এআইয়ে পাহারা, চাবি নিজের হাতে

যা জানা জরুরি
- ট্রাম্পের ‘নৈতিক চুক্তি’তে সরকারি নজরদারি নেই, ভরসা প্রযুক্তি সংস্থার নিজেদের ব্যবস্থাতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগাম টানতে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নয়, আপাতত ভরসা তাদের…
- মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে আমেরিকার শীর্ষ প্রযুক্তিকর্তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের পর এমনই এক ‘নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক’ চুক্তির ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
- নাম—‘জয়েন্ট কমিটমেন্ট অন ফ্রন্টিয়ার রেসপনসিবিলিটিজ’, অর্থাৎ অগ্রসর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দায়িত্বপালনের যৌথ অঙ্গীকার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ট্রাম্পের ‘নৈতিক চুক্তি’তে সরকারি নজরদারি নেই, ভরসা প্রযুক্তি সংস্থার নিজেদের ব্যবস্থাতেই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগাম টানতে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নয়, আপাতত ভরসা তাদের নিজেদের উপরই। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে আমেরিকার শীর্ষ প্রযুক্তিকর্তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের পর এমনই এক ‘নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক’ চুক্তির ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নাম—‘জয়েন্ট কমিটমেন্ট অন ফ্রন্টিয়ার রেসপনসিবিলিটিজ’, অর্থাৎ অগ্রসর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দায়িত্বপালনের যৌথ অঙ্গীকার।
ট্রাম্পের কথায়, “এক অর্থে এটা প্রায় একটা সংবিধানের মতো।” তাঁর দাবি, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিকর্তারা এই চুক্তিতে সই করেছেন, তিনিও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাতে সই করেছেন। তাঁর ভাষায়, এটি “এক ধরনের সুরক্ষা”।
কিন্তু সেই সুরক্ষার পাহারাদার কে? প্রশ্নটা উঠছে সেখানেই। কারণ চুক্তিতে সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনও প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। বরং এআই সংস্থাগুলিই নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করবে, নিজেদের মূল্যায়নকারী বেছে নেবে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই ঠিক করবে সেই মূল্যায়নের ফল কতটা প্রকাশ করা হবে।
এরই মধ্যে এআই নিয়ে সরকারি পরিভাষাতেও বদল আনলেন ট্রাম্প। একটি নির্বাহী আদেশে ‘Artificial Intelligence’ বা ‘AI’-এর বদলে সরকারি নথিতে ‘Super Intelligence’ বা ‘SI’ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপুঞ্জেও একই ধরনের ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
আদেশে বলা হয়েছে, নির্বাহী বিভাগের সমস্ত দফতর ও সংস্থাকে সরকারি চিঠিপত্র, জনসাধারণের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্য, নীতিসংক্রান্ত নথি এবং বিধিবদ্ধ নয় এমন নথিতে ‘Super Intelligence’ ও ‘SI’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে হবে। ‘Artificial Intelligence’ বা ‘AI’ শব্দবন্ধকে আর সরকারি ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
ট্রাম্পের ঘোষণা করা যৌথ অঙ্গীকারে এআই সংস্থাগুলির জন্য চার স্তরের নিরাপত্তা ও নিরীক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। প্রথম স্তরে রয়েছে মডেল প্রশিক্ষণের সময় সংস্থার নিজস্ব নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ। বড় এআই গবেষণাগারগুলিতে এমন ব্যবস্থা অবশ্য নতুন নয়। কিন্তু সেই ব্যবস্থার উপস্থিতি সত্ত্বেও পরীক্ষার সময় অনিচ্ছাকৃত ভাবে বাইরের কম্পিউটার ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ার মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
দ্বিতীয় স্তরে সংস্থার ভিতরের একটি দল প্রথম স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা দেখবে। তৃতীয় স্তরে বাইরের একজন স্বাধীন নিরীক্ষককে নিরাপত্তাব্যবস্থা মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। আর চতুর্থ স্তরে সেই মূল্যায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন পর্ষদ নির্দিষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।
শুনতে একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা মনে হলেও, প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে নজরদারির স্বাধীনতা নিয়েই। চুক্তিতে কোনও সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নেই। স্বাধীন মূল্যায়নে কী উঠে এল, তার বিস্তারিত রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
অর্থাৎ, সংস্থাগুলিই নিজেদের মূল্যায়নকারী বেছে নেবে, নিজেদের তদারকি পর্ষদ নিয়োগ করবে এবং মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তও অনেকটাই তাদের হাতেই থাকবে।
এমন পরিস্থিতিতে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে আসছে। আইনপ্রণেতা, গবেষক এবং এমনকি কিছু এআই সংস্থাও প্রযুক্তিটির উপর সরকারি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। অন্য দিকে, চিনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন তুলনামূলক কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করে এসেছে।
মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে যৌথ অঙ্গীকারের নথি প্রকাশ করেন ট্রাম্প। নথিতে আইনি বাধ্যবাধকতা বা অঙ্গীকার ভঙ্গের ক্ষেত্রে শাস্তির নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। ফলে আপাতত এটি মূলত স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতিই।
প্রযুক্তিশিল্পের শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে ছিলেন স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক, মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ, এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই-সহ আরও অনেকে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে প্রযুক্তিশিল্পের বড় অংশের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও ইতিমধ্যে আলোচনা হয়েছে। কঠোর নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে বাধা দেবে—এই যুক্তিতে নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেও তদবির করেছে শিল্পের একাংশ।
মধ্যাহ্নভোজের পর সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্পের পাশে বসেই চুক্তি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন জাকারবার্গ। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকার মানুষকে তাঁদের প্রযুক্তির উপর আস্থা রাখা যায়—এই বার্তাই দিতে চায় এই অঙ্গীকার।
জাকারবার্গের কথায়, “এটা একটা সূচনা।” তাঁর মতে, গোটা প্রযুক্তিশিল্পকে এক জায়গায় এনে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছনোই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



