Home খবর মাইন আতঙ্ক: হরমুজ প্রণালীর নীল জলে ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ

মাইন আতঙ্ক: হরমুজ প্রণালীর নীল জলে ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ

0 comments 6 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী আজ বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথগুলির একটি। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে এখানকার যেকোনো সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং ভূরাজনীতিতে সরাসরি আঘাত হানে। এই প্রেক্ষাপটে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে একটি তুলনামূলকভাবে সস্তা কিন্তু ভয়াবহ কার্যকর অস্ত্র—সি মাইন বা সমুদ্র-মাইন।

কী এই সি মাইন?

সি মাইন হলো এমন বিস্ফোরক যন্ত্র যা সমুদ্রের জলে লুকিয়ে রাখা হয় এবং শত্রু জাহাজের সংস্পর্শে এলে বা নির্দিষ্ট সংকেত পেলে বিস্ফোরিত হয়। এগুলি দুই ধরনের হয়—একটি জাহাজের সরাসরি ধাক্কায় বিস্ফোরিত হয় (contact mines), আর অন্যটি জাহাজের শব্দ, চৌম্বক ক্ষেত্র বা চাপ পরিবর্তন শনাক্ত করে সক্রিয় হয় (influence mines)। আধুনিক মাইনগুলো এতটাই উন্নত যে এগুলো নির্দিষ্ট ধরনের জাহাজ বেছে আঘাত করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ‘ঘুমন্ত’ থেকেও পরে হঠাৎ সক্রিয় হতে পারে।

হরমুজে কেন মাইন এত বিপজ্জনক?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রণালীটির ভূগোলেই। অনেক জায়গায় মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এই জলপথে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত লেন আরও সরু। ফলে মাত্র কয়েকটি মাইন স্থাপন করলেই পুরো জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। একটি বড় তেলবাহী ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু পরিবেশ বিপর্যয় নয়, আন্তর্জাতিক তেলের দামেও তাৎক্ষণিক ধাক্কা লাগে। এ কারণেই সামরিক পরিভাষায় সি মাইনকে ‘area denial weapon’ বলা হয়—এমন একটি অস্ত্র যা শত্রুকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল ব্যবহার করতেই বাধা দেয়।

রক্তাক্ত ইতিহাস

হরমুজ প্রণালীতে মাইন ব্যবহারের নজির নতুন নয়। ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত পর্যায়ে উভয় পক্ষই একে অপরের তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। সেই সময় ইরান এই অঞ্চলে সমুদ্র-মাইন স্থাপন করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ১৯৮৮ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ USS Samuel B. Roberts একটি মাইনের আঘাতে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়—প্রমাণ হয় যে কয়েকটি মাইনই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীকেও বিপদে ফেলতে পারে।

এরপর ২০১৯ সালেও হরমুজের আশেপাশে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ ও ক্ষতির ঘটনা ঘটে, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। সরাসরি মাইন দায়ী ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, জাহাজের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া ‘limpet mine’-এর ব্যবহার নিয়ে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। এই ধরনের মাইন ডুবুরি বা ছোট নৌকা থেকে গোপনে বসানো হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরিত হয়।

সস্তা অস্ত্র, বড় বিপদ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সি মাইনের সবচেয়ে ভয়ের দিক হলো এর ব্যবহার সহজ এবং খরচ কম। বড় যুদ্ধজাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ব্যয়বহুল অস্ত্রের দরকার নেই—একটি মাছ ধরার ছোট নৌকাও ব্যবহার করে মাইন স্থাপন করা সম্ভব। তার মানে শুধু কোনো রাষ্ট্র নয়, অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীও এই ধরনের হামলা চালাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা হিসাব দিচ্ছেন, কয়েকশো মাইন স্থাপন করলেই পুরো প্রণালী কার্যত অচল করে দেওয়া সম্ভব, যার পরিণতি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বিধ্বংসী হবে।

আরেকটি বিষয় এই অস্ত্রকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে—মাইন যুদ্ধ প্রায়শই ‘অস্বীকারযোগ্য’ (deniable)। কে মাইন বসিয়েছে তা প্রমাণ করা কঠিন বলে কোনো দেশ সরাসরি দায় স্বীকার না করেই এই হামলা চালাতে পারে। ফলে কূটনৈতিক উত্তেজনা চরমে উঠলেও সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব—যা আধুনিক ‘গ্রে-জোন’ যুদ্ধনীতির একটি মূল হাতিয়ার।

মোকাবিলার প্রস্তুতি

এই হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিয়মিত ‘mine countermeasure’ অর্থাৎ মাইন অপসারণ মহড়া চালায়। মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ জাহাজ ও হেলিকপ্টার সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলের নিচে মাইন শনাক্ত করে সেগুলো নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করে। ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশও এই অভিযানে অংশ নেয়। তবে সমস্যা হলো, মাইন খুঁজে বের করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। একটি বড় এলাকাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ঘোষণা করতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

ইরান প্রশ্ন

হরমুজ ঘিরে বর্তমান ভূরাজনৈতিক আলোচনায় ইরানের নাম বারবার সামনে আসে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের দাবি, ইরানের নৌবাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ডের কাছে বিভিন্ন ধরনের সি মাইন মজুত রয়েছে। ইরান বারবার বলেছে তারা এই জলপথ বন্ধ করতে চায় না, কিন্তু উত্তেজনা বাড়লে এই অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলে থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও এই জলপথ খোলা রাখা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক স্বার্থের সঙ্গেও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কয়েকটি মাইনই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামরিক ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দিতে পারে—এই বাস্তবতাই হরমুজকে আজকের বিশ্বে সবচেয়ে উদ্বেগের সামুদ্রিক রণাঙ্গন করে তুলেছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles