সড়ক প্রকল্পে দুর্নীতি, মালয়েশীয় কর্মকর্তার আত্মহত্যা: কীভাবে জড়াল জ্ঞানেশের নাম

যা জানা জরুরি
- মালয়েশীয় ও ভারতীয় সংস্থার ওই যৌথ উদ্যোগটির নাম ছিল পিএটিআই-বিইএল (PATI-BEL)।
- কেরল স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট বা কেএসটিপি ছিল রাজ্যের পূর্ত দফতরের অন্যতম প্রধান প্রকল্প।
- বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণের সাহায্যে পূর্ত দফতরের অধীন বাছাই করা ১,৬০০ কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ সড়কের আধুনিকীকরণ ও সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মালয়েশীয় ও ভারতীয় সংস্থার ওই যৌথ উদ্যোগটির নাম ছিল পিএটিআই-বিইএল (PATI-BEL)।
কী ছিল প্রকল্পটি?
কেরল স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট বা কেএসটিপি ছিল রাজ্যের পূর্ত দফতরের অন্যতম প্রধান প্রকল্প। বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণের সাহায্যে পূর্ত দফতরের অধীন বাছাই করা ১,৬০০ কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ সড়কের আধুনিকীকরণ ও সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১,৬০০ কোটি টাকা।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা সিপিএম নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে প্রকল্প নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়। তখন পূর্তমন্ত্রী ছিলেন কেরল কংগ্রেসের ভেঙে বেরিয়ে আসা গোষ্ঠী, কেরল কংগ্রেস (জোসেফ)-এর নেতা পি জে জোসেফ। সেই সময়ে তিনি বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা এলডিএফ জোটের শরিক ছিলেন। বর্তমানে তিনি শাসক সংযুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা ইউডিএফ জোটে রয়েছেন।
সমস্যার শুরু কোথায়?
কেএসটিপিই ছিল কেরলের প্রথম প্রকল্প, যার সঙ্গে কোনও বিদেশি ঠিকাদার সংস্থা যুক্ত হয়েছিল। দরপত্রে অংশ নিতে কেরলভিত্তিক ভাগীরথ ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মালয়েশীয় সংস্থা পিএটিআই হাত মেলায়। এই যৌথ উদ্যোগ ২১৬ কোটি টাকার কাজের দায়িত্ব পায়। তার প্রধান অংশ ছিল দক্ষিণে রাজ্যের রাজধানী তিরুবনন্তপুরম থেকে মধ্য কেরলের অঙ্গমালি পর্যন্ত মেইন সেন্ট্রাল রোডের আধুনিকীকরণ। এই প্রকল্পেই নতুন প্রযুক্তিতে সড়কের উপরিভাগ নির্মাণের পদ্ধতি প্রথম ব্যবহার করার কথা ছিল রাজ্যে।
তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পরে ২০০২ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে পিএটিআই-বিইএল। তখন পূর্তমন্ত্রী ছিলেন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের নেতা এম কে মুনির। কিন্তু সড়ক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ না করেই সরকার ঠিকাদার সংস্থার হাতে কাজ তুলে দিয়েছিল। জমি অধিগ্রহণের বিজ্ঞপ্তি জারি হয় ২০০৪ সালে। ২০০৬ সালের অক্টোবরে ঠিকাদার সংস্থা সরকারকে জানায়, জমি অধিগ্রহণে দেরি হওয়ায় মূল সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়।
নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চুক্তিমূল্য ৩০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানায় পিএটিআই-বিইএল। সিপিএম সরকারের অর্থমন্ত্রী টমাস আইজ্যাকের অধীন অর্থ দফতর সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। কাজের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে বিশ্বব্যাঙ্কের অনুমতিও চায় তারা।
আত্মহত্যার ঘটনাটি কী?
