Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ারঃ আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ঠিকই বলেছিলেন যে গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে সংঘাতই আমাদের সময়ের সবচেয়ে নির্ণায়ক লড়াই। তাহলে প্রশ্ন হলো, চাপের মুখে কোন ব্যবস্থাটি ভালো কাজ করে?
গত কয়েক বছর ধরে স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলো এগিয়ে থাকছিল বলেই মনে হচ্ছিল। স্বৈরতন্ত্রে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে। নেতারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সম্পদ কাজে লাগাতে পারেন ঝটপট। চিন দেখিয়েছে যে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও ব্যাপক সমৃদ্ধি আসতে পারে। বিশ্বজুড়ে স্বৈরতন্ত্র জমি পেয়েছে, গণতন্ত্র পিছু হটেছে।
গণতন্ত্রে আবার ক্ষমতা ছড়িয়ে থাকে নানা কেন্দ্রে, প্রায়ই মেরুকৃত ও অচল। আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর আস্থা যেমন কমেছে, তেমনি তা অকার্যকরও হয়ে পড়েছে। একজন সম্ভাব্য স্বৈরশাসক দেশেরই মাটি থেকে উঠে হোয়াইট হাউস দখল করেছেন। “কীভাবে গণতন্ত্র মরে” — এই শিরোনামে বই লিখে পণ্ডিতেরা বেস্টসেলার তালিকায় উঠেছেন।
অথচ গত কয়েক সপ্তাহ অনেক কিছু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর ক্ষেত্রে স্বৈরতন্ত্রের দুর্বলতা কতটা গভীর, সেটা এখন স্পষ্ট। এটা গণতন্ত্রের জয়গান গাওয়ার সময় নয়, বরং কর্তৃত্ববাদী অব্যবস্থাপনাকে — এবং সম্ভাব্য অস্থিরতাকে — বাস্তবের আলোয় বিচার করার সময়। সেই দুর্বলতাগুলো কী কী?
বহুজনের বিবেক একজন মহামানবের চেয়ে শ্রেয়
যেকোনো ব্যবস্থায় সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো: তথ্য কীভাবে প্রবাহিত হয়? গণতন্ত্রে নীতিনির্ধারণ সাধারণত কমবেশি প্রকাশ্যে হয়, এবং হাজারো বিশেষজ্ঞ তথ্য ও মতামত সরবরাহ করেন। গত বছর অনেক অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন মূল্যস্ফীতি সমস্যা হবে না, কিন্তু ল্যারি সামার্স ও অন্যরা বলেছিলেন হবে — এবং তারাই শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হলেন। ভুল আমরাও করি, কিন্তু ব্যবস্থাটা শিখতে পারে।
স্বৈরতন্ত্রে প্রায়ই ক্ষুদ্র, আবদ্ধ একটি বৃত্তের ভিতরে সিদ্ধান্ত হয়। ক্ষমতার চাপে তথ্যপ্রবাহ বিকৃত হয়ে যায়। শীর্ষ নেতা যা শুনতে চান না, তা কেউ বলার সাহস রাখেন না। ইউক্রেন প্রশ্নে রুশ গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা ছিল হতবাক করার মতো। ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের মানুষ কী চায়, তারা কীভাবে লড়াই করবে, কিংবা দুর্নীতি ও লুটেরাদের হাতে তার নিজের সেনাবাহিনী কতটা ফোকলা হয়ে গেছে, কিছুই বুঝতে পারেননি।
মানুষ চায় পূর্ণ জীবন
আজকের দিনে মানুষ চায় সমৃদ্ধ, পরিপূর্ণ জীবন, নিজের সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার। উদারনৈতিক আদর্শ বলে, মানুষকে যতটা সম্ভব স্বাধীনভাবে নিজের মতো জীবন গড়তে দেওয়া উচিত। স্বৈরতন্ত্র শৃঙ্খলার নামে সেই স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। তাই রাশিয়ার মেধাবী মানুষেরা এখন দলে দলে দেশ ছাড়ছেন। জাপানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত রাহম এমানুয়েল জানাচ্ছেন, হংকং ভয়াবহ মেধাপাচারে ধুঁকছে। ব্লুমবার্গ লিখেছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এমনকি অর্থ খাতেও এই পাচারের প্রভাব বাসিন্দারা আগামী বহু বছর টের পাবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শীর্ষ গবেষকদের মধ্যে চিনা বংশোদ্ভূতদের প্রায় ততটাই বড় অংশ এখন আমেরিকার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, যতটা মার্কিনিরা। সুযোগ পেলে মেধাবীরা যেখানে পরিপূর্ণতা আছে, সেখানেই যান।
