International

হুতিদের চাপে সৌদি-আমিরশাহি

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ইয়েমেনে সামরিক জোট গড়তে পুরনো বিরোধ মেটানোর তাগিদ রিয়াধের উপর ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রগতি ঠেকাতে কার্যকর সামরিক জোট গড়তে হলে পুরনো বিরোধ মেটাতেই হবে সৌদি…
  • সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ভুলে আবুধাবির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছনোর জন্য রিয়াধের উপর চাপ বাড়ছে।
  • হুতিদের মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বাহিনী ও সামরিক কাঠামো গড়ে তোলার বিনিময়ে দক্ষিণ ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমিরশাহির সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে সৌদি নেতৃত্বকে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ইয়েমেনে সামরিক জোট গড়তে পুরনো বিরোধ মেটানোর তাগিদ রিয়াধের উপর

ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রগতি ঠেকাতে কার্যকর সামরিক জোট গড়তে হলে পুরনো বিরোধ মেটাতেই হবে সৌদি আরবকে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ভুলে আবুধাবির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছনোর জন্য রিয়াধের উপর চাপ বাড়ছে। হুতিদের মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বাহিনী ও সামরিক কাঠামো গড়ে তোলার বিনিময়ে দক্ষিণ ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমিরশাহির সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে সৌদি নেতৃত্বকে।

ইয়েমেনে হুতিবিরোধী বাহিনীগুলিকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করেছে সৌদি আরব ও আমিরশাহি—দুই দেশই। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেই সম্পর্কে বড়সড় ফাটল ধরে। আমিরশাহির ঘনিষ্ঠ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এসটিসি দক্ষিণ ইয়েমেনে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করলে তা ঠেকাতে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ করে সৌদি আরব। এসটিসির বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে তাদের পরাজিত করে রিয়াধ। এরপর কার্যত ইয়েমেন থেকে সরে যায় আবুধাবি।

কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হুতিদের নতুন অগ্রগতি পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। সরকারপন্থী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ইরানঘনিষ্ঠ হুতি যোদ্ধারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে এগিয়ে যায়। দক্ষিণমুখী এই অভিযানে পরাজিত হয় তারেক সালেহের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস। একসময় আমিরশাহির সমর্থন পাওয়া এই বাহিনীর প্রতিরোধ দ্রুত ভেঙে পড়ে।

ফলে ইয়েমেনে আমিরশাহির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রবিবার আবুধাবিতে এই নিয়ে একটি বৈঠকে বসেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং সৌদি আরব-সহ কয়েকটি আরব দেশের প্রতিনিধিরা।

খবর অনুযায়ী, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন নেতানিয়াহু। রিয়াধ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য সামরিক সহযোগিতা সৌদি আরবের পক্ষে রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এরই মধ্যে ইয়েমেনে মার্কিন সাহায্য চেয়ে সৌদির আবেদনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাড়া দেননি।

মঙ্গলবার রিয়াধে ইয়েমেন নিয়ে আরও একটি বৈঠক হয়। সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সলমন আল সৌদ এবং আমিরশাহির উপরাষ্ট্রপতি শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সেখানে আলোচনা করেন। দুই দেশের সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা অন্তত কিছু ক্ষেত্রে শুরু হয়েছে—এমন ইঙ্গিতও মিলছে।

এর মধ্যে হুতিরা দখল করা এলাকাগুলিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চাইছে। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজ। বাব আল-মান্দাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার পর তাইজের উপর একের পর এক হামলা চালাচ্ছে তারা।

প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রুসির উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ বারা শিবান সদ্য তাইজে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ফিরেছেন। তাঁর বক্তব্য, হুতিরা শহরের প্রতিরক্ষা ভাঙতে বার বার আক্রমণের ঢেউ তুলছে।

“হুতি বাহিনী একই সঙ্গে একের পর এক আক্রমণের ঢেউ নামাচ্ছে শহরের ওপর। তাদের লক্ষ্য, শহরের প্রতিরক্ষায় থাকা তাইজ অ্যাক্সিস বাহিনীকে ক্লান্ত করে দেওয়া,” বলেন শিবান। তাঁর মতে, হুতিদের এক জায়গা থেকে পিছিয়ে দেওয়া হলেও পরের দিনই তারা অন্য একটি রণাঙ্গন দিয়ে ফিরে আসছে।

শিবানের মতে, সৌদি আরব ও আমিরশাহির মধ্যে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা চলছে এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। তবে আমিরশাহি আবার ইয়েমেনে আগের ভূমিকায় ফিরবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

“আমিরশাহি ইয়েমেন ছেড়ে চলে গিয়েছে। রিয়াধ তাদের আবার ফিরতে দেবে, এমন সম্ভাবনা কম। কারণ, তারা এসটিসির সঙ্গে রয়েছে। আমিরশাহি ও সৌদি আরব মৌলিক ভাবে বিপরীত দুই অবস্থানে রয়েছে,” বলেন তিনি।

