জোড়াফুল স্থগিত, কংগ্রেসে মমতার সমর্থন; পুরনো মামলায় গ্রেফতার নন্দীগ্রামের প্রার্থী

যা জানা জরুরি
- জোড়াফুল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, নিজের প্রার্থীর সরে দাঁড়ানো, কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা এবং তার পরেই সেই কংগ্রেস প্রার্থীর গ্রেফতার—শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, কয়েক ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহে নাটকীয় মোড়…
- ৬ অক্টোবরের ভোটে কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধানকে ২০০৭ সালের জমি আন্দোলনের সময়কার খুনের মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থন ঘোষণার অব্যবহিত পরে এই পদক্ষেপের সময় নির্বাচন নিয়েই তীব্র প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
জোড়াফুল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, নিজের প্রার্থীর সরে দাঁড়ানো, কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা এবং তার পরেই সেই কংগ্রেস প্রার্থীর গ্রেফতার—শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, কয়েক ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহে নাটকীয় মোড় নিল নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন। ৬ অক্টোবরের ভোটে কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধানকে ২০০৭ সালের জমি আন্দোলনের সময়কার খুনের মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থন ঘোষণার অব্যবহিত পরে এই পদক্ষেপের সময় নির্বাচন নিয়েই তীব্র প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।
শুক্রবার বিকেল চারটে নাগাদ কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা জানান মমতা। প্রায় এক ঘণ্টা পরে মিলনকে আটক করে পুলিশ। সোনাচূড়ার বাসিন্দা মিলন নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ। তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় ২০০৭ সালের ১২টি ফৌজদারি মামলার উল্লেখ রয়েছে। তার মধ্যে চারটি খুনের মামলা। ওই প্রতিবেদনের দাবি, সবগুলি মামলা হলদিয়ার আদালতে বিচারাধীন; কোনওটিতেই এখনও অভিযোগ গঠন হয়নি।
পরোয়ানার সময়কালও তাৎপর্যপূর্ণ। চারটি খুনের মামলায় জারি হওয়া পরোয়ানার ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনটি পরোয়ানা ২০২১ সালের, অন্যটি ২০২৩ সালের। অর্থাৎ অভিযোগগুলি যেমন নতুন নয়, তেমনই পরোয়ানাও সদ্য জারি হয়নি। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বকেয়া পরোয়ানার বিষয়টি নিয়ে তাঁর দল মিলনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল। তৃণমূলের দুই শিবিরের সংঘাতের সঙ্গে গ্রেফতারির বিতর্কেও যুক্ত হয়েছে এই তথ্য।
জমি আন্দোলনের সময়কার খুনের মামলায় মিলন অভিযুক্ত এবং তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা বকেয়া ছিল। শনিবার তাঁকে আদালতে তোলার কথা। তবে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি। খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া পৃথক বিষয়। প্রকাশিত খবর থেকে মিলনের বিরুদ্ধে কোনও মামলায় দোষ প্রমানিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর অবকাশ নেই।
এখানেই উঠছে প্রধান প্রশ্ন: কয়েক বছর আগের পরোয়ানা কার্যকর করার প্রয়োজন ঠিক ভোটের প্রচারের মধ্যেই কেন দেখা দিল? তার আগে পুলিশ কী পদক্ষেপ করেছিল? সাম্প্রতিক কোনও আদালতের নির্দেশ কি ছিল? পরোয়ানার অনুলিপি, সংশ্লিষ্ট মামলার নম্বর এবং গ্রেফতারের নথি ছাড়া এই প্রশ্নগুলির নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। আবার ঘটনার সময়গত নৈকট্য থেকেই রাজনৈতিক নির্দেশে গ্রেফতার হয়েছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়াও চলে না।