পিএটিআই-বিইএলের হাতে থাকা কাজগুলির প্রধান প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন ৫৪ বছর বয়সি লি সি বিন। ২০০৬ সালে পাওনা মেটানোর জন্য সংস্থাটি ১৮ কোটি টাকার বিল জমা দেয়। ২০০৭ সালের বিধানসভার নথি অনুযায়ী, সেই টাকা আদায়ের জন্য পিএটিআই-বিইএলের আধিকারিকেরা একাধিক বার মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
খবর অনুযায়ী, প্রধান প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে লি-র উপরে চাপ বাড়াচ্ছিলেন উপঠিকাদার এবং নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারীরা। তাঁরা নিজেদের পাওনা চাইছিলেন। কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধীরাও সিপিএম সরকারের উপরে চাপ বাড়াচ্ছিল। আগের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারই ওই যৌথ উদ্যোগকে কাজের বরাত দিয়েছিল।
বিধানসভার নথিতে দেখা যায়, প্রকল্পের ব্যয় ৩০ শতাংশ বাড়ানোর পিএটিআই-বিইএলের দাবি সিপিএম সরকার মেনে নেওয়ার পরে কংগ্রেস সংস্থাটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছিল। সিপিএম সরকারের সঙ্গে পিএটিআই-বিইএলের বোঝাপড়া রয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছিল কংগ্রেস।
কেরলের বিভিন্ন মহল থেকে চাপ বাড়তে থাকার মধ্যে লি মালয়েশিয়ায় ফিরে যান। ২০০৬ সালের ১১ নভেম্বর কুয়ালালামপুরে তিনি আত্মহত্যা করেন। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সংস্থার পরিচালক এবং নিজের স্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি একটি সুইসাইড নোট রেখে গিয়েছিলেন। তাতে অভিযোগ ছিল, বিলের টাকা ছাড়ার জন্য পূর্ত দফতরের আধিকারিকেরা ঘুষ চেয়েছিলেন।
ওই নোটে তৎকালীন পূর্তসচিব জ্ঞানেশ কুমারের নামও ছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে নোটটি কখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
ভিজিল্যান্স তদন্তে কী পাওয়া গিয়েছিল?
লি-র মৃত্যুর পরে সরকারি পূর্ত প্রকল্পে আমলাতান্ত্রিক বাধা, দুর্নীতি এবং কাজ শেষ করতে দেরির মতো বিষয়গুলি সামনে আসে। তাঁর মৃত্যুর এক মাস পরে সিপিএম সরকার কুমারকে পূর্তসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেয়। অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে ভিজিল্যান্স ব্যুরোকে তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়। পাশাপাশি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় পিএটিআই-বিইএলের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। পরে নতুন করে দরপত্র ডাকা হয়।
২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা সিপিএম নেতা কোডিয়েরি বালকৃষ্ণন বিধানসভায় জানান, কেএসটিপি নিয়ে দু’টি ভিজিল্যান্স তদন্ত চলছিল। একটি ছিল ২০০৩-০৪ সালে বিদেশি পরামর্শদাতা নিয়োগ সংক্রান্ত। সেই সময়ে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। অন্য তদন্তটির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে, বিনের মৃত্যুর এক মাস পরে। সেটি ছিল কেএসটিপির কাজে ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে।
কিন্তু তদন্ত আর এগোয়নি। কংগ্রেস নেতা মালয়িনকীঝু বেণুগোপালের অভিযোগ, আগের তদন্তটি মাঝপথেই বানচাল করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর আবেদনের ভিত্তিতেই গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা নতুন করে তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেন।
২০০৬ সালের ডিসেম্বরে পূর্তসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরে কুমারকে রাজ্যে আর কোনও নতুন পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। পরে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাজে ডেপুটেশনে নয়াদিল্লি চলে যান। তখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার। প্রথম ইউপিএ সরকারকে সিপিএমও সমর্থন করেছিল।
সড়কের কাজের শেষ পর্যন্ত কী হল?
২০০৭ সালের গোড়ায় সিপিএম সরকার পিএটিআই-বিইএলের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। সরকারের যুক্তি ছিল, কাজ শেষ করতে দেরি হলে প্রকল্পে অর্থ জোগানো বিশ্বব্যাঙ্ক ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু নতুন করে দরপত্র ডাকার পরেও কোনও সংস্থা কাজ নিতে এগিয়ে আসেনি।
এক বছর পরে সরকার পিএটিআই-বিইএলের সঙ্গেই চুক্তি নবীকরণে রাজি হয়। মূল ২১৬ কোটি টাকার অতিরিক্ত আরও ৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ করার পরে সংস্থাটি ফের প্রকল্পের দায়িত্ব নেয়।
তখন বিরোধী দলে থাকা কংগ্রেস প্রশ্ন তোলে, তদন্ত চলাকালীন কেন পিএটিআই-বিইএলকেই আবার কাজ দেওয়া হল? বিরোধী দলনেতা উমেন চান্ডি অর্থমন্ত্রী টমাস আইজ্যাকের কাছে চুক্তি নবীকরণের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার দাবি জানান। কারণ, কাজ পিছিয়ে যাওয়ার সময়ে আইজ্যাকই পিএটিআই-বিইএলকে কালো তালিকাভুক্ত করার দাবি তুলেছিলেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



