মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’-এর অভিযোগ তুলে সোমবার একটি অভিযোগপত্র ও ইমপিচমেন্ট নোটিস জমা দিলেন প্রাক্তন আমলা ও সমাজকর্মীদের একটি প্রতিনিধিদল। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদের আওতায় তাঁকে পদ থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে প্রতিনিধিদলটি।

প্রতিনিধিদলের এই নোটিস জমা দেওয়ার কর্মসূচির আগে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে যাওয়ার রাস্তাগুলিতে পুলিশ ব্যারিকেড বসিয়েছিল বলে খবর পাওয়া যায়। সেই পরিস্থিতিতেই এই পদক্ষেপ করা হয়।

নোটিসে অভিযোগ করা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারের কাজে ধারাবাহিকভাবে ফুটে উঠেছে “আইন ও সাংবিধানিক কর্তব্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রের সততা ও অখণ্ডতা ধ্বংসকারী আচরণ”।

প্রতিনিধিদলের বক্তব্য, এই সমস্ত কথিত কর্মকাণ্ড নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। তারা জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে বলেছে। নোটিসে বলা হয়েছে, তিনি পদত্যাগ না করলে “আমরা, ভারতের জনগণ” তাঁর বিরুদ্ধে এই ইমপিচমেন্ট নোটিস জারি করছি এবং তাঁকে অপসারণের দাবি জানাচ্ছি।

অভিযোগপত্রে মোট ছয়টি অভিযোগ তোলা হয়েছে।

প্রথম অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের যৌথভাবে কাজ করার পদ্ধতিকে দুর্বল করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। প্রতিনিধিদলের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ কমিশনে যথেষ্ট বিবেচনা ছাড়াই কমিশনের নামে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। বিশেষভাবে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত আলোচনা, পরামর্শ, বিধি প্রণয়ন কিংবা কার্যবিবরণী নথিভুক্ত না করেই এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

দুই নির্বাচন কমিশনার তাঁদের অজ্ঞাতসারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে প্রকাশিত খবরেরও উল্লেখ রয়েছে নোটিসে। যথাযথ আলোচ্যসূচি ও কার্যবিবরণী ছাড়াই বৈঠক হওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

দ্বিতীয় অভিযোগ, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এ অনুমোদনহীন পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রতিনিধিদলের দাবি, এই পরিবর্তনগুলি “অননুমোদিত ও বেআইনি” বলে কমিশনের ভিতরেই আপত্তি উঠেছিল। তা সত্ত্বেও ফর্মটির সংশোধিত সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে।

আরও অভিযোগ, যাঁদের নাম আগে থেকেই ভোটার তালিকায় ছিল, তাঁদেরও ঘোষণা করতে বাধ্য করা হয়েছে যে তাঁরা প্রথমবার নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করছেন।

তৃতীয় অভিযোগ, ইসিআইনেটের বেআইনি ব্যবহার। প্রতিনিধিদলের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ভোটার নিবন্ধন আধিকারিকদের আইনপ্রদত্ত ক্ষমতা খর্ব হয়, এমনভাবে ইসিআইনেট চালু করা হয়েছে।

এই ব্যবস্থার আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রতিনিধিদল। ইসিআইনেট নির্বাচনী আইন ও বিধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখতে পরে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের কথাও নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।

চতুর্থ অভিযোগ, এসআইআরের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। নোটিসে এসআইআরকে “গণহারে ভোটাধিকার হরণের এক অভূতপূর্ব অভিযান” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

অভিযোগ, ভোটার হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণের অতিরিক্ত দায় চাপানো হয়েছে নাগরিকদের ওপর। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ এবং ভুলভাবে নাম বাদ পড়া ঠেকানোর সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই এই প্রক্রিয়া কার্যকর করা হয়েছে।

প্রতিনিধিদলের দাবি, এসআইআরের আগের ভোটার তালিকাগুলি থেকে ইতিমধ্যেই ১৩ কোটি ৩০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের অনুমান, প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা ও নথিভুক্ত ভোটারের সংখ্যার ব্যবধান ১৫ কোটি বা তারও বেশি হতে পারে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মহিলা, দরিদ্র মানুষ, পরিযায়ী, সংখ্যালঘু ও প্রবীণ ভোটাররা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

পঞ্চম অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের আচরণ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিনিধিদলের মতে, তাঁর আচরণে রাজনৈতিক পক্ষপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নোটিসে বিরোধী নেতাদের নিয়ে তাঁর কথিত প্রকাশ্য বক্তব্য ও হস্তক্ষেপ এবং “আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক বাগ্‌ভঙ্গি”-র উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলিকেও যুক্ত করেছে প্রতিনিধিদল।

নোটিসে বলা হয়েছে, “যে খেলায় ব্যাপকভাবে মনে করা হচ্ছে আপনি কোনও এক খেলোয়াড়ের পক্ষে রয়েছেন, সেখানে আপনি আর রেফারির ভূমিকা পালন করতে পারেন না।”

ষষ্ঠ অভিযোগ, আইননির্ধারিত কর্তব্য লঙ্ঘন। এ ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩২(১) ধারার উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিনিধিদলের অভিযোগ, নির্বাচনী ফর্মে পরিবর্তন, ভোটার নিবন্ধন আধিকারিকদের পাশ কাটানো, ইসিআইনেটের ব্যবহার, নথিপত্র গোপন করা এবং জানা অনিয়মের প্রতিকার না করার ঘটনাগুলি প্রাথমিকভাবে সরকারি দায়িত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘনের একটি ধারাবাহিক প্রবণতা নির্দেশ করে।

নোটিসে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন দিল্লির প্রাক্তন উপরাজ্যপাল নজীব জং, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাই, ভারত সরকারের প্রাক্তন সচিব অমিতাভ পাণ্ডে, অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক জয়শ্রী মুখোপাধ্যায়, অবসরপ্রাপ্ত আইএফএস আধিকারিক অশোক শর্মা, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনার যশোবর্ধন আজাদ এবং প্রাক্তন আমলা আশিস জোশী।

স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় আরও রয়েছেন ঐশী ঘোষ, এন সাই বালাজি, দিনেশ শ্রীরঙ্গরাজন, সন্দীপ যাদব, অমৃতা জোহরি, অঞ্জলি ভরদ্বাজ এবং যোগেন্দ্র যাদব।

প্রতিনিধিদলের সিদ্ধান্ত, অভিযোগে উল্লিখিত কাজগুলি সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “প্রমাণিত অসদাচরণ”-এর পর্যায়ে পড়ে। তাদের দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে বহাল থাকার “নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার” হারিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার।

এই অভিযোগগুলি প্রতিনিধিদলের জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে রয়েছে। অভিযোগ তোলা হয়েছে বলেই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়।