Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৫ সালের ৩১ মে, মিউনিখের অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনার উচ্ছ্বাসভরা আবহে প্যারিস সাঁ-জার্মাঁ ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে হারিয়ে তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জেতে। সেই রাতের অন্যতম নায়ক ছিলেন উসমান দেম্বেলে। পুরো মৌসুমে তাঁর ১৬টি অ্যাসিস্ট এবং ৩৫টি গোল তাঁকে সেপ্টেম্বরে ব্যালন দি’অর এনে দেয়।
তুলিতে ধরা মাঠের তীব্রতা
শীতের শেষভাগে, ঘামভেজা শরীর, টানটান মুখভঙ্গি, গোলরক্ষকের দিকে স্থির দৃষ্টি — এই দৃশ্যই বিশাল এক জলরঙের ছবিতে ধরা পড়েছে শিল্পী লুই ভেরের তুলিতে। প্যারিসের উপকণ্ঠ অবেরভিয়েতে, ১৯এম (শ্যনেলের সাংস্কৃতিক ক্যাম্পাস)-এর সহযোগিতায় গড়ে ওঠা ‘পুশ’ শিল্পী-সমষ্টির নতুন স্টুডিওতে বসে তিনি যখন এই তীব্র মুহূর্ত আঁকছিলেন, তখন তাঁর নিজের উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত — নির্ভার, স্থির, শান্ত, যেন একটু দূরত্ব বজায় রেখে দেখছেন সবকিছু।
এটাই তাঁর প্রথম কাজ নয়। ফুটবলের একরকম ‘পিয়েতা’-চিত্রকর হিসেবে তিনি আঁকেছেন যন্ত্রণাকাতর নেইমার, হারিয়ে যাওয়া মার্কো ভেরাত্তি, অশ্রুসিক্ত পাওলো দিবালা, কিংবা ফরাসি পতাকার রঙে রঙিন নাকে গার্ড পরে থাকা এক বিষণ্ণ ক্লাউনের মতো কিলিয়ান এমবাপে — আরও কত তারকা ফুটবলারের মুখ, যেখানে আনন্দ, ক্রোধ, যন্ত্রণা মিলেমিশে এক অদ্ভুত আবেগের বিকৃতি তৈরি করেছে।
ফুটবলারেরা আধুনিক পৌরাণিক দূত
ভেরের চোখে ফুটবলাররা আধুনিক যুগের এক পৌরাণিক দূত — যেন অন্য এক জগতের বার্তাবাহক। তাঁর কথায়, “একটি ফুটবল ম্যাচ চলমান নাটক, ৯০ মিনিটের এক ট্র্যাজেডি, যেখানে সবকিছু — জীবন-মৃত্যু — বাজি রাখা থাকে।” এই ভাবনায় তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন রোলাঁ বার্ত, জর্জ দিদি-হুবারমান এবং অ্যাবি ওয়ারবুর্গের মতো তাত্ত্বিকদের লেখালেখি থেকে।
ছয় বছর বয়সে স্টেডিয়ামে প্রথম যাওয়া
১৯৯৫ সালে, মাত্র ছয় বছর বয়সে, বাবার সঙ্গে প্রথমবার পার্ক দে প্রাঁস স্টেডিয়ামে একটি ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন ভেরে — পিএসজি বনাম এসি মিলান, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনাল। “সেদিন ঠিক কী ঘটছিল তা আমি বুঝিনি, কিন্তু এক অত্যাবশ্যক জিনিস আমার চোখে গেঁথে গিয়েছিল — গতিময় রঙের এক বিস্ফোরণ,” তিনি স্মরণ করেন।
কৈশোরে তিনি বারবার স্টেডিয়ামে ফিরেছেন, কিন্তু কখনও ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি, তিনি চেয়েছিলেন শিল্পী হতে। শিল্পবিদ্যালয়ের ‘ট্রান্সফার মার্কেট’-এ তিনি একসঙ্গে সুযোগ পান প্যারিসের বোজ-আর এবং লন্ডনের সেন্ট্রাল সেন্ট মার্টিনসে। তিনি দ্বিধা করেননি; ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে লন্ডনে গিয়ে ছবি আঁকা ও ভিডিও শিল্পে প্রশিক্ষণ নেন, তারপর দেশে ফিরে এসে আতেলিয়ের দ্য সেভ্রে শিক্ষকতা শুরু করেন।
প্রুস্ত থেকে ফুটবল — স্মৃতি ও জলরঙের জগৎ
বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে কাজ করলেও ভেরে সবসময়ই তাঁর অনুপ্রেরণার উৎসকে নতুনভাবে বিন্যাস করার চেষ্টা করেছেন — শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’, মার্কিজ দ্য সাদের রচনা, অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ, পিয়ের পাওলো পাসোলিনির সিনেমা কিংবা শিল্পতাত্ত্বিকদের ভাবনা — সবকিছু মিলিয়ে তিনি নিজের পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। লকডাউনের সময় তিনি তৈরি করেন টীকা-সহ স্থিরচিত্র, যার সঙ্গে জুড়ে দেন গদ্যকবিতা — নিজের ছেলে আবেলের ঘুমের ফাঁকে আঁকা ও লেখা। সেই কাজ পরে ‘অসি’ (২০২২) নামে ৫০০ কপিতে স্ব-প্রকাশিত হয়, যেখানে বস্তু কিভাবে স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে, তার অনুসন্ধান রয়েছে।
এই বইয়ের পাতায় তিনি স্মরণ করেন, ২০১৯ সালে পিএসজি যখন রিয়াল মাদ্রিদকে হারায়, সেই সন্ধ্যাতেই তিনি মার্সেল প্রুস্তের ‘দ্যু কতে দ্য শে স্বান’ পড়া শেষ করেছিলেন। “আমি বলতে পারিনি, কোন প্রদর্শন বেশি সুন্দর, কোন গর্ব বেশি গভীর,” তিনি লেখেন। ভেরের কাছে ফুটবল সময়কে চিহ্নিত করে, আর জলরং তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম: “অশ্রু আর ঘামের জন্য এটি আদর্শ।”
নতুন পথে, নতুন দৃষ্টিতে
এখন তিরিশের কোঠায় দাঁড়িয়ে তিনি নিজের পথ গড়ে নিচ্ছেন। সেপ্টেম্বর মাসে গ্যালারি জুলি ক্যারেদ্দায় তাঁর কাজের নতুন প্রদর্শনী হবে, যেখানে তিনি শিল্পী লেতিসিয়া ল্য ফুর-এর সঙ্গেও প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছেন। ধীরে ধীরে তিনি তাঁর দৃষ্টি সরিয়ে আনছেন খেলোয়াড়দের থেকে সমর্থকদের দিকে — টিফোসি-দের আঁকছেন যেন অতীতের চিত্রশিল্পীরা অপ্সরাদের আঁকতেন।