শুধু সে একা জানে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে থাকতে একসময় ক্ষমতাই হয়ে ওঠে পরিচয়। আর সেই পরিচয় যেদিন ভেঙে পড়ে, সেদিন আর কোনো ইউনিফর্ম, কোনো পদক, কোনো “ম্যাডামের আশীর্বাদ” কাজে আসে না।
১৯৮৯ সালে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন শান্তনু সিনহা বিশ্বাস। সেটা বাম আমলের শেষ দশক। কলকাতার থানাগুলো তখন অন্য ধরনের অঙ্কে চলত — পার্টি, পাড়ার দাদা, এবং তাদের মাঝখানে একজন ওসি। শান্তনু সেই ব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই বড় হলেন। পদক পেলেন। ২০০৩ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছ থেকে প্রশংসা পদক, ২০১৫ সালে ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল, ২০১৬ সালে মুখ্যমন্ত্রীর পুলিশ মেডেল। কাগজে-কলমে একটি আদর্শ ক্যারিয়ার। থানার পেন্ডিং কেস কমিয়েছেন এক-তৃতীয়াংশ। ছুরিকাহত দম্পতিকে হাসপাতালে পাঠিয়ে বাঁচিয়েছেন। কালীঘাট মন্দিরের লক্ষ লক্ষ ভক্তের নিরাপত্তার জন্য রাত জেগেছেন। পাড়ার লোক ভালো বলত।
কিন্তু কলকাতার পুলিশি জীবনে শুধু পদক দিয়ে উঠে যাওয়া যায় না। এখানে উঠতে হলে লাগে অন্য কিছু। কালীঘাট থানার ওসি পদটি কলকাতার সমস্ত থানার মধ্যে সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন পড়ে কালীঘাট থানার এক্তিয়ারে, এবং যিনিই এই থানার ওসি হন, তাঁকে সিএম-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পুলিশ অফিসারদের একজন বলে ধরা হয়। সেই পদে শান্তনু সিনহা বিশ্বাস শুধু বসেননি, তিনি সেখানে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছিলেন। কীভাবে? নিজেই একবার বলেছিলেন: “ম্যাডাম দায়িত্ব দিয়েছেন।” এই একটি বাক্যে একটি মানুষের পরিচয় লুকিয়ে আছে।
২০২০ সালের অগস্টে, কালীঘাটের ওসি থাকাকালীন, তাঁকে রাজ্যের একটি নতুন পদে নিয়োগ দেওয়া হয় — পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও কলকাতা পুলিশের মধ্যে কল্যাণ ও অভিযোগ-সংক্রান্ত বিষয়ে সমন্বয়ের নোডাল অফিসার। পুলিশ মহলে তখনই প্রশ্ন উঠেছিল। একজন কনিষ্ঠ অফিসারকে এত গুরুত্বপূর্ণ পদে কেন? সিনিয়র আইপিএস অফিসাররা নাম না করে বলেছিলেন, এই পদের জন্য সিনিয়র কাউকে বাছা উচিৎ ছিল। কিন্তু সরকারের বিবেচনা ছিল অন্যরকম। শান্তনু উঠতে থাকলেন — কলকাতা পুলিশের কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হলেন, ডেপুটি কমিশনার হলেন। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি মসৃণ, পুরস্কৃত জীবন। ভেতরে কী চলছিল, তা অন্য প্রশ্ন।
সেই ভেতরের গল্পে ঢোকার পথ দেখিয়ে দিচ্ছে একটি নাম: বিশ্বজিৎ পোদ্দার, যাকে দক্ষিণ কলকাতার গলিপথ চেনে সোনা পাপ্পু নামে। ২০১০-১১ সালের দিকে নির্মাণ ব্যবসায় ঢোকার পর থেকে সোনা পাপ্পু একের পর এক আইনি ঝামেলায় পড়েছে। ২০১৫ সালে বালিগঞ্জ রেল ইয়ার্ড দখলের চেষ্টায় অন্য পেশিশক্তির সঙ্গে সংঘাত, ২০১৭ সালে সুইনহো লেনে একটি খুনের মামলায় নাম, কমপক্ষে ১৫টি ফৌজদারি অভিযোগ। ইডির তদন্তে উঠে এসেছে যে চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং অননুমোদিত নির্মাণ থেকে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন সত্তার মাধ্যমে পাচার হয়েছে। অভিযোগ, সোনা পাপ্পু ও তার সহযোগীরা রিয়েল এস্টেট প্রসারের আড়ালে একটি চাঁদাবাজির রাজত্ব চালাত এবং সংগৃহীত অর্থ বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যেত।
এত কিছুর পরেও সোনা পাপ্পু ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, সোশাল মিডিয়ায় লাইভে আসে অথচ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে না। এই অসম্ভবটা সম্ভব হয় কারণ কোথাও কেউ তার জন্য দরজাটা খোলা রাখে। সেই দরজার পাহারাদার কে ছিলেন — তদন্তকারীরা সেটাই খুঁজছেন এবং তাদের দৃষ্টি এসে পড়েছে ফার্ন রোডের বালিগঞ্জের বাড়িতে।
এটা প্রথমবার নয় যে শান্তনুর নাম উঠেছে। কয়েক বছর আগে, কালীঘাটের ওসি থাকাকালীন এসিপি পদে, তিনি কয়লা কেলেঙ্কারিতে দিল্লিতে ইডির সামনে হাজির হয়েছিলেন এবং বেশ কিছু নথি জমা দিয়েছিলেন। সেদিনও তিনি ফিরে এসেছিলেন নিরাপদে। পদোন্নতি পেয়েছিলেন। ক্ষমতার ছায়া দীর্ঘ হলে মানুষ ভাবতে শুরু করে, সে অদৃশ্য। প্রতিটি নিরাপদ প্রত্যাবর্তন সেই বিশ্বাসকে আরও গাঢ় করে — যে ব্যবস্থা তাকে রক্ষা করেছে, সে ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য আরও গভীর হয়। আর সেই আনুগত্যের বিনিময়ে কী দিতে হয়, তা আর বলে দিতে হয় না।
১ এপ্রিলের প্রথম দফা অভিযানে ইডি সোনা পাপ্পুর ফার্ন রোডের বাসভবন থেকে ‘Made in USA’ লেখা একটি রিভলভার উদ্ধার করে। আমেরিকায় তৈরি অস্ত্র, বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে — এই ছবিটা শুধু একটি অপরাধের নয়, এটা একটা পরিবেশের, একটা কাঠামোর ছবি, যেখানে আইন এবং আইনের বাইরে এতটাই মিলে গেছে যে আলাদা করা কঠিন। তারপর ১৯ এপ্রিল, ভোরের আলো ফোটার আগেই, ইডি অফিসাররা সকাল সাতটায় বালিগঞ্জের ফার্ন রোডে ডিসিপির বাসভবনে পৌঁছান। শান্তনু সিনহা বিশ্বাস সেখানে ছিলেন না।
কোথায় ছিলেন, কেউ জানে না। হয়তো তিনি নিজেও ঠিকমতো জানেন না — কতদিন ধরে আসলে তিনি পালিয়েই আছেন। ১৯৮৯ সালে যে মানুষটি ইউনিফর্ম পরেছিলেন পাড়াকে নিরাপদ রাখবেন বলে, সেই মানুষটি কোথাও হারিয়ে গেছেন — হয়তো প্রথম পদকের আলোয়, হয়তো প্রথমবার “ম্যাডামের মানুষ” শুনে যে গর্ব হয়েছিল তার নিচে, হয়তো এমন কোনো এক রাতে যে রাতের কথা শুধু সে একা জানে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে থাকতে একসময় ক্ষমতাই হয়ে ওঠে পরিচয়। আর সেই পরিচয় যেদিন ভেঙে পড়ে, সেদিন আর কোনো ইউনিফর্ম, কোনো পদক, কোনো “ম্যাডামের আশীর্বাদ” কাজে আসে না।