ভোটে নেতানিয়াহু, না জবাবদিহি?

যা জানা জরুরি
- নিরাপত্তার রক্ষাকর্তা হিসেবে যে ভাবমূর্তি গড়ে দুই দশক ধরে ইজরায়েলের রাজনীতিতে নিজের জায়গা পাকা করেছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা সেই ভাবমূর্তিতেই…
- সেই বিপর্যয়ের দায় এড়াতে এখন নতুন আখ্যান সামনে আনছেন প্রধানমন্ত্রী।
- তাঁর দাবি, হামলার আগে সন্দেহজনক গতিবিধির খবর পেয়েও শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্তারা তাঁকে ঘুম থেকে তুলে সতর্ক করেননি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিরাপত্তার রক্ষাকর্তা হিসেবে যে ভাবমূর্তি গড়ে দুই দশক ধরে ইজরায়েলের রাজনীতিতে নিজের জায়গা পাকা করেছেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা সেই ভাবমূর্তিতেই গভীর চিড় ধরিয়েছে। সেই বিপর্যয়ের দায় এড়াতে এখন নতুন আখ্যান সামনে আনছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, হামলার আগে সন্দেহজনক গতিবিধির খবর পেয়েও শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্তারা তাঁকে ঘুম থেকে তুলে সতর্ক করেননি। বিরোধীদের পাল্টা অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ তদন্তের বদলে সীমিত অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় জোর দিয়ে আসলে জবাবদিহি এড়াতে চাইছেন তিনি।
সমালোচকদের একাংশের সন্দেহ, গাজায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার পিছনে শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নেই। বন্দিদের মুক্তির বিষয়টি আড়ালে চলে যাওয়া, তদন্ত পিছিয়ে দেওয়া এবং ক্ষমতা ধরে রাখার হিসাবও কাজ করছে। এর সঙ্গে রয়েছে নেতানিয়াহুর দুর্নীতির মামলা। বিচারাধীন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে হারলে রাজনৈতিক রক্ষাকবচ হারানোর আশঙ্কায় পড়তে পারেন। ফলে এই ভোট তাঁর কাছে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই নয়, ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখারও পরীক্ষা।
বিরোধীদের ঘরেই ফাটল
তবে নেতানিয়াহুকে আগেভাগে বাতিল করে দেওয়ারও অবকাশ নেই। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে ইজরায়েলের একাংশের মধ্যে সরকারের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে সমাজের বড় অংশের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক মনোভাবও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে কাজ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের নিজেদের বিভাজন।
নাফতালি বেনেট ফের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেও ইয়ায়ির গোলান ও ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধিত্বে মধ্য-বাম শিবিরের প্রভাব সীমিত। আরব দলগুলির সঙ্গে জোট বা নির্বাচনী সহযোগিতা নিয়েও বিরোধীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোই তাদের প্রধান অভিন্ন লক্ষ্য, কিন্তু তার পর দেশ কোন পথে চলবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ঐকমত্য এখনও চোখে পড়ছে না।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর নিজের জোটও পুরোপুরি অটুট নয়। হারেদি বা অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলির সামরিক বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জোটের ভিতরে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন তৈরি করেছে। অর্থাৎ বিরোধীরা বিভক্ত, আবার শাসক শিবিরও নির্বিঘ্ন নয়।
এই নির্বাচনের ফল নিয়ে তাই রয়েছে একাধিক সম্ভাবনা—দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ফের ভোট, কিংবা কঠিন দর-কষাকষির পরে কোনও ঐক্য সরকার। নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে পরাজিত হতে পারেন, কিন্তু তাতে ইজরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতি রাতারাতি বদলে যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। বছরের পর বছর সংঘাত এবং প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ যে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ঐকমত্যকে শক্তিশালী করেছে, তার শিকড় কোনও এক নেতার জনপ্রিয়তা বা অজনপ্রিয়তার চেয়ে গভীরে।
২৭ অক্টোবরের ভোট তাই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু ইজরায়েলের গতিপথ বদলে দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। বিভক্ত সমাজের ক্ষত, ৭ অক্টোবরের বিপর্যয়ের দায় এবং যুদ্ধের পরিণতি—কোনও কিছুরই মীমাংসা শুধু ব্যালট বাক্সে হবে না। নির্বাচনের পরেও চলবে সেই জবাবদিহির লড়াই, যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যর্থতার দায় নেবে কে?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



