গ্রেট নিকোবর মামলার শুনানি থামাতে সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র

যা জানা জরুরি
- গ্রেট নিকোবর দ্বীপের বিতর্কিত উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে চলা মামলাগুলির শুনানি স্থগিত করতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে কেন্দ্র।
- প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের জন্য সম্মতি সংগ্রহে বনাধিকার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
- আবেদনকারী মীনা গুপ্তের মামলা করার আইনি অধিকার বা ‘লোকাস স্ট্যান্ডাই’ নেই বলে ফের দাবি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
গ্রেট নিকোবর দ্বীপের বিতর্কিত উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে চলা মামলাগুলির শুনানি স্থগিত করতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে কেন্দ্র। প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের জন্য সম্মতি সংগ্রহে বনাধিকার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। আবেদনকারী মীনা গুপ্তের মামলা করার আইনি অধিকার বা ‘লোকাস স্ট্যান্ডাই’ নেই বলে ফের দাবি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক বিশেষ অনুমতি আবেদনে হাই কোর্টের আগের নির্দেশ এবং পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ চেয়েছে। কেন্দ্রের বক্তব্য, এই মামলাগুলি বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার। কোনও ব্যক্তির উত্থাপিত দাবির কারণে দেশের উন্নয়ন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তবে স্থগিতাদেশ চাওয়া এবং আদালতের তা মঞ্জুর করা পৃথক বিষয়।
চলতি বছরের ৬ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের বেঞ্চ কেন্দ্রের প্রাথমিক আপত্তি খারিজ করেছিল। হাই কোর্টের পোর্ট ব্লেয়ার সার্কিট বেঞ্চ জানায়, বিপুল ব্যয় বা জাতীয় গুরুত্ব কোনও প্রকল্পকে বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার বাইরে রাখে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট আইন মানতেই হবে।
সুপ্রিম কোর্টের নথি অনুযায়ী, কেন্দ্রের আবেদন জমা পড়েছে ২৪ জুলাই। অন্যদিকে, হাই কোর্টের নথিতে দেখা যাচ্ছে, ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্র মামলাগুলির চূড়ান্ত শুনানি ২৫ ও ২৬ নভেম্বর নির্ধারণে সম্মতি জানিয়েছিল। ফলে শুনানির দিন নির্ধারণে সম্মতি দেওয়ার পাশাপাশি সেই বিচারপ্রক্রিয়া স্থগিত করার আবেদনও সর্বোচ্চ আদালতে রয়েছে।
মীনা গুপ্ত প্রাক্তন আইএএস আধিকারিক। কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের সচিব হিসেবে অবসর নেওয়ার আগে তিনি আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রকের সচিবও ছিলেন। বনাধিকার আইন তৈরির প্রক্রিয়ায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। দ্বীপপুঞ্জে জীবনের কয়েকটি বছর কাটানোর অভিজ্ঞতা এবং আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘ কাজের সূত্রও আদালতের বিবেচনায় এসেছে। তাঁর আবেদন মূলত শোমপেন ও নিকোবরি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার প্রশ্নে।
হাই কোর্টের যুক্তি, দারিদ্র্য, অসহায়তা কিংবা সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে কোনও জনগোষ্ঠী নিজেরা আদালতে পৌঁছতে না পারলে জনস্বার্থে অন্য নাগরিক তাদের হয়ে প্রতিকার চাইতে পারেন। মীনা গুপ্ত হায়দরাবাদের বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট আদিবাসীদের অনুমতিপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নন—কেন্দ্রের এই আপত্তি তাই গ্রহণ করেনি আদালত। তাঁর অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা করে মামলায় যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে বলে জানিয়েছে বেঞ্চ।
মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ, বনভূমির ব্যবহার বদলের সম্মতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়ার সময় আদিবাসীদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি। গ্রামসভার সিদ্ধান্ত ও মহকুমা স্তরের কমিটির অনুমোদনের বৈধতা প্রশ্নের মুখে। আবেদনকারীর বক্তব্য, দ্বীপের অরণ্য এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য, জীবিকা, সংস্কৃতি ও বসবাসের ভিত্তি; ফলে তাদের অধিকার যাচাই ছাড়া উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া যায় না।
সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে আন্তর্জাতিক কন্টেনার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নগরাঞ্চল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট এলাকা ১৬৬.১০ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে ১৩০.৭৫ বর্গকিলোমিটার বনভূমি। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথের কাছে অবস্থানের কারণে প্রকল্পটি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াবে বলে কেন্দ্রের দাবি।
পরিবেশগত উদ্বেগের জবাবে সরকারের বক্তব্য, প্রকল্পে একাধিক সুরক্ষাশর্ত রয়েছে; শোমপেন ও নিকোবরিদের স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেই। আদিবাসী কল্যাণ ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়গুলি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পরিবেশ ছাড়পত্রে বায়ু, জল, বর্জ্য, সামুদ্রিক পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও বিপর্যয় মোকাবিলা সংক্রান্ত ৪২টি নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র। নির্মাণ এবং প্রকল্প চালুর পর্যায়ে নজরদারির কথাও সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে। তবে এই সরকারি আশ্বাসের পাশাপাশি সম্মতি সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং আইন মানার প্রশ্নেই বিচার চেয়েছেন আবেদনকারী।
মে মাসের নির্দেশে হাই কোর্ট মামলাগুলির গ্রহণযোগ্যতা স্বীকার করেছিল; প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেনি। এখন কেন্দ্রের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাই কোর্টের নির্ধারিত শুনানি এগোতে পারবে কি না, সেটিই পরবর্তী প্রশ্ন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



