৩৭ শরীর, এক যন্ত্র

যা জানা জরুরি
- পর্দায় যে চরিত্রটি মানুষ নয়, তার হাঁটা, দৌড় বা লড়াইয়ের শুরুটা কিন্তু মানুষের শরীর থেকেই হতে পারে।
- আল্লু অর্জুন অভিনীত এবং অ্যাটলি পরিচালিত ‘রাকা’ সেই শরীরী অভিনয় ধারণের এক বিশেষ মাপে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছে।
- একই সময়ে ৩৭ জনের নড়াচড়া তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিটাল তথ্য হিসেবে ধারণ করা হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পর্দায় যে চরিত্রটি মানুষ নয়, তার হাঁটা, দৌড় বা লড়াইয়ের শুরুটা কিন্তু মানুষের শরীর থেকেই হতে পারে। আল্লু অর্জুন অভিনীত এবং অ্যাটলি পরিচালিত ‘রাকা’ সেই শরীরী অভিনয় ধারণের এক বিশেষ মাপে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছে। একই সময়ে ৩৭ জনের নড়াচড়া তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিটাল তথ্য হিসেবে ধারণ করা হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর সামনে আসে এই প্রযুক্তিগত অর্জনের বিস্তারিত।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের নথি অনুযায়ী, রেকর্ডটি অর্জিত হয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মুম্বইয়ে। স্বীকৃতিপ্রাপকদের মধ্যে রয়েছে সান টিভি নেটওয়ার্ক এবং ভি অরুণকুমার, যিনি অ্যাটলি নামে পরিচিত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কাজের সময় নিয়ে আলাদা তথ্য থাকলেও রেকর্ডের তারিখের ক্ষেত্রে গিনেসের নথিই সবচেয়ে নির্দিষ্ট সূত্র। অর্থাৎ রেকর্ড তৈরি এবং তার প্রকাশ্য প্রচার একই সময়ে হয়নি।
প্রযুক্তিটির পরিচিত নাম মোশন ক্যাপচার। সাধারণ ক্যামেরা অভিনেতার শরীরের ছবি ধরে; মোশন ক্যাপচারে শরীরের বিভিন্ন বিন্দুর অবস্থান ও গতিবিধি থেকে তৈরি হয় ডিজিটাল তথ্য। পরে সেই তথ্য ডিজিটাল চরিত্রের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা যায়। ফলে পর্দায় দেখা চরিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা দেখতে হলেও তার হাঁটা, দৌড়, হাতের ভঙ্গি কিংবা অন্য চরিত্রের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার ছন্দে মানুষের অভিনয় থেকে যায়।
‘রাকা’র কাজে এই প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে অপটিট্র্যাক। ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংস্থাটির বিবরণ অনুযায়ী, হায়দরাবাদের অ্যাপল আর্টস স্টুডিয়োজের নীল মধু ও তাঁর দল পারফরম্যান্স ক্যাপচার এবং পরবর্তী তথ্য-প্রক্রিয়াকরণের কাজে যুক্ত ছিলেন। সান পিকচার্সের সঙ্গে এই কাজটি দেখিয়ে দেয়, বড় তারকার ছবিতে চূড়ান্ত দৃশ্যটি যতটা চোখে পড়ে, তার পিছনে প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের দলও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত কারিগরি তথ্য অনুযায়ী, ব্যবস্থায় ছিল ৯২টি অপটিক্যাল ক্যামেরা। মুখের অভিব্যক্তি ধারণ, আলাদা সহায়ক ভিডিয়ো এবং আনরিয়াল ইঞ্জিনে তাৎক্ষণিক দৃশ্যায়নের ব্যবস্থাও ছিল। অংশগ্রহণকারীদের বয়স চার থেকে সত্তর বছরের মধ্যে। একই ধারণক্ষেত্রের মধ্যে তাঁদের গতিবিধি অনুসরণ করা হয়।
তবে এই তথ্যগুলির উৎসের পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। অপটিট্র্যাকের বিবরণে সংবাদপ্রতিবেদন উদ্ধৃত করে সরঞ্জাম ও ব্যবস্থার বিস্তারিত জানানো হয়েছে; গিনেসের সংক্ষিপ্ত রেকর্ড নথিতে প্রতিটি যন্ত্রের তালিকা নেই। তাই ৩৭ জনের রেকর্ডটি গিনেসে নথিভুক্ত হলেও পুরো প্রযুক্তিগত সেটআপের প্রতিটি খুঁটিনাটি একই উৎস থেকে এসেছে—এমনটা বলা ঠিক হবে না।
এত মানুষকে একসঙ্গে ধরার প্রয়োজনও শুধু রেকর্ড তৈরির জন্য নয়। আলাদা সময়ে অভিনেতাদের চলন ধারণ করে পরে তা জোড়া লাগানো এবং একই সময়ে একাধিক অভিনেতার পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া ধারণ করা—দুটি আলাদা নির্মাণপদ্ধতি। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে একই মুহূর্তে বহু শরীরের দূরত্ব, গতি ও প্রতিক্রিয়া ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ‘রাকা’র ক্ষেত্রে এর ফলে ঠিক কত সময় বেঁচেছে, কতটা খরচ কমেছে বা কতগুলি দৃশ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তার নির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশিত হয়নি। তাই রেকর্ডের সংখ্যা থেকেই উৎপাদন-খরচ বা দক্ষতা সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না।
অপটিট্র্যাকের প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যায় সহায়ক ক্যামেরার ছবি এবং ত্রিমাত্রিক শরীরী তথ্য পাশাপাশি দেখার ব্যবস্থার কথাও রয়েছে। অভিনেতার বাস্তব চলন ও যন্ত্রে ধরা তথ্য মিলিয়ে দেখতে এটি কাজে লাগে। ফলে চূড়ান্ত দৃশ্য তৈরির আগেই ভুল শনাক্ত করা এবং দৃশ্যের প্রাথমিক বিন্যাস বোঝার একটি স্তর তৈরি হতে পারে। তবে এটিও প্রযুক্তি-প্রস্তুতকারকের ব্যাখ্যা; ছবিটির সম্পূর্ণ কারিগরি কর্মপ্রবাহের স্বাধীন মূল্যায়ন নয়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে অ্যাটলি জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামো তৈরিতে প্রযোজকের সহায়তা পেয়েছেন। ছবিতে আল্লু অর্জুনের সঙ্গে রয়েছেন দীপিকা পাড়ুকোনও। কিন্তু এই ঘোষণার মূল বিষয় তাঁদের চরিত্র বা গল্প নয়; বরং অভিনেতাদের শরীরী অভিনয় কীভাবে ডিজিটাল জগতে পৌঁছচ্ছে, সেটিই।
সেখানেই ‘রাকা’র রেকর্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। দর্শক শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখবেন কোনও ডিজিটাল প্রাণী, কাল্পনিক চরিত্র বা সম্পূর্ণ কৃত্রিম জগত। কিন্তু তার পিছনে থাকবে ৩৭টি শরীর, ক্যামেরার একটি বিশাল ব্যবস্থা এবং সেই তথ্যকে ব্যবহারযোগ্য করার জন্য কাজ করা একাধিক মানুষের দল।
‘কম্পিউটার বানিয়েছে’—এই একটি বাক্যে সেই শ্রমটি সহজেই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
গিনেসের স্বীকৃতি অবশ্য একটি নির্দিষ্ট মাপের সাফল্যই নথিভুক্ত করে: একসঙ্গে ৩৭ জনের শরীরী গতিবিধি ধারণ। বেশি মানুষকে একসঙ্গে ধরতে পারা মানেই বেশি আবেগপূর্ণ দৃশ্য, উন্নত অভিনয় বা ভালো সিনেমা—তা নয়। বরং তথ্য যত বেশি, সেটিকে পরিষ্কার করা, বাছাই করা এবং সঠিকভাবে ডিজিটাল চরিত্রে বসানোর কাজও তত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
‘রাকা’ তাই আপাতত একটি পরিমাপযোগ্য প্রযুক্তিগত সীমা পেরোনোর গল্প। সেই প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা অর্থবহ সিনেমা তৈরি করেছে, তার উত্তর গিনেসের শংসাপত্রে নয়—পুরো ছবিটি মুক্তির পরই মিলবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



