আর্সেন ওয়েঙ্গার ও আর্সেনাল: ইংরেজ ফুটবল বদলে দেওয়া এক নিয়োগের তিরিশ বছর

যা জানা জরুরি
- প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাপারটা যে খুব সুবিধের হল না, তা হয়তো ডেভিড ডিনের মতো নিরন্তর আশাবাদী মানুষও মেনে নিতেন।
- ম্যানেজার নিয়োগে তাঁর সাহসী সিদ্ধান্ত শুনে প্রতিক্রিয়াটা হয়েছিল ঠিক তেমনই।
- তিরিশ বছর আগে আর্সেনাল তখন এক বিশৃঙ্খল পালাবদলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাপারটা যে খুব সুবিধের হল না, তা হয়তো ডেভিড ডিনের মতো নিরন্তর আশাবাদী মানুষও মেনে নিতেন। ম্যানেজার নিয়োগে তাঁর সাহসী সিদ্ধান্ত শুনে প্রতিক্রিয়াটা হয়েছিল ঠিক তেমনই। তিরিশ বছর আগে আর্সেনাল তখন এক বিশৃঙ্খল পালাবদলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ব্রুস রিওককে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী দায়িত্বে স্টুয়ার্ট হিউস্টন ও প্যাট রাইস। ইয়োহান ক্রুয়েফ আসতে পারেন বলে আলোচনা চলছে। খবরের এই শূন্যতা কাটাতে চেয়েছিলেন ডিন। দলের ফুটবলারদের ডেকে তিনি আশ্বাস দিলেন, খুব শিগগির নতুন ম্যানেজার নিয়োগ করা হবে। যিনি আসছেন, তিনি বিশ্বমানের।
ক্লাবের ভাইস-চেয়ারম্যান ডিন উজ্জ্বল মুখে ঘোষণা করলেন, “তাঁর নাম আর্সেন ওয়েঙ্গার।” মুহূর্তের নীরবতা। তার পর এক ফুটবলারের গলা ভেসে এল, “এই শালাটা আবার কে?” তাঁর বিস্ময়ই ছিল সে সময়ের চালু ধারণার প্রতিধ্বনি। ১৯৯৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ওয়েঙ্গারের নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার আগে দ্য লন্ডন ইভনিং স্ট্যান্ডার্ডের বহুল আলোচিত প্রচারফলকে লেখা হয়েছিল, “আর্সেন কে?”
শেষ পর্যন্ত ডিনের সেই সিদ্ধান্তই সম্ভবত আধুনিক ইংরেজ ফুটবলের ইতিহাসে ম্যানেজার নিয়োগের সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা হয়ে উঠেছিল। এ দেশে কোনও বিদেশি ম্যানেজারও যে সফল হতে পারেন, শুধু তার প্রমাণই মেলেনি; সূচনা হয়েছিল বহুসংস্কৃতির এমন এক যুগের, যেখান থেকে আর পিছনে ফেরার পথ ছিল না। জন্ম নিয়েছিল আজকের পরিচিত বিশ্বায়িত প্রিমিয়ার লিগ। দায়িত্ব নিয়ে যে আর্সেনাল ড্রেসিংরুম তিনি পেয়েছিলেন, তাকে ওয়েঙ্গার বলেছিলেন “সংস্কৃতির দিক থেকে ইংরেজ”। নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে প্রথম দিকেই নিয়ে এলেন তখনও বিশেষ পরিচিতি না-পাওয়া দুই ফরাসিকে—প্যাট্রিক ভিয়েরা ও রেমি গার্দকে। ২০১৮ সালে তিনি যখন দায়িত্ব ছাড়লেন, তখন প্রিমিয়ার লিগের প্রতিটি ড্রেসিংরুমই যেন এক-একটি রাষ্ট্রপুঞ্জ।