মমতা ও কংগ্রেস অবশ্য একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবেই দেখছে। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের অভিযোগ, বিরোধী প্রার্থীকে সরিয়ে একদলীয় ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাইছে বিজেপি। কুণাল ঘোষ অবিলম্বে মিলনের মুক্তি দাবি করেছেন। বিজেপি নেতৃত্ব এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, পুলিশ নিজের কাজ করছে, এর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নেই।
সমাজমাধ্যমে মমতার অভিযোগ, কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণার পরেই পুরনো মামলা সামনে আনা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, এত দিন পরে এই মুহূর্তটিই কেন বেছে নেওয়া হল? নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে যৌথভাবে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। এই অভিযোগগুলির স্বাধীন প্রমাণ অবশ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর প্রশ্ন, এত দিন পুলিশ কী করছিল? তাঁর বক্তব্য, মিলন যখন নির্বাচনী হলফনামা জমা দেন, তখনও বিষয়টি সামনে এনে কোনও আপত্তি তোলা হয়নি। প্রচারের মধ্যে কংগ্রেসের পক্ষে সমর্থন বাড়তেই পুরনো মামলা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। প্রার্থীকে হেফাজতে রাখা হলেও কংগ্রেস নির্বাচনী লড়াই চালাবে বলে জানিয়েছেন অধীর।
তবে মমতার সমর্থনকে স্বাগত জানানোর প্রশ্নে অধীরের সুর ছিল সংযত। অধীর মনে করিয়েছেন, মমতা প্রথমে নিজের প্রার্থী দিয়েছিলেন, সেই প্রার্থী সরে যাওয়ার পরে কংগ্রেসকে সমর্থন করছেন। কংগ্রেস তাঁর কাছে সমর্থন চায়নি। ফলে গ্রেফতারির প্রতিবাদে দুই শিবিরের অবস্থান কাছাকাছি হলেও, তাকে পূর্বনির্ধারিত নির্বাচনী সমঝোতা বলে দেখানো সঠিক হবে না।
ঘটনাপ্রবাহের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সঞ্চিতা প্রধান দে। মমতা শিবিরের এই প্রার্থী বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন। পরের দিন তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। মমতার অভিযোগ, সঞ্চিতাকে ভয় দেখানো হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল, শুক্রবার কেবল তা ঘোষণা করা হয়েছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে আগাম আলোচনা হয়েছিল কি না, জানতে চাওয়ায় মমতা জানান, সিদ্ধান্তটি তাঁরাই একতরফাভাবে নিয়েছেন। বৃহত্তর বিরোধী ঐক্য মজবুত করাই উদ্দেশ্য বলে ব্যাখ্যা দেন তিনি।
এই রাজনৈতিক রদবদলের পটভূমিতে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত। বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীকের ব্যবহার স্থগিত করে কমিশন। শুক্রবার দুই শিবিরকে বিকল্প পরিচয় দেওয়া হয়। মমতার দলের নাম ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’, প্রতীক ‘ফুটবল খেলোয়াড়’। অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিপক্ষ শিবিরের নাম ‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’, প্রতীক ‘খাম’। মূল দলের নাম ও প্রতীকের দাবির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
নতুন প্রতীকগুলি অবশ্য কমিশনের একতরফা পছন্দ নয়। মমতা শিবিরের প্রস্তাবিত প্রতীকের তালিকায় ফুটবল খেলোয়াড়ের পাশাপাশি ক্রিকেট ব্যাটও ছিল। প্রতিপক্ষ শিবির চেয়েছিল খাম, ব্ল্যাকবোর্ড অথবা মশাল। দুই ক্ষেত্রেই প্রথম পছন্দ অনুমোদন করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ও ত্রিপুরায় দুই সংগঠনকেই নিবন্ধিত ও স্বীকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করা হবে বলে কমিশন জানিয়েছে।
