পাণ্ডুলিপিতেই খুন!

যা জানা জরুরি
- অ্যান্টনি হরোউইৎজের সুসান রাইল্যান্ড সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘মার্বেল হল মার্ডার্স’ ২৬ সেপ্টেম্বর বিবিসি ওয়ান ও বিবিসি আইপ্লেয়ারে শুরু হচ্ছে।
- ছয় পর্বের এই ধারাবাহিকে লেসলি ম্যানভিল ফিরছেন সুসান রাইল্যান্ডের ভূমিকায়, আর টিম ম্যাকমুলান আবারও কাল্পনিক গোয়েন্দা অ্যাটিকাস পুন্ড।
- ‘ম্যাগপাই মার্ডার্স’ ও ‘মুনফ্লাওয়ার মার্ডার্স’-এর পর একই নির্মাণজগতের এটি তৃতীয় টেলিভিশন রূপান্তর।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন
একটি বইয়ের ভিতরে আর একটি রহস্য। আর সেই রহস্যের সূত্র খুঁজছেন একজন সম্পাদক। অ্যান্টনি হরোউইৎজের সুসান রাইল্যান্ড সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘মার্বেল হল মার্ডার্স’ ২৬ সেপ্টেম্বর বিবিসি ওয়ান ও বিবিসি আইপ্লেয়ারে শুরু হচ্ছে। ছয় পর্বের এই ধারাবাহিকে লেসলি ম্যানভিল ফিরছেন সুসান রাইল্যান্ডের ভূমিকায়, আর টিম ম্যাকমুলান আবারও কাল্পনিক গোয়েন্দা অ্যাটিকাস পুন্ড।
‘ম্যাগপাই মার্ডার্স’ ও ‘মুনফ্লাওয়ার মার্ডার্স’-এর পর একই নির্মাণজগতের এটি তৃতীয় টেলিভিশন রূপান্তর। মূল উপন্যাসটিকেও প্রকাশক এই ধারার তৃতীয় ও শেষ কিস্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
নতুন গল্পে গ্রিসের জীবন ছেড়ে ইংল্যান্ডে ফিরে সুসান প্রকাশনা-সম্পাদকের কাজ নেন। তাঁকে প্রয়াত শিশুসাহিত্যিক মিরিয়াম ক্রেসের নাতি এলিয়টের লেখা অ্যাটিকাস পুন্ড-কাহিনি সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু পাণ্ডুলিপির ভিতরের ঘটনা ধীরে ধীরে বর্তমান সময়ের একটি সন্দেহজনক মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
এখানেই ‘মার্বেল হল মার্ডার্স’-এর আসল খেলা।
দর্শক একই সঙ্গে দুটি রহস্য অনুসরণ করবেন—একটি সুসানের বর্তমান তদন্ত, অন্যটি তাঁর হাতে থাকা পুরনো ধাঁচের গোয়েন্দা গল্প। অর্থাৎ এক গল্পের ভিতর আর এক গল্প, আর দুই জগতের মধ্যে সূত্রের যাতায়াত। সিরিজটির পরিচিত এই দ্বিস্তরীয় কাঠামো এবারও রহস্যের পাশাপাশি গল্প বলার পদ্ধতিকেও রহস্যের অংশ করে তুলছে।
লেসলি ম্যানভিলের সঙ্গে রুপার্ট পেনরি-জোন্স, মার্ক বনর-সহ একাধিক নতুন অভিনেতা যোগ দিয়েছেন। পিবিএস মাস্টারপিস, এলেভেন্থ আওয়ার ফিল্মস ও বিবিসির যৌথ উদ্যোগে তৈরি সিরিজটি উত্তর আমেরিকায় আগেই প্রদর্শিত হয়েছে। ফলে ২৬ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব-অভিষেক বলা ঠিক হবে না; এটি ব্রিটেনে বিবিসি সম্প্রচার ও আইপ্লেয়ারে স্ট্রিমিং শুরুর তারিখ।
এই পার্থক্যটি আন্তর্জাতিক সিরিজের ক্ষেত্রে ছোট মনে হলেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি অনুষ্ঠানের প্রথম সম্প্রচার, নির্দিষ্ট বাজারে মুক্তি এবং স্ট্রিমিং-প্রাপ্যতা—তিনটি সবসময় একই তারিখে হয় না।
‘মার্বেল হল মার্ডার্স’-এর সবচেয়ে মজার দিক সম্ভবত সম্পাদনার কাজটিকেই তদন্তের অস্ত্র করে তোলা। কোনও সময়ের হিসাব মেলে না, কোনও নাম হঠাৎ বদলে যায়, কোনও বাক্য অকারণে লেখা—সম্পাদকের চোখে ধরা পড়া এমন ছোটখাটো অসঙ্গতিই হয়ে উঠতে পারে খুনের সূত্র।