এসটিসির উপর সৌদি হামলার পর সংগঠনের নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি নির্বাসনে চলে যান। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও সংগঠনটি অনেকটাই প্রান্তিক হয়ে পড়ে। কিন্তু দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির সঙ্গে যুক্ত বাহিনীগুলিই এখন হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইয়েমেনের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী এবং এসটিসি-সমর্থক খালেদ আল-ইয়েমানি গার্ডিয়ান-কে বলেন, দক্ষিণ ইয়েমেনের প্রশ্নে সৌদি আরবকে নিজেদের অবস্থান নতুন করে ভাবতে হতে পারে। কারণ, হুতিদের বিরুদ্ধে ময়দানে থাকা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সুসজ্জিত বাহিনীগুলির অন্যতম জায়ান্ট ব্রিগেডস। আমিরশাহির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষিণের এই বাহিনী একসময় এসটিসির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

এসটিসি অবশ্য জায়ান্ট ব্রিগেডসকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে মিশে যেতে নিষেধ করেছে। তাদের যুক্তি, এমন সংযুক্তি ঘটলে দক্ষিণ ইয়েমেনকে পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য আরও পিছিয়ে যাবে।

“আমাদের স্বাধীনতার কোনও সম্ভাবনা সামনে না থাকলে আমরা উত্তরে গিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি না,” বলেন আল-ইয়েমানি।

তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রপুঞ্জ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার রিয়াধে নির্বাসিত অবস্থায় কাজ করছে এবং দক্ষিণের মানুষকে রাজধানী সানা পুনর্দখলের জন্য লড়তে বলছে। কিন্তু দক্ষিণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কোনও নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

আল-ইয়েমানির মতে, “ইয়েমেনের সরকার যত দিন নিজের দেশের মানুষের বদলে সৌদি অর্থদাতাদের কাছ থেকে বৈধতা পাবে, তত দিন সৌদি আরবের ঘোষিত লক্ষ্য—নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তে নিরাপত্তা—অর্জিত হবে না।”

অন্য দিকে, হুতিদের অগ্রগতি রুখতে পর্দার আড়ালে সৌদি আরব ও আমিরশাহিকে মতপার্থক্য মেটানোর জন্য চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। আলোচনায় উঠে এসেছে দক্ষিণের জায়ান্ট ব্রিগেডসকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ঐক্যবদ্ধ সামরিক কমান্ড গড়ে তোলার প্রস্তাব। পাশাপাশি ইজরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার এবং ইজরায়েলের বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে কাজে লাগানোর কথাও উঠেছে। অতীতে ইয়েমেনে আমিরশাহি এমন সংস্থা ব্যবহার করেছে, যার কিছু অভিযানের পর নৃশংসতার অভিযোগও উঠেছিল।

কিন্তু এখানেও সৌদি আরবের সামনে দ্বৈত সমস্যা। ইজরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করছে—এমন বার্তা দিতে চায় না রিয়াধ। আবার দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরও সরাসরি সমর্থন করতে নারাজ তারা। কারণ, ইয়েমেন ভাগ হয়ে গেলে সৌদি সীমান্ত লাগোয়া উত্তর ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হতে পারে।

হুতিরা অতীতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদির জ্বালানি স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে। ফলে সীমান্তের নিরাপত্তা রিয়াধের কাছে শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়, সরাসরি নিরাপত্তার বিষয়ও।

সৌদি বিমানবাহিনীর সুরক্ষা ও সহায়তা সত্ত্বেও হুতিদের অগ্রগতি থামানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাষ্ট্রপুঞ্জ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সংসদ হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য দেশের জনগণকে সর্বাত্মক ভাবে সংগঠিত করার অনুমোদন দিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ৬ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হওয়ার ঘটনায় ৮৩৮ জন নিহত এবং ৩,৬৪৩ জন আহত হয়েছেন।

হুতিদের দাবি, বাব আল-মান্দাব দিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করা তাদের লক্ষ্য নয়। তাদের নিশানা মূলত সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজ। সোমবার প্রকাশিত কিছু পরিসংখ্যান দেখিয়ে তারা দাবি করেছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

হুতিদের বক্তব্য, সৌদি আরব কার্যত ইয়েমেনে একটি ঔপনিবেশিক শক্তির ভূমিকা পালন করছে। তাদের দাবি, এডেনভিত্তিক রাষ্ট্রপুঞ্জ-স্বীকৃত সরকারও রিয়াধের তৈরি এবং স্বাধীন ভাবে দেশ শাসনের ক্ষমতা তার নেই।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এপ্রিল লংলি অ্যালি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক আলোচনায় বলেন, সৌদি আরবের কাছে এই সংঘাত অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু হুতিরা সহজে আপসের পথে হাঁটছে না।

তাঁর কথায়, হুতিরা দখল করা এলাকাগুলি ধরে রাখতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার। তবে ইরানের সঙ্গে সংঘাত থেকে তারা যে শিক্ষা পেয়েছে, তা হল—চাপ ও হামলার মুখে সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত সংঘাত কমানোর পথ খোঁজে।

আর সেই কারণেই, তাঁর মতে, হুতিরা এখন “বিজয়ীর শর্তে শান্তি” চাইছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles