উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার উঁচু হিমালয় অঞ্চলে তুষারপাতের জেরে আটকে পড়েছেন পর্বতারোহী, ট্রেকার এবং অভিযানের সহায়ক কর্মীরা। প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে বিভিন্ন অভিযানে ও ট্রেকিং পথে রয়েছেন মোট ১৩৬ জন। সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত অন্তত পাঁচজনকে উদ্ধারের খবর পাওয়া গিয়েছে। আবহাওয়ার উন্নতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাকিদের নিরাপদ স্থানে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

সোমবার পাঁচজনকে হেলিকপ্টারে সরানো হয়েছে। রবিবার প্রশাসনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১৩৬ জনের মধ্যে ৮৯ জন বিভিন্ন উচ্চতর পর্বতারোহণ অভিযানের সদস্য ও সহায়ক কর্মী। কালিন্দী পাসের বেস ক্যাম্পে ছিলেন ১৮ জন এবং অডেনস কোল পাসের বেস ক্যাম্পে ২৯ জন। ফলে আটকে পড়ার ঘটনাটি কোনও একটি পর্যটকদল বা একটি পথের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একাধিক শিবির ও দুর্গম পথজুড়ে উদ্ধারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হচ্ছে প্রশাসনকে।

সোমবার জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা আধিকারিক শার্দূল গুসাইঁ জানান, আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতির পর কালিন্দী পাস এবং অডেনস কোল এলাকায় হেলিকপ্টারে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। অন্য অভিযাত্রীদলগুলি নিজেদের বেস ক্যাম্পে নিরাপদে রয়েছে বলেও জানান তিনি। জেলার অভিযাত্রীদের মধ্যে ছয়জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। সুদর্শন, ভাগীরথী–২, যোগিন–১, শিবলিঙ্গ, সতোপন্থ ও শ্রীকণ্ঠ শৃঙ্গের বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেওয়া দলগুলির অবস্থার উপর নজর রাখা হচ্ছে। কালিন্দী পাসে থাকা দলে বেঙ্গালুরুর পাঁচজন ট্রেকার এবং ১৩ জন সহায়ক কর্মী রয়েছেন বলে জানিয়েছেন গুসাইঁ। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী দল দুর্গম এলাকায় সমীক্ষা ও তল্লাশিও চালাচ্ছে।

জেলাশাসক প্রশান্ত আর্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে উদ্ধার অভিযানের তদারকি করছেন। সংশ্লিষ্ট দলগুলির কাছ থেকে পরিস্থিতির খবর সংগ্রহ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, বন দপ্তর, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, পুলিশ এবং বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার কর্মীরা যৌথভাবে কাজ করছেন। তাঁদের লক্ষ্য, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে আটকে থাকা ট্রেকার ও মালবাহকদের নিরাপদ এলাকায় পৌঁছে দেওয়া। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা দলগুলির জন্য উদ্ধারকাজও চালাতে হচ্ছে পৃথকভাবে।

এর মধ্যেই কিছু এলাকায় উদ্ধারকাজে অগ্রগতি হয়েছে। ভোজবাসা ও চিরবাসায় আটকে থাকা অধিকাংশ পর্যটককে গঙ্গোত্রী জাতীয় উদ্যানের কর্মীদের সহায়তায় নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এই পর্যটকদের ফেরানোর খবরকে উচ্চতর অভিযানের সমস্ত সদস্যের উদ্ধার সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে না। উঁচু এলাকার একাধিক বেস ক্যাম্পে এখনও অভিযাত্রী এবং তাঁদের সহায়ক কর্মীরা রয়েছেন। ফলে প্রশাসনের নজর এখন সেই দুর্গম শিবিরগুলিতেও।

রাজ্যস্তরেও উদ্ধার অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় রাজ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা কেন্দ্রে বৈঠক করে মুখ্যসচিব আনন্দ বর্ধন সোমবার সকাল ছ’টা থেকে, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে, হেলিকপ্টার চালানোর নির্দেশ দেন। প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে বলা হয় উত্তরাখণ্ডের অসামরিক বিমান পরিবহণ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে। মোবাইল সংযোগহীন এলাকায় যোগাযোগ বজায় রাখতে উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত প্রতিটি হেলিকপ্টারে স্যাটেলাইট ফোন রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

উদ্ধারের পরে প্রত্যেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছেন রাজ্যের বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা সচিব বিনোদকুমার সুমন। প্রয়োজনে চিকিৎসার জন্য ঋষিকেশের এমস এবং শ্রীনগর মেডিক্যাল কলেজকে সতর্ক রাখা হয়েছে। অভিযাত্রীদের অবস্থান, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজন সম্পর্কে নিয়মিত খবর নিতে বলা হয়েছে আধিকারিকদের। উঁচু এলাকার আবহাওয়ার পরিবর্তন অনুযায়ী উদ্ধার পরিকল্পনা বদলাতে আবহাওয়া দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগের প্রভাব শুধু উত্তরকাশীতেই সীমাবদ্ধ নেই। বাগেশ্বরেও ৪৩ জন ট্রেকারকে নিরাপদ স্থানে আটকে রাখা হয়েছিল। উত্তরকাশী ও বাগেশ্বর মিলিয়ে রবিবার ১৩টি দলের মোট ১৭৯ জনের কথা জানিয়েছিল প্রশাসন। একই সময়ে লাগাতার বৃষ্টিতে রাজ্যের আশিটিরও বেশি রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। সিরোবগড়ে বারবার ধস নামায় বদ্রীনাথ সড়কেও যান চলাচল ব্যাহত হয়। এই পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজের গতি নির্ভর করছে আবহাওয়া এবং নিরাপদে পৌঁছনোর সুযোগের উপর।