বাংলাস্ফিয়ার: প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে সমাবর্তনের প্রধান অতিথি করার বিরোধিতা করেছিলেন হায়দ্রাবাদের নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের পড়ুয়া। তার জেরে ২০২৬ সালে উত্তীর্ণ গোটা শিক্ষাবর্ষের পড়ুয়াদের আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্তি বন্ধ করে দিয়েছিল বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া। নজিরবিহীন সেই নির্দেশ ঘিরে আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজে প্রবল সমালোচনা শুরু হতেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অবস্থান বদল করল দেশের আইন পেশার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। নতুন নির্দেশে জানানো হয়েছে, নালসারের প্রত্যেক উত্তীর্ণ পড়ুয়া নিজের পছন্দের রাজ্য বার কাউন্সিলে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন।

বিতর্কের সূত্রপাত নালসারের আসন্ন সমাবর্তনকে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১,৪০০ পড়ুয়ার মধ্যে প্রায় ৪৫০ জন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানানোর বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের পড়ুয়ারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অন্তত ছ’টি পৃথক আবেদন জমা দিয়ে আমন্ত্রণ পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়—সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও বিচারপ্রাপ্তির অধিকার নিয়ে উদ্বেগ থেকেই এই আপত্তি।

পড়ুয়াদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল দিল্লিতে নিট-বিরোধী আন্দোলনকারীদের উপর কথিত পুলিশি অত্যাচার সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি। আবেদনকারীর আইনজীবী পুলিশি অভিযানের ভিডিয়ো দেখাতে চাইলে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, “আমাদের সময় নষ্ট করবেন না। এই ভিডিয়ো দেখার সময় আমাদের নেই।” পড়ুয়াদের দাবি, সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যবোধের প্রতিফলন; সেখানে এমন এক বিচারপতিকে প্রধান অতিথি করা উচিত কি না, তা কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা প্রয়োজন।

এই শান্তিপূর্ণ আপত্তিকেই বার কাউন্সিল প্রথম নির্দেশে ‘সংগঠিত প্রচার’ হিসাবে বর্ণনা করে। নালসারের উপাচার্য শ্রীকৃষ্ণ দেব রাওকে তিন দিনের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কারা আবেদন তৈরি করেছেন, স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন, প্রচার সংগঠিত করেছেন, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন অথবা অনলাইন গোষ্ঠী পরিচালনা করেছেন—তাঁদের নামও জানতে চাওয়া হয়।

একই সঙ্গে সব রাজ্য বার কাউন্সিলকে নির্দেশ দেওয়া হয়, পরবর্তী আদেশ না-আসা পর্যন্ত ২০২৬ সালে নালসার থেকে আইন পাশ করা কোনও পড়ুয়াকেই আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্ত করা যাবে না। বার কাউন্সিলের বক্তব্য ছিল, দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক পদটির প্রতি সম্মান না-থাকলে কোনও আইনের পড়ুয়ার দায়িত্বশীল আইনজীবী, শিক্ষক কিংবা বিচারক হওয়া সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন শিক্ষক ‘দলাদলি ও নোংরা রাজনীতি’র মাধ্যমে পড়ুয়াদের বিভ্রান্ত করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।

আদেশটি প্রকাশ্যে আসার পরেই প্রশ্ন ওঠে, ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ না-করে একটি সম্পূর্ণ শিক্ষাবর্ষকে শাস্তি দেওয়া যায় কি না। গুয়াহাটি হাই কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি তথা প্রবীণ আইনজীবী মৃণালকুমার চৌধুরী একে এক্তিয়ার-বহির্ভূত ও স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, অভিযুক্তদের বক্তব্য না-শুনেই তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

প্রবীণ আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে বলেন, এটি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার। কোনও শিক্ষাবর্ষের সব পড়ুয়ার বিরুদ্ধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া বা যৌথ শাস্তি চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার বার কাউন্সিলের নেই। নালসারের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক জি মোহন গোপালও বলেন, প্রধান বিচারপতির প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা সম্মান করা প্রয়োজন; একই সঙ্গে অন্যায় মনে হলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো পড়ুয়াদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বার কাউন্সিলের হস্তক্ষেপকে তিনি মাত্রাতিরিক্ত ও ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেন।

সমালোচনার মুখে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তি জারি করেন বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মাননকুমার মিশ্র। সেখানে বলা হয়, আলোচনার পরে সদস্যরা সর্বসম্মত ভাবে মনে করেছেন, নালসারের ২০২৬ সালের অধিকাংশ উত্তীর্ণই নির্দোষ এবং ‘অসম্মানজনক’ অভিযানে যোগ দিতে চাননি। ফলে নথিভুক্তির উপর সার্বিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। “নিজের কোনও দোষ না-থাকলে একজন পড়ুয়াকেও ভুগতে দেওয়া হবে না”—বিজ্ঞপ্তিতে জানায় কাউন্সিল।

তবে দ্বিতীয় নির্দেশেও কয়েক জন শিক্ষক ও বহিরাগত পড়ুয়াদের প্ররোচিত করেছেন বলে অভিযোগ রাখা হয়েছিল। উপাচার্যের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরে পরবর্তী পদক্ষেপের কথাও বলা হয়। পরে আইনজীবী, আইন পড়ুয়া ও নাগরিকদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে তদন্ত-প্রক্রিয়াটিও বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানান বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান।

গোটা ঘটনা শেষ পর্যন্ত কেবল নালসারের সমাবর্তন-বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করার অধিকার, শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীনতা এবং পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতার সীমা—এই তিনটি মৌলিক প্রশ্নকেই তা সামনে এনে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেল: ভবিষ্যতের আইনজীবীরা যদি বিচারব্যবস্থার কোনও সিদ্ধান্ত বা আচরণের সমালোচনা করেন, তবে সেটি কি অসদাচরণ, নাকি সংবিধানসচেতন নাগরিকের স্বাভাবিক অধিকার?