Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার পর পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি হঠাৎ তীব্রভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনার সমাপ্তি ঘটার পরপরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন এবং ইরানকে “চাঁদাবাজ রাষ্ট্র” বলে সরাসরি অভিযুক্ত করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক পোস্টে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, অবরোধের কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজকে “তাৎক্ষণিকভাবে নির্মূল” করা হবে, ঠিক যেভাবে সমুদ্রে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানায়, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে এই অবরোধ কার্যকর হয়েছে। আরব উপসাগর ও ওমান সাগরের সমস্ত ইরানি বন্দরে প্রবেশ এবং বের হওয়া জাহাজের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে। তবে ইরানবহির্ভূত বন্দরের উদ্দেশ্যে চলাচলকারী জাহাজে কোনো বাধা দেওয়া হবে না বলেও কমান্ড স্পষ্ট করেছে।
অবরোধের ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক তেলবাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক দিনেই ৮ শতাংশ লাফিয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যে ইতিমধ্যেই বিপাকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইরান এই অবরোধকে “জলদস্যুতা” আখ্যা দিয়ে কঠোর পাল্টা হুমকি দিয়েছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সম্মিলিত কমান্ড ঘোষণা করেছে, উপসাগর ও ওমান সাগরের বন্দরগুলো হয় “সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো কারো জন্য নয়।” ইসলামাবাদ থেকে ফিরে আসা ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের ক্বালিবাফ ট্রাম্পকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, “লড়াই করতে এলে আমরাও লড়াই করব।”
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা, এবং সেটি আদৌ নবায়িত হবে কিনা, তা নিয়ে এখন গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, সে প্রশ্নে গোটা বিশ্ব এখন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে অপেক্ষা করছে।
পটভূমি ও যুদ্ধের সূচনা
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। ওই সময় মধ্যপ্রাচ্যে ২০০৩ সালের ইরাক অভিযানের পর সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশ ঘটে। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানে সমন্বিত সামরিক হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান শত শত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইজরায়েলে এবং বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে।
ইসলামাবাদে আলোচনার ব্যর্থতা
পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এই মুখোমুখি বৈঠক ছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি আলোচনার টেবিলে “সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত প্রস্তাব” উপস্থাপন করেন।
ওয়াশিংটনের দাবির মধ্যে ছিল: সমস্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত, পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে দেওয়া, হামাস-হিজবুল্লাহ-হুতিদের অর্থায়ন সম্পূর্ণ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি নিঃশর্তে উন্মুক্ত রাখা। অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় হরমুজ প্রণালির উপর নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি। দুই পক্ষের অবস্থান এতটাই বিপরীতমুখী ছিল যে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
হরমুজ অবরোধের ঘোষণা
আলোচনা ভেঙে পড়ার পরপরই ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন। তিনি জানান, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টাকারী “সমস্ত জাহাজ” আটকানোর প্রক্রিয়া শুরু করবে। এছাড়া ইরানকে টোল দিয়ে প্রণালি পার হওয়া প্রতিটি জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় খুঁজে বের করে আটক করার নির্দেশও দেন তিনি। ফক্স নিউজে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের পানি বিশুদ্ধকরণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে হামলার সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেননি। সোমবার সকাল থেকে কার্যকর হওয়া এই অবরোধের আওতায় আরব উপসাগর ও ওমান সাগরের সমস্ত ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজ অন্তর্ভুক্ত বলে CENTCOM নিশ্চিত করেছে।
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
তেহরান এই অবরোধকে কার্যত যুদ্ধঘোষণার সমতুল্য মনে করছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশের আঞ্চলিক জলসীমায় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তাদের “স্বাভাবিক ও আইনগত দায়িত্ব” এবং শত্রু জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার কোনো অনুমতি দেওয়া হবে না। মার্কিন অবরোধকে তারা “আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেআইনি কর্মকাণ্ড ও প্রকাশ্য জলদস্যুতা” বলে অভিহিত করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি হুঁশিয়ারি দেন যে সংঘাত অব্যাহত থাকলে ইরান এমন নতুন যুদ্ধকৌশল প্রদর্শন করবে, যা মোকাবেলা করা প্রতিপক্ষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। অবরোধের ঘোষণায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলারে পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম ইতিমধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং মার্চ মাসে মুদ্রাস্ফীতি ২.৪ থেকে ৩.৩ শতাংশে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় মূল্য এখন গ্যালনপ্রতি ৪.১২ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল জাপান ও ইউরোপের মার্কিন মিত্র দেশগুলো এই অবরোধের ফলে মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ইরানে অন্তত ৩,০০০ জন, লেবাননে ২,০৫৫ জন, ইসরায়েলে ২৩ জন এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে আরও এক ডজনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেছেন, পরবর্তী পদক্ষেপ পুরোপুরি নির্ভর করছে ইরানের সিদ্ধান্তের ওপর — “বলটা এখন তাদের কোর্টে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষতি তাঁর অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে সারা বিশ্ব এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।