অবশ্য বাস্তব প্রকাশনা জগতে সম্পাদক গোয়েন্দা নন। পাণ্ডুলিপির অসঙ্গতি চিহ্নিত করা আর সেখান থেকে অপরাধের নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এক জিনিস নয়। ধারাবাহিকটি তাই সম্পাদকের পর্যবেক্ষণশক্তিকে বাস্তব পেশার সীমা ছাড়িয়ে রহস্য-রোমাঞ্চের নিয়মে ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষণ
‘কাহিনির ভিতরে কাহিনি’ ধরনের গল্পের মজা শুধু খুনি কে, তা অনুমান করা নয়। গল্প কীভাবে আমাদের সন্দেহ করতে শেখায়, সেটিও এখানে খেলার অংশ। কোন তথ্য আগে দেওয়া হল, কোনটি গোপন রাখা হল, কোন চরিত্রকে অস্বাভাবিক করে দেখানো হল—সুসানের সম্পাদনার কাজ যেন সেই কৌশলগুলির পর্দা সরিয়ে দেয়।
টেলিভিশনে এর বাড়তি সুবিধাও আছে। দুই সময়কাল এবং দুই কল্পজগতকে পোশাক, আলো, সেট ও অভিনয়ের ভিন্নতায় আলাদা করে তোলা যায়। তবে ঝুঁকিও রয়েছে। বর্তমান আর পাণ্ডুলিপির জগতের মধ্যে অতিরিক্ত যাতায়াত হলে রহস্যের বদলে দর্শকের মনোযোগই হারিয়ে যেতে পারে।
‘শেষ’ শব্দটিও তাই একটু সাবধানে ব্যবহার করা দরকার। উপন্যাস-ত্রয়ীর তৃতীয় ও শেষ কিস্তি হওয়া এবং অ্যাটিকাস পুন্ড বা সুসান রাইল্যান্ডকে টেলিভিশনে আর কখনও দেখা যাবে না—দুটি এক কথা নয়। টিম ম্যাকমুলান ভবিষ্যতে আরও গল্পের সম্ভাবনার কথা বলেছেন, কিন্তু নতুন কোনও টেলিভিশন কমিশন ঘোষণা হয়নি। অভিনেতার ইচ্ছাকে তাই চ্যানেলের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এ মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হল ছয় পর্বের ব্রিটিশ সম্প্রচার। আগের দুই সিরিজের জনপ্রিয়তাও নতুনটির মানের নিশ্চয়তা নয়। আসল পরীক্ষা হবে, দুটি রহস্য কি আলাদা করে উপভোগ করার মতো, অথচ শেষ পর্যন্ত তাদের সংযোগ কি শুধু চমক দেখানোর কৌশল না হয়ে চরিত্র, সূত্র ও প্রমাণের যুক্তিতেও টিকে থাকে?
রূপান্তরের ক্ষেত্রে আরও একটি সূক্ষ্ম সমস্যা রয়েছে। বই পড়ার সময় পাঠক চাইলে আগের পৃষ্ঠায় ফিরে গিয়ে কোনও নাম, তারিখ বা ঘটনা মিলিয়ে নিতে পারেন। পর্দায় দৃশ্য একবার চলে গেলে সেই সুযোগ নেই। ফলে নির্মাতাদের দৃশ্যমান নোট, পুনরাবৃত্ত সূত্র কিংবা দুই কাহিনির আলাদা ভিজ্যুয়াল ভাষা ব্যবহার করতে হতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যাখ্যা আবার রহস্যের আনন্দটাই নষ্ট করতে পারে।
একটি পূর্ণ উপন্যাস এবং তার ভিতরের আর একটি উপন্যাসকে প্রায় ছয় ঘণ্টার টেলিভিশন সময়ে ধরতে গিয়ে চরিত্র বা ঘটনা বাদ পড়বেই। তাই বইয়ের সঙ্গে হুবহু মিলছে কি না, সেটিই রূপান্তরের একমাত্র মাপকাঠি নয়। পরিবর্তনগুলি পর্দার নিজস্ব গতি, উত্তেজনা এবং আবেগকে শক্তিশালী করছে কি না—প্রশ্নটা বরং সেখানে।
আর সম্পাদকের পেশাটিকেও শুধু একা সুসানের অসাধারণ চোখ দিয়ে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাস্তবে একটি বই প্রকাশের পিছনে সম্পাদক, সহকারী সম্পাদক, প্রুফরিডার, অধিকার-সংক্রান্ত কর্মীসহ বহু মানুষের যৌথ শ্রম থাকে। ধারাবাহিক যদি সেই দলগত কাজটিও কিছুটা দৃশ্যমান করে, তবে রহস্যের পাশাপাশি প্রকাশনা জগতের বাস্তব ছবিটাও ফুটে উঠবে।
কারণ প্রতিটি সম্পাদনার ভুল খুনের সূত্র নয়। কিন্তু একটি ভালো রহস্যগল্পে—একটি ভুল বাক্যই কখনও কখনও পুরো গল্পের দরজা খুলে দিতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



