Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ার রণক্ষেত্রে যখন কামানের গর্জন আর বারুদের গন্ধে বাতাস ভারি, ঠিক তখনই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল একটি ফোনালাপ—ওয়াশিংটন থেকে নয়াদিল্লি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোন এবং নরেন্দ্র মোদির সাড়া; সময়টা নেহাতই কাকতালীয় নয়, বরং অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং হিসেবি। ইরান-ইজরায়েল সংঘাত যখন স্রেফ দ্বিপাক্ষিক লড়াই ছাপিয়ে বৈশ্বিক শক্তির নতুন মানচিত্র আঁকছে, তখন সেই মানচিত্রে ভারতের অবস্থান কোথায় হবে—তা নির্ধারণেই এই ‘ক্যালিব্রেটেড মুভ’।
ট্রাম্পের নীরবতা ও মোক্ষম চাল
যুদ্ধের শুরু থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপাত নীরবতা আসলে ছিল এক গভীর পর্যবেক্ষণ। যুদ্ধের প্রথম ধাক্কায় কে কোন শিবিরে ঝুঁকেছে এবং কার নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু, তা পরখ করার পরই তিনি এই চালটি দিয়েছেন। আমেরিকার কাছে এখন ভারতের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ভারতের ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল আমদানি নির্ভর, লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত এবং ভারতের বিদেশনীতি বরাবরই ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর দাঁড়িয়ে।
ফোনালাপের নেপথ্যে: কী ছিল আসল বার্তা?
সরকারি বিবৃতিতে ‘ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা’, ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা’ বা ‘সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই’-এর মতো চেনা শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হলেও বাস্তব রাজনীতির ভাষা ভিন্ন। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ট্রাম্প খুব স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছেন, সংঘাত বড় আকার নিলে ভারত ঠিক কোন অবস্থানে থাকবে? যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বা হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হয়ে গেলে ভারত কি মার্কিন অবস্থানকে মৌন বা সক্রিয় সমর্থন দেবে? প্রশ্নটা এখন আর শুধু ‘শান্তি চাই’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
মোদির ‘ডিপ্লোম্যাটিক ব্যালান্সিং অ্যাক্ট’
নরেন্দ্র মোদির জন্য এই ফোনালাপ ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। একদিকে QUAD এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায়। অন্যদিকে, চাবাহার বন্দর এবং জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিন্ন করা দিল্লির পক্ষে অসম্ভব। সূত্রের খবর, মোদি ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেছেন—ভারত উত্তেজনা প্রশমন ও শান্তি চায়, তবে সরাসরি কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধের ময়দানে নামতে আগ্রহী নয়।
চাপ ও প্রলোভনের মিশ্রণ
এই ফোনালাপ কোনো সাধারণ সৌজন্য বিনিময় নয়, বরং চাপ ও প্রলোভনের এক সূক্ষ্ম মিশ্রণ। ট্রাম্প জানেন, ভারতকে পাশে পাওয়া মানে কূটনৈতিক ভারসাম্য নিজেদের দিকে টেনে নেওয়া। অন্যদিকে, মোদি জানেন—অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়লে ভারতের দীর্ঘদিনের ‘নন-অ্যালাইনড’ বা জোটনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
রাজনৈতিক নাটক না কি প্রভাবের লড়াই?
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো যে এই ফোনালাপ একধরনের রাজনৈতিক নাটকও বটে। এই ফোনালাপের মাধ্যমে ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, তিনি এখনো বিশ্বরাজনীতির প্রধান ‘ডিল-মেকার’। আর মোদি বিশ্বের সামনে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, দেখিয়েছেন যে ভারত এখন এমন এক শক্তি, যার মতামত ছাড়া বৈশ্বিক সমীকরণ মেলা অসম্ভব।
উপসংহার
পশ্চিম এশিয়ার আগুনের তাপ এখন দিল্লির ফোন লাইনে। দুই রাষ্ট্রনেতা বিশ্বশান্তির অভিভাবক হিসেবে কথা বললেও দিনশেষে লক্ষ্য নিজেদের অবস্থান শক্ত করা। এই ফোনালাপ হয়তো যুদ্ধ থামাবে না, কিন্তু এটি মনে করিয়ে দিল যে আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ শুধু বন্দুক দিয়ে হয় না, ফোন দিয়েও হয়। আর সেই ফোনের ওপারে কে আছেন, সেটাই নির্ধারণ করে আপনি খেলার অংশীদার না কি স্রেফ দর্শক।