সংগঠনের মানুষ হয়ে ওঠেন গ্যাংস্টার
স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিষ্ঠুর আনুগত্যের মাধ্যমে মানুষ উপরে ওঠে। এই আনুগত্য সংগঠনের প্রতি, আমলাতন্ত্রের প্রতি। সেই নিষ্ঠুরতাই তাঁদের সতর্ক করে রাখে যে অন্যরাও হয়তো আরও নিষ্ঠুর ও চালাক। ফলে তাঁরা হয়ে পড়েন সন্দেহপরায়ণ ও স্বৈরাচারী। ক্ষমতাকে তাঁরা ব্যক্তিগত করে তোলেন — রাষ্ট্র মানেই তিনি, তিনি মানেই রাষ্ট্র। যেকোনো দ্বিমত মনে হয় ব্যক্তিগত আঘাত। পণ্ডিতেরা যাকে বলেন “নেগেটিভ সিলেকশন” — সেটাও চলে। সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্যদের না নিয়ে তৃতীয় শ্রেণির মানুষদের নিয়ে সরকার চলে। এমন মানুষ বেছে নেওয়া হয় যারা হুমকি নয়, যারা নিষ্প্রভ ও গড়পড়তা। রুশ সামরিক নেতৃত্বকে দেখুন , এর এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে।
জাতিশ্রেষ্ঠত্বের নেশায় মাতাল
সবাই কিছু না কিছুর পূজা করে। উদার গণতন্ত্রে জাতির প্রতি ভক্তি যা উদারনৈতিক আদর্শের প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে ভারসাম্য রাখে, যা সর্বজনীন। কমিউনিজমের পতনের পর কর্তৃত্ববাদ সার্বজনীন মূল্যবোধের একটি বড় উৎস হারিয়েছে। জাতীয় গৌরবকে তখন নেশার মতো মৌলবাদী ভাবধারায় অনুসরণ করা হয়।
“আমি বিশ্বাস করি প্যাশনারিটিতে, প্যাশনারিটির তত্ত্বে,” পুতিন গত বছর ঘোষণা করেছিলেন। বলেছিলেন, “আমাদের একটি অনন্ত জিনগত সঙ্কেত আছে।” রুশ নৃতত্ত্ববিদ লেভ গুমিলিওভের তৈরি এই তত্ত্ব বলে, প্রতিটি জাতির নিজস্ব মানসিক ও আদর্শগত শক্তি আছে, নিজস্ব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা আছে। পুতিন মনে হয় বিশ্বাস করেন রাশিয়া প্রতিটি ক্ষেত্রে অসাধারণ এবং “এগিয়ে চলেছে।” এই ধরনের উন্মাদ জাতীয়তাবাদ মানুষকে তার সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছুটতে প্রলুব্ধ করে।
জনগণের বিরুদ্ধে সরকার মানেই পতন
গণতান্ত্রিক নেতারা, অন্তত তত্ত্বে, তাঁদের ভোটারদের সেবা করেন। স্বৈরশাসকেরা, বাস্তবে, নিজের ক্ষমতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য কাজ করেন, প্রয়োজনে জনগণকে উপেক্ষা করে। থমাস বলিকি, তারা টেমপ্লিন ও সাইমন উইগলি দেখিয়েছেন, সম্প্রতি স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তরিত দেশগুলোতে আয়ু বাড়ার গতি কীভাবে শ্লথ হয়েছে। ৭৬টি দেশের ৪০০-রও বেশি একনায়কের উপর রিচার্ড জং-আ-পিন ও ইওচেন মিরুর গবেষণা বলছে, একজন একনায়কের বয়স এক বছর বাড়লে তাঁর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.১২ শতাংশ কমে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জানা গেল, সিআইএ সোভিয়েত অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিকে বাড়িয়ে দেখিয়েছিল। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতায় একটি বড় সমাজ সফলভাবে চালানো আসলেই খুব কঠিন।
আমার কাছে শিক্ষাটা হলো এই য়ে চিনের মতো এখনও সফল স্বৈরতন্ত্রের মুখোমুখি হলেও আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে এবং নিজেদের উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর আস্থা রাখতে হবে। পুতিনের মতো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসীর সামনে আমেরিকা এখন যেভাবে সাড়া দিচ্ছি, সেই পথেই এগিয়ে যেতে হবে। অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক চাপ যদি অবিচল, ধৈর্যশীল ও অবিরাম বাড়তে থাকে, তাহলে ওই শাসনব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাগুলো ক্রমশ ফুলে-ফেঁপে উঠবে।