তিনিই পথ দেখিয়েছিলেন। লিভারপুলে জেরার উলিয়ে ও রাফায়েল বেনিতেসের আগে এসেছিলেন তিনি। চেলসিতে জোসে মোরিনিয়োরও আগে—পরস্পরের প্রতি তাঁদের বিদ্বেষ মনে রাখলে বিষয়টি বেশ পরিহাসের। এঁরা প্রত্যেকেই ওয়েঙ্গারের সাফল্যের সুফল পেয়েছিলেন। উল্টো দিকে, ওয়েঙ্গার না থাকলে ক্রিস্টিয়ান গ্রস ও জাক সান্তিনিকে নিয়ে টটেনহ্যামের অবিবেচক পরীক্ষানিরীক্ষাও হয়তো কখনও হত না।
নিঃসন্দেহে ঠিক সময়ে ঠিক মানুষটিই এসেছিলেন। রুড গুলিটকে নিয়োগ করে চেলসি ইতিমধ্যেই ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের ফুটবলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। ওয়েঙ্গারের আগমনও মিলে গিয়েছিল সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে। টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অভিবাসনের একটি ঢেউ আসছে—পোল্যান্ডের কলমিস্ত্রি থেকে ফরাসি ফুটবলার, সকলেরই। পাশাপাশি, স্কাই টিভির অর্থ ইংল্যান্ডকে ফুটবলারদের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের দেশে পরিণত করছিল।
ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ডিভিশনে প্রথম এমন ম্যানেজার, যিনি ব্রিটিশও নন, আইরিশও নন, ছিলেন ডক্টর জোজেফ ভেংলোশ। ১৯৯০ সালে অ্যাস্টন ভিলা তাঁকে নিয়োগ করেছিল। ইংরেজ ফুটবলের পুরনো যাবতীয় সন্দেহের ছকে তিনি দিব্যি খাপ খেয়ে গিয়েছিলেন: বিদেশি, পণ্ডিত, খেয়ালি, রণকৌশল নিয়ে মাথা ঘামান। সংশয়বাদীদের তৃপ্তি দিয়ে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। ওয়েঙ্গারকেও মনে হয়েছিল সেই ভেংলোশের ছাঁচে গড়া। চশমা পরতেন, পাঁচটি ভাষায় কথা বলতেন বলে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘ল্য প্রফেসর’। তাঁর অধিনায়ক টনি অ্যাডামসের মনে হয়েছিল, লোকটি যেন “ভূগোলের শিক্ষক”। আর ইয়ান রাইট তাঁর আনকোরা, কিছুটা অপ্রস্তুত চলনবলন দেখে নাম দিয়েছিলেন ‘ক্লুজো’। বোমাতঙ্কের কথা বলে তাঁকে বোকা বানিয়ে খুব মজা পেয়েছিলেন রাইট। হতবুদ্ধি ওয়েঙ্গার প্রশ্ন করেছিলেন, “দেয়ার ইজ বাম?” তাঁর উচ্চারণ নিয়ে রাইটের সতীর্থদের মধ্যে যে হাসির রোল উঠেছে, তা তিনি বুঝতেই পারেননি।
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন বলেছিলেন, “আর্সেন ওয়েঙ্গার তো জাপানে ছিলেন। ইংল্যান্ডের ফুটবল সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।” সেখানেই পত্তন হয়েছিল এক দশক ধরে চলা সংঘাতের, যা ফার্গুসনের নিজের ভাষায় হয়ে উঠেছিল “বিষাক্ত”। অথচ ইংরেজ ফুটবলের পুরনো ধারার রক্ষকেরাও ওয়েঙ্গারের অবদানের ব্যাপকতা স্বীকার করেন। স্বভাবগত ভাবে তাঁর সঙ্গে বিশেষ মিল নেই এমন নিল ওয়ার্নকও বলেন, “ওয়েঙ্গার ইংরেজ ফুটবলের গোটা গতিপথটাই বদলে দিয়েছিলেন। দীর্ঘ দিন এই খেলায় থাকা মানুষদের তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে বদলাতে হবে। পুষ্টিবিজ্ঞানের এত কিছু আসছে, ফিটনেস বিশেষজ্ঞেরা আসছেন—সময়ের সঙ্গে না বদলালে পিছনে পড়ে গিয়ে পায়ের তলায় পিষে যেতে হবে।”