মমতা জানিয়েছেন, উপনির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে বলেই বিকল্প নাম ও প্রতীক জমা দেওয়া হয়েছে, এতে কমিশনের মূল সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হয়নি। পুরনো নাম ও প্রতীক ফেরানোর লড়াই চালানোর কথা বলেছেন তিনি। রাহুল গান্ধী তাঁকে ফোন করেছেন এবং অরবিন্দ কেজরীওয়ালও পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করেছেন মমতা। রেজিনগরের উপনির্বাচনে কাকে সমর্থন করা হবে, সে বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছে মমতা শিবির। ওই আবেদনে ঋতব্রতকে প্রতিপক্ষ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। ফলে ভোটের পাশাপাশি দলের পরিচয় নিয়ে আইনি লড়াইও চলবে।
নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানি রথ, শুভেন্দুর নিহত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা। শুভেন্দুর ছেড়ে দেওয়া আসনেই হচ্ছে এই উপনির্বাচন। সিপিআই এবং আইএসএফও প্রার্থী দিয়েছে। ফলে মমতা কংগ্রেসকে সমর্থন করলেও সমস্ত বিরোধী ভোট এক প্রার্থীর পিছনে একত্রিত হয়েছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং একাধিক বিরোধী প্রার্থীর উপস্থিতির মধ্যেই মিলনের গ্রেফতার ভোটের প্রচারের প্রধান বিতর্ক হয়ে উঠেছে।
নন্দীগ্রামের পুরনো আন্দোলন এই বিরোধে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। যে জমি আন্দোলন মমতার রাজনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, সেই পর্বের মামলাতেই আজ গ্রেফতার তাঁর সমর্থিত প্রার্থী। উনিশ বছর আগের সংঘাত এভাবে ফিরে এসেছে সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। গ্রেফতারির অভিঘাত তাই আরও গভীর।
এই অবস্থায় নন্দীগ্রামের লড়াইয়ের দুটি পৃথক দিক সামনে আসছে। একটি, দলের বিভাজন ও প্রার্থী সরে যাওয়ার পরে মমতা নিজের সমর্থকদের কতটা কংগ্রেসের পক্ষে সংগঠিত করতে পারবেন। অন্যটি, পুরনো পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসন তার সময় নির্বাচন এবং আগের পদক্ষেপগুলির সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারবে কি না। প্রথমটির পরীক্ষা ভোটে। দ্বিতীয়টির উত্তর খুঁজতে হবে পুলিশ ও আদালতের নথিতে।
ভোটের মুখে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ হলে সেই ব্যাখ্যার গুরুত্ব আরও বাড়ে। মামলা পুরনো বলেই অভিযোগ অগ্রাহ্য করা যায় না। আবার পরোয়ানা ছিল বলেই তার প্রয়োগের সময় নিয়ে প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। মিলনের মামলায় আদালতে কী তথ্য পেশ করা হয়, পুলিশ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং নির্বাচনী প্রচারে তাঁর অনুপস্থিতি কী প্রভাব ফেলে, নন্দীগ্রামের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে এই বিষয়গুলিই এখন নজরে রাখা প্রয়োজন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।
আরও লেখা →সম্পর্কিত প্রতিবেদন
Internationalধ্বংসস্তূপ থেকে ২৫ হাজার পাতা: গাজার দুই গবেষকের হাতে ইউনেসকোর স্মৃতি-পুরস্কার
সেপ্টেম্বর 19, 2026
Internationalগ্যালারি দেখেনি চার শিশুর তিনজন: ইংল্যান্ডের সংস্কৃতিনীতি নতুন করে সাজাতে চান ডন এয়ারি
সেপ্টেম্বর 19, 2026
খবরবিদেশি অনুদানে গড়া সম্পদ সরকারের হাতে কেন, এফসিআরএ নিয়ে প্রশ্ন সংসদীয় কমিটিতে
সেপ্টেম্বর 19, 2026
খবরচোদ্দ বছরের বেহালাবাদক থেকে নিউ ইয়র্ক ফিলহারমনিকের পরিচালক
সেপ্টেম্বর 19, 2026দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে
বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।