১৯৯৮ সালে প্রথম প্রিমিয়ার লিগ খেতাব নিশ্চিত করার মুহূর্তে ওয়েঙ্গারের দৃষ্টিনন্দন ফুটবলের আদর্শ যেন এক দৃশ্যে ধরা পড়েছিল। টোটাল ফুটবলের ছোঁয়ামাখা এক আক্রমণে চার ডিফেন্ডারের সারি ছেড়ে উঠে এলেন স্টিভ বোল্ড। তাঁর ভাসানো পাস পৌঁছল সামনে উঠে যাওয়া টনি অ্যাডামসের কাছে। নিখুঁত শটে গোল করলেন অ্যাডামস। এভার্টনকে ৪–০ গোলে হারাল আর্সেনাল। ধারাভাষ্যে হতবাক মার্টিন টাইলার বলে উঠলেন, “বিশ্বাস হয় এমনটা!” গোটা দেশের বিস্ময়ই যেন শোনা গেল তাঁর গলায়। “এই দৃশ্যটাই সব বলে দিচ্ছে।” যাঁকে একসময় গাধা বলে বিদ্রুপ করা হত, সেই অ্যাডামসই হয়ে উঠেছেন খাঁটি দৌড়ের ঘোড়া।
ওয়েঙ্গারের প্রতিভা ছিল তাঁর প্রথম দিকের দলে ইংরেজ ফুটবলারদের ভিতটি অক্ষুণ্ণ রাখার মধ্যে। তার সঙ্গে তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন ভিয়েরা, ইমানুয়েল পেতি ও মার্ক ওভারমার্সকে; ডেনিস বার্গক্যাম্পকে দিয়েছিলেন বিকশিত হওয়ার অবকাশ। আর্সেনালের সেই কিংবদন্তি চার ডিফেন্ডারের এক জন, নাইজেল উইন্টারবার্ন বলেছিলেন, “শোনা যেত, তাঁকে ওই চার ডিফেন্ডারকে সরিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের খেলা, অনুশীলন আর তাগিদ দেখার পরে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছিলেন।” পরে এলেন থিয়েরি অঁরি, রবার পিরেস ও ফ্রেডি লিউংবার্গ। তাঁদের হাত ধরে আরও উঁচুতে উঠল দল—জন্ম নিল ‘দ্য ইনভিনসিবলস’, সেই অপরাজেয় আর্সেনাল।
ক্রীড়াবিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দিলেন ডক্টর ইয়ান রুজিয়ে। তখন দাপুটে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দায়িত্বে ফার্গুসন। তাঁর সাফল্যকে চ্যালেঞ্জ জানানো নতুন পদ্ধতিগুলিকে তিনি সহজাত ভাবেই সন্দেহ করতেন। ইংল্যান্ডের ম্যানেজার গ্লেন হডল মোনাকোয় ওয়েঙ্গারের অধীনে খেলে তাঁর শিক্ষা পেয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে হডল রুজিয়ের সাহায্য নিলেন। ইউনাইটেডের ফুটবলারেরা ফিরে এসে তাঁর পুষ্টিবিষয়ক পদ্ধতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেই ফার্গুসন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তদন্ত দাবি করলেন তিনি। অথচ সেই সব ব্যবস্থার অধিকাংশই আজ নিতান্ত স্বাভাবিক বলে গণ্য হবে—যেমন খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে ক্রিয়েটিন ব্যবহার।
আর্সেনালে চকোলেট নিষিদ্ধ করার ঘটনাটি তো বিখ্যাতই। কিন্তু উইন্টারবার্ন জানিয়েছিলেন, ম্যানেজারের কড়াকড়ি সবসময় মেনে চলা হত না। “আমরা অপেক্ষা করতাম, কখন আর্সেন হেঁটে দূরে চলে যাবেন। তার পর বেশির ভাগ ফুটবলার ছোট্ট দোকানটায় ভিড় জমাতাম। চকোলেট কিনে টেবিলের তলায় লুকিয়ে মার্স বার খেতাম।” পরে ‘এভিয়ান-ব্রকোলি’ খাদ্যতালিকা নামে পরিচিত হয়ে ওঠা সেই ব্যবস্থা চালু হল এমন সময়ে, যখন অ্যাডামস সবে প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন যে তিনি মদাসক্ত। ব্রিটিশ ফুটবলে তখন ম্যাচের পরে ল্যাগার বিয়ার পান করাই ছিল দস্তুর। কেরিয়ারের শেষ পর্বে তাঁর আমূল বদলে যাওয়ার কৃতিত্ব অ্যাডামস দিয়েছিলেন ওয়েঙ্গারের পুষ্টিবিধি এবং নিজের সম্পূর্ণ মদ ছেড়ে দেওয়াকে। ইংল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় ফুটবলারদের মধ্যে মদ্যপান থেকে দূরে থাকা এখন আর কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়।
শরীরচর্চা নিয়ে ওয়েঙ্গারের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হডলকেও বদলে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “তুলনায় আমরা ইংল্যান্ডে অন্ধকার যুগে পড়ে ছিলাম। টটেনহ্যামে কখনও মাসাজ করাইনি, অনুশীলনের শেষে শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর ব্যায়ামও করিনি। আমার শরীর আরও নমনীয় হয়ে উঠল। অল্প দিনেই আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি ফিট হয়ে গেলাম।” ওয়েঙ্গার নিয়োগ করেছিলেন ফরাসি অস্থি-পেশির চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ফিলিপ বোয়াক্সেলকে। ইংরেজ মনোবিজ্ঞানী ডেভিড এলিয়টের সাহায্যও নিয়েছিলেন। পারফরম্যান্স বিশ্লেষণে পরিসংখ্যান ব্যবহারের জন্য প্রোজোনের সঙ্গে প্রথম চুক্তি করেছিল আর্সেনাল। আধুনিক ইংরেজ ফুটবলের এমন উদ্ভাবন খুব বেশি নেই, যার পথিকৃৎ তিনি ছিলেন না। সেই অর্থে তাঁর প্রভাব ফার্গুসনের চেয়েও বেশি—যদিও সাফল্যের বিচারে তিনি কখনও ওই স্কটিশ ম্যানেজারের কীর্তির সমকক্ষ হননি। শেষ দিকে ওয়েঙ্গারের ফরাসি বিপ্লবই হয়ে উঠেছিল সর্বজনীন রীতি। নিজের সাফল্যেরই শিকার হয়েছিলেন তিনি; প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বাড়তি ধারটি ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল।
দুই যোদ্ধা লড়াইয়ের দস্তানা নামিয়ে রাখার পরেই কেবল ফার্গুসন নিজের শ্রদ্ধার কথা স্পষ্ট করে বলতে পেরেছিলেন। ওয়েঙ্গার আর্সেনাল ছাড়ার সময়ে তিনি বলেন, “আর্সেন নিঃসন্দেহে প্রিমিয়ার লিগের সর্বকালের অন্যতম সেরা ম্যানেজার। এমন এক মহান মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী, সহকর্মী ও বন্ধু হতে পেরে আমি গর্বিত।” ‘বন্ধু’ বিশেষণটি শুনে ওয়েঙ্গার হয়তো তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ফরাসি ভঙ্গিতে প্রশ্নসূচক ভাবে একটি ভুরু তুলতেন। কিন্তু তিরিশ বছর পরে ইংরেজ ফুটবলকে তিনি কতখানি বদলে দিয়েছিলেন, তা নিয়ে আপত্তি তোলার মানুষ খুব কমই আছেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



